বাড়ির পাশে বরফের দেশে

আনন্দ

0

শীতকালে ঠান্ডার জায়গায় ঘুরতে যাওয়া এখন একটা ফ্যাশান। ঠান্ডার মধ্যে গায়ে মোটা জাম্পার চাপিয়ে আগুনের দিকে পা বাড়িয়ে গ্লাসে চুমুক দেওয়া আর ফেসবুকে আপডেট চেঞ্জ করা ‘ফিলিং হট ইন ফোর ডিগ্রি’। সত্যিকারে ঠান্ডায় ঘুরতে হলে শীতে যেতে হবে বরফের দেশে। আর সেই বাড়ির পাশে বরফের দেশের  কথাই বলব এবার।
মানেভঞ্জনে মোমো খেতে খেতে ভাবছি, এবার কী করণীয়? সামনে এগোনোর কোন‍ও গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না।
শীতের সান্দাকফু দেখতে যাব বলে গত রাতে শিয়ালদহ থেকে ট্রেন ধরে, আজ এনজিপি নেমে এখন মানে’তে। ইচ্ছে ছিল আরেকটু এগিয়ে ধোত্রে থেকে পায়ে হাঁটব। কিন্তু গাড়ির অভাব। অগত্যা বেলা না বাড়িয়ে কাঁধে নিলাম রুকস্যাক, পা বাড়ালাম মেঘমার দিকে।
আজ গন্তব্য টংলু। হালকা চড়াই রাস্তা। বুকে কোনও হাঁফ না ধরিয়েই আস্তে আস্তে উঠে যাওয়া যায়। তায় যদি মেঘমার ‘দিদির দোকান’-এর মতো চায়ের দোকান থাকে। অতএব একপ্রস্থ চা পানের পালা।
চা খেয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি, চারদিক মেঘে ঢেকে গিয়েছে। যেদিকে তাকাই সেইদিকই সাদা। দূরের কোনও কিছুই দেখা যাচ্ছে না। যেহেতু চেনা রাস্তা, তাই হোয়াইট আউট-এর মধ্যেই রওনা দিলাম।
কিছুটা এগোতেই টংলু ট্রেকার্স হাটে ঢোকার আগে প্রথম বরফ দেখলাম। এর আগে অনেকবার অনেক জায়গায় বরফ দেখেছি। প্রচুর বরফের মধ্যে দিয়ে হেঁটেছি। কিন্তু প্রতিবারই বরফ দেখলে সেই প্রথম দেখার মতই অনুভূতি হয়।
আমার বন্ধু হিমিকা এবার এসেছে আমার সাথে। বরফ দেখে ও যতটাই আনন্দিত, ততটাই উত্তেজিত। আসলে ফ্রিজের বাইরে ওর এই প্রথম বরফ দেখা। কী করবে না করবে ঠিক ভেবে উঠতে পারছে না। হাতে করে বরফ তুলে ছুড়ে মারছিল আমার দিকে। বেশ মজা লাগছিল ওকে দেখে। ঘরে ঢুকে জিনিসপত্র রেখে এসে বসলাম রান্নাঘরে। সারা হাটের মধ্যে এই ঘরটাই সবচেয়ে আরামদায়ক।
গরম চাউমিন খেতে খেতে কেয়ারটেকারের ছোট মেয়েটার গতবারের তোলা একটা ছবি ওকে দিলাম। ওরা আনন্দে আপ্লুত। সামান্য পোস্টকার্ড ছবিতেই ওদের কী আনন্দ। সবার হাতে হাতে ঘুরছে ছবিটা। মনে হচ্ছিল, এরা কত সামান্যতেই খুশি। আর আমরা শহুরে ‘বাবু’রা সবসময়ই ‘আরও চাই, আরও চাই’ করতে থাকি।
এদিকে রাত নেমে এসেছে। ঠান্ডা কাঁপিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আমরা খাওয়া সেরে দুটো করে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম। বাইরে প্রচন্ড হাওয়া চলছে। টংলু’টা একটা পাহাড়ের মাথায় তাই খুব হাওয়া দেয়। হাওয়ার গান শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই।
পরের দিন ভোর। গরম চায়ের গ্লাস হাতে নিয়ে ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সূর্যদেব সবেমাত্র উঁকি দিয়েছেন। পাহাড়ের সূর্যোদয়ের মধ্যে কোথায় যেন একটা অদ্ভুত ভাল লাগা রয়েছে। বারবার দেখলেও পুরনো হয় না। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকটা মেঘে ঢাকাই থাকল।
প্রাতরাশ সেরে রওনা দিলাম ‘কালপোখরি’র দিকে। প্রায় আট কিলোমিটার। সেখানেই দ্বিতীয় রাত্রিবাস।
ট্রেকার্স হাটের নিচের রাস্তা বরফে ভর্তি। ঝুরঝুরে নয়, বেশ শক্ত। গাড়ি গিয়ে বরফকে চেপে আরও শক্ত করে দিয়েছে। এখানকার ল্যান্ডরোভারগুলো চাকায় লোহার চেন বেঁধে বরফের উপর দিয়ে সান্দাকফু যায়। কিছুটা এগিয়ে পেলাম বরফশূন্য রাস্তা। কিন্তু দু’ধারে বরফ পড়ে আছে। আর চারপাশের গাছগুলোতে বরফ জমে যেন শ্বেতপাথরের তৈরি মনে হচ্ছে। ছোটছোট ঝোপগুলোতে এমনভাবে বরফ পড়েছে, যেন পথের ধারে অজস্র সাদা ফুল ফুটে রয়েছে।

flower of ice

একটু এগোতেই পৌঁছে গেলাম ‘জৌবারি’ গ্রামের মণি পাঁচিলের কাছে। পাঁচিলের গায়ে মন্ত্র খোদাই করা থাকে। এখানকার মানুষের বিশ্বাস, এই পাঁচিলের জন্য গ্রামের মধ্যে কোনও অপদেবতা বা অশুভ শক্তি ঢুকতে পারে না। গ্রামে ঢোকার মুখেই একটা মন্দির। পূজারি এগিয়ে এসে আমাদের কপালে টিকা পড়িয়ে দিলেন। আমরাও আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দক্ষিণা দিলাম। মাঝেমধ্যে পথে বাচ্চাদের সাথে দেখা হচ্ছে। আমাদের লজেন্সের কিছুটা ভাগ নিয়ে দৌড়ে চলে যাচ্ছে।
মজার কথা, আমরা এখন নেপালে, মানে বিদেশে। সান্দাকফু যাওয়ার দুটি রাস্তা আছে, একটি ভারতের আর দ্বিতীয়টি নেপাল দিয়ে। নেপালের রাস্তাটা ছোট।
আবহাওয়া খারাপ হয়ে আসছে। কখনও হালকা কুয়াশার মতো মেঘ ছেয়ে ফেলছে, তো কখনও ভারি মেঘের মধ্যে দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে। বেশ ভাল ঠান্ডা লাগছে। তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে আসার জন্যে তেমন গরম জামাকাপড় আনা হয়নি। হঠাৎই রাস্তার বাঁদিকে, একটু উপরে একটা দোকান দেখে চায়ের আশায় ঢুকে পড়লাম। ভেতরে একটি বছর কুড়ি কী বাইশের মেয়ে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে একটা কাঠের উনুন ধরাতে।
জানতে চাইলাম যে চা পাওয়া যাবে কিনা। মেয়েটি উনুনে ফুঁ দিতে দিতেই জানাল, পাওয়া যাবে। কিন্তু উনুন ধরলে তবেই। মেয়েটি সাথের বাচ্চা ছেলেটিকে আরও কিছু কাঠ আনতে পাঠাল। ওই ঠান্ডায় সামান্য কিছু পোশাক পরা বাচ্চাটির। বয়স খুব বেশি হলে বছর পাঁচেক। প্রশ্ন করে জানলাম, এই মেয়েটিরই ছেলে ও। ছেলের বাবা আছে কালপোখরি গ্রামে। সকাল থেকে দোকানে এই ঠান্ডায় মা ও ছেলে বসে আছে। কখনও কোনও পদযাত্রী যদি দু’কাপ চা খেতে আসেন তার আশায়। তবে কিছু পয়সা আসবে হাতে। জমিজমা বলতে কিছুই প্রায় নেই। যা আছে তাতেই বাচ্চাটির বাবা গ্রামে কাজ করছে। এতসব কথার মধ্যে চা তৈরি হয়ে গেল। আগুনের পাশে বসে ধোঁয়াকাটা দুধের গন্ধের চায়ের গরম গ্লাস দুহাতে ধরে চুমুক। নিমেষের মধ্যে এতটা হাঁটার ক্লান্তি দূর হয়ে গেল।
পয়সা মিটিয়ে রওনা দিলাম গ্রামের দিকে। ‘কালপোখরি’ মানে কালো জলের পুকুর। গ্রামে ঢোকার মুখেই একটা কালো জলের পবিত্র জলাশয় আছে। তার নামেই গ্রামের নাম।
বিকেলের আবহাওয়াটা থমথমে। বেশ বুঝতে পারছিলাম তুষারপাত শুরু হবে। বাইরের আকাশ যেমনই হোক, ঘরের মধ্যে লেপ মুড়ি দিয়ে চলছিল আড্ডা। রাতে খেতে যাওয়ার সময় দেখলাম হালকা ‘স্নোফল’ হচ্ছে।
পরের দিন সকালে উঠে বাইরের দরজা খুলতে গিয়ে দেখি, দরজা আর খোলে না। দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতে দরজাকে ইঞ্চিদুয়েক ফাঁক করা গেল। ওই ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি চারদিক সাদা। আর দরজা খুলবে কী! দরজার বাইরে প্রায় ফুটদেড়েক বরফ। শেষে আমাদের চেঁচানিতে কেয়ারটেকার বেলচা হাতে এসে আমাদের মুক্ত করল। বাইরে এসে দেখলাম আকাশের মুখ ভার। ‘স্নোফল’ হয়েই চলেছে। বুঝলাম আরও নামবে। অগত্যা ঠিক করলাম, আজ এখানেই বিশ্রাম।
মাঝদুপুরে আকাশ ফুঁড়ে হঠাৎ রোদের ঝলকানি। আর কী ঘরে থাকা যায় ! দৌড়ে বাইরে বরফের মধ্যে এসে শুরু হল ছোটাছুটি। ধবধবে সাদা তুলোর মতো বরফ। ভসভস করে পা ডুবে যাচ্ছে। সে এক দারুণ মজা। কালপোখরির কাছে গিয়ে দেখি, সে এক্কেবারে সাদাপোখরি হয়ে গিয়েছে। এসব অবশ্য বেশিক্ষণের জন্য নয়। বড়জোর আধ ঘন্টা। আবার যেই কে সেই। আবার গৃহবন্দি।
পরের দিন সকালে আকাশ দেখে মনটা খুশিতে ভরে গেল। পুরো না হলেও অনেকটা পরিষ্কার। কালপোখরি থেকে বিকেভঞ্জন যাওয়ার ট্রেক রুটটাই বেছে নিলাম। রাস্তাটায় কোনও চড়াই নেই। একেবারে পাহাড়ের গা ধরে ধরে পৌঁছেছে বিকেভঞ্জন। একটি চোর্তেনের পাশ দিয়ে উঠে এলাম গাড়ির চওড়া রাস্তাতে। সারা রাস্তার মধ্যে এই বিকেভঞ্জন থেকে সান্দাকফু, চার কিলোমিটার পুরোটাই চড়াই। আর এই পথটাই আমাদের এই ট্রেকের সবচেয়ে সুন্দর রাস্তা।
একবার কল্পনা করুন, এমন একটা রাস্তায় আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, যেটি আগের দিন ও রাতে পড়া দুগ্ধসফেন বরফে সাদা হয়ে আছে। এখান থেকে নিচে ছেড়ে আসা রাস্তাটাকে একটা সাদা ফিতের মতো মনে হচ্ছে। সামনে পা ফেলতেই, পায়ের নিচে জমে থাকা স্ফটিকের মতো বরফগুলো মুচমুচ শব্দ করে ভেঙে যাচ্ছে। এই বরফে আপনার আগে কারও পা পড়েনি।
বাঁদিকে পাহাড়ের গায়ে সাদা বরফের চাদর। মাঝেমাঝে পথের পাশের পাইন গাছ থেকে বরফ ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে। কখনও গায়ের ওপর, কখন সামনের রাস্তায়। ডানদিকের পাইন গাছগুলো ক্রিসমাস ট্রি-র মতো ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর সেইগুলোর মধ্যে বরফ পড়ে নানারকম ডিজাইন তৈরি হয়েছে। মাঝেমধ্যে ব্লু ম্যাগপাই বা গ্রিন ব্যাকড টিট-এর বক্তব্য আপনার কানে পৌঁছচ্ছে। সেই সঙ্গে সকালের সোনালি রোদ্দুর ভিজিয়ে দিচ্ছে আপনাকে। এই শব্দময় নিস্তব্ধতার মধ্যে দিয়ে আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন। পুরো পরিবেশ প্রতি মুহূর্তে ভুলিয়ে দেয় মনের ভিতর জমে থাকা দুঃখ, গ্লানি আর চড়াই চড়ার শারীরিক কষ্টকে।
চলতে চলতে আপনি যখন ক্লান্ত তখনই হঠাৎ একটা বাঁক ঘুরে সামনে দেখবেন সুন্দর সুন্দর সবুজ রঙের ট্রেকার্স হাট। আমাদের যাত্রা শেষ পর্যায়ে। আর কয়েক পা গেলেই গরম চায়ের গ্লাস আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি আর হিমিকা মালপত্র ঘরে রেখে বাইরে দৌড়ালাম ছবি তুলতে। কারণ, আকাশ এখন বেশ পরিষ্কার, কিন্তু কতক্ষণ তা তো জানি না।
আমি চলে গেলাম নেপালি দিদির হোটেলের দিকে। যেখানে ভারত ও নেপাল সীমান্তফলক দাঁড়িয়ে দুই দেশের জমি ভাগ করছে। কিন্তু মানুষের হৃদয় কোনও সীমান্তফলক দিয়ে ভাগ করা যায় কি ? না বোধহয়। নেপালি দিদি আমাকে দেখেই হাসিমুখে গরম চায়ের কাপটা এগিয়ে দেন। আমিও কাপটা হাতে নিয়ে ওই ফলকের উপরেই চেপে বসে তার সাথে সুখদুঃখের গল্প জুড়ে দিই।
ছবি- শুভদীপ দেবনাথ