রাজ্য সরকারের আর্থিক ঘাটতি ও রাজনীতি

সুশান্ত মজুমদার

0
Fiscal Deficit

প্রত্যেক বছর ফেব্রুয়ারি থেকে মে- এই কটা মাস খবরের কাগজে মাঝে মাঝেই রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে বিভিন্ন পরিসংখ্যান-সহ আলোচনা থাকে। এর সঙ্গে অল্পবিস্তর আমরা সকলেই পরিচিত। কিন্তু গোলমাল ঠেকে যে জায়গায় তা হল- হয় পরিসংখ্যানের দাপটে মাথা গুলিয়ে যায়, নাহলে ব্যাপারটা এত জটিল ঠেকে যে শেষ পর্যন্ত কিছুই বোধগম্য হয় না। তার উপর রয়েছে, বিভিন্ন কাগজের এবং অনেক ক্ষেত্রে লেখকের নিজস্ব রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিশ্বাস। এই লেখায়, আমরা চেষ্টা করব- নিজস্ব মতামতকে দূরে সরিয়ে রেখে শুধুমাত্র ন্যূনতম পরিসংখ্যানের (কেবলমাত্র আর বি আই-এর) সাহায্যে ঘাটতির রাজনীতিকে বুঝতে। (RBI Report,  STATE FINANCES: A STUDY OF BUDGETS OF2015-16)
প্রথমে, ঘাটতির ব্যাপারটা বোঝা যাক। ধরুন, আপনার মাসিক আয় দশ হাজার টাকা কিন্তু খরচ এগার হাজার টাকা। তাহলে, আপনার প্রতি মাসে ঘাটতি এক হাজার টাকা। এভাবে চললে দশ মাস পরেই বাজারে আপনার ধার আপনার মাসিক আয়ের সমান হয়ে যাবে। ততদিনে সকলেই জেনে গেছে আপনার আর্থিক অবস্থার কথা। এবার বাজার থেকে ধার পাওয়ার রাস্তাও আপনার বন্ধ হয়ে যাবে।
সরকার যখন তার আয়ের চেয়ে বেশি ব্যয় করে, তখন তাকে বলা হয় আর্থিক ঘাটতি (FiscalDeficit)। নিজস্ব কর আদায় ছাড়াও রাজ্যগুলির আয়ের নানান সূত্র আছে। যেমন সংবিধান অনুসারে কেন্দ্র থেকে প্রাপ্য আদায়, বিভিন্ন ধরনের প্রাপ্য অনুদান, মূলধনী আয় ইত্যাদি। কিন্তু শুধুমাত্র নিজস্ব আয় দিয়ে রাজ্যের সব খরচ মেটানো সম্ভব নয়, বিশেষভাবে ভারতবর্ষের মতো একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রে, যেখানে রাষ্ট্রের কর আদায় ক্ষমতা সীমিত। কারণ, অধিকাংশ মানুষের কাছ থেকে কর আদায় দূরে থাক, তাকে নানাভাবে অনুদান দিয়ে সাহায্য করতে হয়। তাই, প্রত্যেক বছর রাজ্যগুলিকে মূলতঃ বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করে এই আয়ের ঘাটতি পূরণ করতে হয়। রাজ্যের মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিপ্রেক্ষিতে, শতাংশের হারে রাজ্যের মোট বার্ষিক ঘাটতিকে রাজ্যের আর্থিক ঘাটতি (Fiscal Deficit)হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। দেশে এখন রাজ্যগুলির গড় আর্থিক ঘাটতি তিন শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে দেশে গড় আর্থিক ঘাটতির হার ছিল ২.২ শতাংশ।
কিন্তু শুধুমাত্র, আয় ব্যয়ের পরিসংখ্যানের উপর নির্ভর করে একটা দেশ বা রাজ্যের আর্থিক অবস্থা বোঝা যায় না। তাই, একটা রাজ্যের আর্থিক অবস্থা বোঝার জন্য দ্বিতীয় আরেকটি পরিসংখ্যানের সাহায্য নেওয়া হয়। রাজ্যের মোট আর্থিক দায় কতটা গভীর, তা বোঝার জন্য সাধারণভাবে রাজ্যের মোট দেনার পরিমাণ মোট আভ্যন্তরীণ  উৎপাদনের পরিপ্রেক্ষিতে, শতাংশের হিসাবে দেখা হয়। যেমন ২০১৩-১৪ সালের শেষে পশ্চিমবঙ্গের মোট আর্থিক দেনা ছিল রাজ্যের মোট আভ্যন্তরীণ উৎপাদনের(Total Outstanding Liabilities- As percentage of GSDP)৩৬.৭ শতাংশ। ২০১১ সালে যখন এই সরকার ক্ষমতায় আসে, সেই বছর এই দেনার হার ছিল ৪১.৯ শতাংশ। সাম্প্রতিক পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ২০০৫-০৬ অর্থবর্ষের শেষে এই হার ছিল রেকর্ড পরিমাণ- ৪৯.৭ শতাংশ। এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার, আমরা যদি সর্বভারতীয় পরিসংখ্যান বিচার করি, তাহলে দেখব প্রায় সব রাজ্যই গত কয়েক বছরে রাজ্যের মোট আভ্যন্তরীণ আয়ের তুলনায় তাদের মোট দেনার পরিমাণ অনেকটা কমিয়ে নিতে পেরেছে (RBI Report, Statement-20 দ্রষ্টব্য)।

state loans

এই টেবিল থেকে যেটা পরিষ্কার সেটা হচ্ছে- রাজ্যগুলির  মধ্যে এই ব্যাপারে সেরা পারফরমেন্স বোধহয় বিহারের। ২০০৫-০৬ সালে তাদের এই হার ছিল ৫৭.৩ শতাংশ, যা ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে কমে দাঁড়ায় ২৫.৮ শতাংশে। উড়িষ্যা (৪৭.৫ থেকে ১৯.৬ শতাংশ), উত্তরপ্রদেশ (৫২.৫ থেকে ৩১.৫ শতাংশ) বা রাজস্থানের (৪৬.৬ থেকে ২৫.২ শতাংশ) সাফল্যও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। হরিয়ানা, কর্ণাটক, ছত্তিশগড় বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলির আর্থিক অবস্থা চিরকালই মজবুত, এদের এই দায়ের হার কখনই ২৫-২৬ শতাংশ ছাড়ায়নি। ২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে ছত্তিশগড়, হরিয়ানা ও তামিলনাড়ুর এই হার-যথাক্রমে ছিল ১৪, ২০.৫ ও ২১ শতাংশ।
রাজ্যগুলির আর্থিক অবস্থার এই উন্নতির ক্ষেত্রে ২০০৩ সালে প্রণীত Fiscal Responsibility and Budgetary Management Act-র ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত শতকের শেষের দিকে যখন রাজ্যগুলির আর্থিক ঘাটতি লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল, তখন দেশে আর্থিক শৃঙ্খলা চালু করতে এই আইনটি’র কথা ওঠে। এই আইন অনুসারে রাজ্যগুলিকে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে সমতা আনার কথা বলা হয়েছে। আইনটি গ্রহণ করা যেহেতু বাধ্যতামূলক ছিল না, তাই হয়ত সকল রাজ্য কর্ণাটক, তামিলনাড়ু বা   উত্তরপ্রদেশের মতো এটিকে প্রাথমিক পর্যায় গ্রহণ করেনি। কিন্তু তৎকালীন বিরোধী দল শাসিত রাজ্য যেমন গুজরাত, মধ্যপ্রদেশ বা উড়িষ্যাও 2005-06 অর্থবর্ষের মধ্যে এই আইনটি গ্রহণ করে। পশ্চিমবঙ্গের এই বিপুল দেনা জমে যাওয়ার পিছনে তৎকালীন রাজ্য সরকারের এই আইনটি সর্ম্পকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি অনেকাংশে দায়ী। পশ্চিমবঙ্গ ২০১০-১১ অর্থবর্ষে শেষ পর্যন্ত এই আইনটি গ্রহণ করে যখন রাজ্যপাট থেকে তাদের বিদায় আসন্ন।
এখানে আমরা আরেকটি পরিসংখ্যানের উল্লেখ করতে চাই। দেশে FRBM আইন চালু হওয়ার আগে, কর্ণাটক বা ঝাড়খণ্ড মতো দু-একটি রাজ্য কখনও-সখনও রাজস্ব ঘাটতিমুক্ত বাজেট পেশ করেছে। অর্থাৎ, তাদের দৈনন্দিন খরচ (যেমন বেতন ও পেনশন দেওয়া, পূর্বতন ঋণের সুদ, অর্থাৎ এমন খরচ যা মোট আয় হ্রাস করে না) চালানোর জন্য কোনও ধার নিতে হয় না, বরং অর্থনীতির বিকাশের জন্য কিছু মূলধনী ব্যয়ের টাকা উদ্বৃত থাকে। কিন্তু FRBM আইন গ্রহণ করার পরে বহু রাজ্যই বছর বছর রাজস্ব ঘাটতিমুক্ত বাজেট পেশ করেছে (RBI Report, Annexure-2 দ্রষ্টব্য)। অর্থাৎ, এই দশক শুরুর বহু আগে থেকেই FRBM আইন মেনে নিয়ে অধিকাংশ রাজ্য, এমনকি বিহার বা উত্তরপ্রদেশের মতো পিছিয়ে পড়া রাজ্যও বহুদিন আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গের থেকে আর্থিকভাবে অনেক শক্ত অবস্থানে বিচরণ করছে।
এখানে আরেকটা ব্যাপার পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। আপনি যদি ভালো একটি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে পড়াশুনো করার জন্য ধার চান, তাহলে বেকার হলেও ব্যাঙ্ক যেমন আপনাকে লোন দেওয়ার জন্য তৈরি থাকে, ঠিক তেমনই আর্থিক ঘাটতি কোন ধরনের ব্যয়ের জন্য বেড়ে গেল, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আগেই বলা হয়েছে যে  আয়-ব্যয়ে ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকারগুলি-মূলত বাজার থেকে ঋণ গ্রহণের উপর নির্ভর করে। এখন এই ঋণ শোধ করার ক্ষমতা রাজ্য সরকারের তখনই থাকবে যখন সে সেটি মূলধনী ক্ষেত্রে ব্যয় করবে। কিন্তু যদি ঋণের টাকায় সরকারি বা আধা সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন বাবদ ব্যয় করা হয়, তাহলে ঋণের বোঝা বেড়েই চলবে, আয় বৃদ্ধি হবে না। রিজার্ভ ব্যাংক রিপোর্টের দ্বিতীয় ও চতূর্থ অধ্যায় এই নিয়ে আছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে যে ১৯৯৭৯৮ ও ২০১৪১৫ সালের মধ্যে রাজ্যগুলির পেনশন বাবদ খরচ দ্বিগুন বেড়েছে (Chart 11.2 দেখুন)। সেখনে আরও দুটি বিষয়ের উল্লেখ বিশেষভাবে রয়েছে, বিদ্যুৎ এবং সরকারি শিল্পসংস্থায় ভর্তুকির খরচ। এই দুটি জায়গায়ও রাশ টানাটা বোধ হয় জরুরি হয়ে উঠেছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট বলছে শিক্ষা, স্বাস্থ্যর মতো সামাজিক ক্ষেত্রসমূহ, রাস্তাঘাট এবং শক্তি উৎপাদন– এই গুলিতে বিনিয়োগ প্রয়োজন। এই রিপোর্ট (Chart 11.4) বলছে –২০১৩-১৪ অর্থবর্ষে পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ব্যয়, মোট ব্যয়ের শতাংশের হিসাবে সর্বভারতীয় গড়ের তুলনায় বেশি। কিন্তু রাস্তাঘাট, সেতু নির্মাণে বা শক্তি উৎপাদনে ব্যয় সর্বভারতীয় গড় ব্যয়ের তুলনায় কম।
হালে, কয়েকটি বিজনেস পত্রিকার ভবিষ্যতবাণী হচ্ছে, এই অর্থবর্ষে রাজ্যগুলির মিলিত আর্থিক ঘাটতি মোট আভ্যন্তরীণ আয়ের ৩.৪ শতাংশে পৌঁছোতে পারে। এর একটা কারণ অবশ্যই সপ্তম বেতন কমিশনের রায়, যা অধিকাংশ রাজ্যেই লাগু হয়েছে। কিভাবে কেন্দ্র এবং রাজ্যের আর্থিক ঘাটতি কমানো যায়, তা নিয়ে প্রাক্তন রাজস্ব সচিব এন কে সিংহ কমিটি ইতিমধ্যেই তাঁদের রিপোর্ট জমা দিয়েছেন। কিন্তু রিপোর্টে যাই বলা থাকুক, সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যেক দশ বছর অন্তর মাইনে বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় রাশ টানা না গেলে এবং ইলেকশন জেতার জন্য দেদার প্রতিশ্রুতি দেওয়া বন্ধ না হলে ঘাটতিতে কোনওভাবেই রাশ টানা সম্ভব হবে না।
লেখক – অবসরপ্রাপ্ত রাজ্য সরকারি সচিব