চেনা রাস্তার অচেনা ভয়

আনন্দ

0

আঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে। চতুর্দিক আলো আঁধারিতে ঢাকা। ভাবলাম বাসে’তেই বসে থাকি। পাহাড়ি বৃষ্টি একটু পরেই থেমে যাবে, তখন থাকার জায়গা খুঁজব। কিন্তু বিধি বাম, বাসের খালাসিটা ওই বৃষ্টির মধ্যেই আমাদের নামিয়ে দিল। এই শুরু হল আমাদের হেনস্তা। সারা পথে যে কতবার ঘটেছে তা গুণে বলা যাবে না।
কিন্তু কেন এই হেনস্তা সেটা আগে বলি – কোনও এক মার্চ’এর শেষে, আমি আর আমার বন্ধু অমিয় ঠিক করলাম একটা সহজ রাস্তাতে সিঙ্গালিলা রেঞ্জ কে একটু ঘুরে দেখব। রাস্তা ঠিক হল, কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি, সেখান থেকে জোরথাং হয়ে উত্তরে। তারপর হাঁটা শুরু। নির্দিষ্ট কোনও থামার জায়গা এখান থেকে ঠিক করলাম না। যেখানে ভালো লাগবে সেখানেই তাঁবু ফেলব। ফিরবো, ফালুট হয়ে সান্দাকফু বা অন্য কোনও রাস্তাতে।
রাতের বাস ধরে শিলিগুড়ি পৌঁছতে দেরি হল। তাই ওখান থেকে জোরথাং পৌঁছতেও দেরি। জোরথাং পৌঁছে দেখলাম কোনও গাড়ি নেই উত্তরে যাওয়ার। সিকিম স্টেট ট্রান্সপোর্টের একটা বাস ছাড়বে বেলা চারটেতে, যেটা বেশ একটু ঘুরে ‘ডেন্টাম’ পৌঁছবে সন্ধ্যার সময়। অন্য কোনও উপায় না থাকাতে ওই বাসটাই ধরলাম। একটু বাদেই বুঝতে পারলাম দেরি হওয়ার কারণ। বাসটি ‘ডাক বাস’। আমাদের সামনের দিকে পাঠিয়ে বাস এর পেছনটা পুরোটাই ডাকের বস্তাতে বোঝাই করল। বুঝলাম এবার সারা রাস্তা ডাক নামাতে আর তুলতে তুলতে যাবে।
যেভাবে থামতে থামতে বাসটা চলছিল তাতে মনে হচ্ছে বাস এ নয় একটা চলন্ত ‘ডাক বাক্স’ তে চড়েছি। সন্ধ্যার পর ডেন্টাম পৌঁছলাম। তারপর ওই হেনস্তা। কারণ ও ব্যাটা বাসের দরজায় তালা দিয়ে একটু পান ভোজন করতে যাবে। অগত্যা বৃষ্টি মাথায় নিয়ে নামলাম। কোথায় যাব? অন্য কিছু খোঁজার সময় নেই, তাই বাস ড্রাইভারদের পানশালাতেই সোজাসুজি ঢুকে পড়লাম। পানশালাটির মালিকের নাম দাওয়া। তার স্ত্রী ও তিন মেয়ে পানশালাটি চালায়। তারা রাতে আমাদের ওখানে রাখতে রাজি নয়। কারণটা বুঝতে পারলেও আমাদের কিছু করারও নেই। যাইহোক, আমাদের অবস্থা দেখে আর খালাসির সুপারিশে থাকা ও খাওয়া দুই জুটল। খালাসিবাবু আরও অভয় দিলেন যে কাল সকালে উত্তরের জীপ এলে নিজেই ডেকে আমাদের জীপে তুলে দেবেন।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি ভোঁ ভোঁ। খালাসিবাবু নিজের বাস নিয়ে কেটে পড়েছেন। আমরা পড়লাম আতান্তরে। উত্তরের দিকে কোনও জীপ এখান থেকে যাবে না। জোরথাং বা অন্য জীপ যদি আসে তাতে যেতে হবে। বেলা ন’টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনও গাড়ি পেলাম না। খেপে গিয়ে উত্তরের দিকে হাঁটা দিলাম। মনকে বোঝালাম উত্তরে থেকে তো হাঁটতামই, নয় একটু আগে থেকেই হাঁটা শুরু করলাম। দূরত্ব খুব বেশি নয়, মাত্র ৯ কিমি। গাড়ীর রাস্তায় হেঁটে যাওয়ায় চরাই উতরাই এর কষ্ট নেই। তাই দুই বন্ধু পিঠে স্যাক নিয়ে বেশ খুশ মেজাজেই হাঁটছি। প্রায় ঘণ্টা খানেক হাঁটার পর হঠাৎ পেছনে ভোঁপ ভোঁপ। শেষ পর্যন্ত পুরোটা হাঁটতে হল না। জীপে চড়ে উত্তরে পৌঁছলাম বেলা এগারোটায়।
এই পদযাত্রাতে আমাদের বহুবার নেপাল সীমান্ত ধরে যেতে হবে। তাই এখান থেকে একটা সরকারি অনুমতি পত্র নিতে হয়। চেনা পরিচিত লোক থাকাতে কাগজ পত্র হাতে পেতে বেশি সময় লাগল না। উত্তরে একটি শান্ত নিরিবিলি পাহাড়ি গ্রাম। ডেন্টাম থেকে দুটি রাস্তার একটি গিয়েছে বিখ্যাত পেলিং শহরে। অপর রাস্তাটি এসে শেষ হয়েছে এই উত্তরে গ্রামে।এখান থেকে মহিমাময় কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় না ঠিকই বা কাছাকাছি তেমন বিখ্যাত কোনও মনেস্ট্রিও নেই। কিন্তু দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে, হাল্কা শিস ভাঁজতে ভাঁজতে জঙ্গলের পথে ঘুরে বেড়ানোর এক অপূর্ব জায়গা এই উত্তরে। দুটো দিন শান্তি ও নিরিবিলিতে নিজের মতো করে কাটানোর জন্য উত্তরের থেকে ভালো জায়গা আমার জানা নেই।

junglej

কিন্তু আজ আর এইসব ভাবব না কারণ আমাদের এগিয়ে যেতে হবে চিত্রের দিকে। চিত্রের দূরত্ব ৮ কিমি। আর আমাদের যা ভাগ্য তাতে বিকেলে না আবার ভিজতে হয়।সুন্দর পাথর বাঁধানো রাস্তা। অজস্র শুকনো পাতা পড়ে একটা পুরু গালিচা তৈরী করেছে পথের ওপরে। পা যদি পিছলে যায়ও তবে আলুর দম হওয়ার চান্স নেই। দু পাশে বাঁশ আর আদ্যিকালের বিশাল বিশাল গাছ। গাছের গা থেকে বটের ঝুরির মতো অজস্র মস’এর ঝুরি নেমে এসেছে। একটু কল্পনা শক্তি থাকলে, জুরাসিক এজ-এ পৌঁছে যেতে অসুবিধে হবে না। কিন্তু আমার পৌঁছনো হল না। জুরাসিক এজ- এও তো পেটে খিদে পায়। সেই সকালে এক কাপ চা খেয়ে ডেন্টাম থেকে বেড়িয়েছি। দৌড়াদৌড়ির ঠ্যালায় খাবার সময় পাওয়া যায়নি। ডাক দিয়ে অমিয়কে দাঁড় করালাম। খাবারের কথা বলাতে জবাব দিল যে সবে তো হাঁটা শুরু, আগে সকালের চা হজম হোক তারপর তো অন্য খাওয়া। তাছাড়া এখন খেলে নাকি রাতের দারুন খিচুরিটা খেতে পারব না। অতএব, চরৈবেতি চরৈবেতি। হাঁটতে অবশ্য খারাপ লাগছিল না। সুন্দর ছায়াঘন পাহাড়ি পথ। খুব একটা চরাই নেই। বিকেলের শেষ আলোতে এসে পৌঁছলাম চিত্রের বাংলোতে।
চারদিকের পাইন , ফার আর রডড্রেনডনের জঙ্গল। তার মাঝখানে একটি পান্না সবুজ সমতলভুমিতে বাংলোটি। প্রায় নতুন , কিন্তু অব্যবহার্যের ছাপে মলিন। সুন্দর রান্নাঘর আছে, জলের কোনও ব্যবস্থা নেই। কিছুদুরে একটা ঝোড়া আছে। পাইপ দিয়ে সেই জল হয়ত আসত রান্না ঘরে। আজ আর সেই পাইপ নেই। এই বাংলোটি পরিত্যক্ত। লোকে বলে এটি ভূত বাংলো। বাংলোটি তৈরি হওয়ার পরে পরেই এক বিদেশি পদযাত্রী এখানে রাত কাটাতে এসে মারা যান। স্থানীয় লোকদের বিশ্বাস তার বিদেহী আত্মা এই বাংলোতে ঘুরে বেড়ায়। মজার কথা এটি কিন্তু সরকারি বাংলো। আর সরকার ও ভূতে ভয় পায়। তাই এই বাংলো সর্বাঙ্গ সুন্দর হয়ে, এত সুন্দর জায়গাতে অবস্থিত হওয়াতেও আজ পরিত্যক্ত।

IMG027

 সাহেব ভূত থাকুন আর নাই থাকুন, বিনিপয়সায় এত সুন্দর বাংলোতে রাত কাটানোর সুযোগ ছাড়তে রাজি নই। তাই ঝটপট একটা ঘরের মেঝে বেশ খানিকটা পরিস্কার করে ম্যাট আর ঘুম ব্যাগ পেতে ফেলা হল। সকালের চা হজম হয়ে পেটের নাড়ি ও হজম হওয়ার জোগাড়। প্রথমেই ঝোড়া থেকে জল এনে কড়া করে কফি তৈরি হল। তারপর পেঁয়াজ ফোঁড়ন দিয়ে মুসুর ডালের খিচুড়ি সাথে পাঁপড় ভাজা, জম্পেশ ডিনার। সারাদিনের খাটনির পরে ভরপেট খাওয়ায় চোখের পাতায় ঘুম জড়িয়ে এল। মোমবাতি নিভিয়ে সটান ঘুম ব্যাগের ভিতর। সে রাতে ভয় পাওয়াতে হলে সাহেব ভূতকে আগে আমাদের ঠেলে গুতিয়ে জাগাতে হত তারপর ভয় পাওয়ানো। আবার হয়ত ভূত নিজে ট্রেকার ছিলেন বলে আমাদের দেখে মায়া হয়েছে। মোদ্দা কথা, সারা রাত আমরা নাক ডাকিয়ে ঘুমিয়েছি।
পরের দিন সকালে মালপত্র বেঁধে ছেঁদে রওনা দিলাম ছিয়াভঞ্জনের দিকে। প্রথমেই টানা চরাই নিয়ে গেল একটা রিজের মাথায়। ওপর থেকে নিচের চিত্রে বাংলোকে খুব সুন্দর লাগছে। ধীরে ধীরে উচ্চতা বাড়ার জন্য অন্য গাছের থেকে  রডড্রেনডনের প্রভাব বেশি। এদিকে লাল রডড্রেনডন অনেক। সব গাছেই কুঁড়ি ধরে আছে। ফুল প্রায় কোনও গাছেই নেই। আফশোস হচ্ছে, জানা ছিল মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝ পর্যন্ত লাল গুরাস (রডড্রেনডনের স্থানীয় নাম) ফোটে আর এপ্রিল থেকে মে’এর শেষ পর্যন্ত ফোটে সাদা গুরাস। সেই হিসেব করেই এবার বেরনো। নিচে অল্প কিছু ফোটা ফুল পেয়েছি। আর কিছুটা হাঁটলেই পৌঁছে যাব ছিয়াভঞ্জন (১০,৩০০ ফিট)। ওখানে সিকিম পুলিশের শেষ ক্যাম্প। কাগজ পত্র পরীক্ষা করবে। আমরা আজ ওখানে থাকব না, আরও কিছুটা এগিয়ে যাব। ফোকটে ধারের (১২,৩০০ ফিট) নিচে থাকব। ধার মানে রিজ টপ। ওটাকে টপকেই চলে যাব ফালুট’এর রাস্তায়। ব্যাপারটা যত সহজে বলে দিলাম, ঘটনাগুলো কিন্তু এত সহজে ঘটেনি।
ছিয়াভঞ্জন পৌঁছে কাগজ পত্র দেখিয়ে, এক কাপ করে কন্ডেন্স মিল্কের চা পান করে, এক অসম্ভব লাল গুরাস ভরতি রডড্রেনডনের গাছ দেখে, পথে নামলাম। কিছুটা চলার পর চারপাশ white out –এ সাদা হয়ে আসতে শুরু করল। একে রাস্তা অজানা তায় আমাদের সাথে কোনও গাইড নেই। ঠিক করলাম একটু অপেক্ষা করব। white out একটু হাল্কা হলে, চারপাশ কিছুটা দেখা গেলে আবার চলা শুরু করব। চারদিক সাদার মাঝে ঠিক কোথায় আছি বা কতদূর যেতে হবে তা হদিশ করা মুশকিল। কিন্তু ওই যে ডেন্টামের ভাগ্য। একটু বাদে হাল্কা স্নোফল শুরু হল। আকাশের চেহারা বলছে গতিক সুবিধের নয়। একপ্রকার বাধ্য হয়েই হাঁটতে শুরু করলাম। বেশ কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর একটা তাঁবু লাগানোর মতো জায়গা চোখে পড়ল। একেবারে সমতল নয়, একটু ঢালু। এরমধ্যে স্নোফলের মাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছে।  আমরা ঠিক করলাম, অন্ধের মত না এগিয়ে এখানে আজ তাঁবু করব। কাল যা হয় দেখা যাবে। চারপাশের জমির কোনও অংশ আর কালো নেই, সব সাদা। অবশ্য জমি যে খুব বেশি দেখতে পাচ্ছিলাম তাও নয়।
সময় যতই যেতে থাকল, স্নোফল আরও বাড়তে থাকল। রাতে ডিনার তাঁবুর ভেতরে রান্না করতে হবে। তাই আইটেম হল সংক্ষিপ্ত, ডাল আর আলু সিদ্ধ। বাইরে সদ্য জমা দুধ সাদা বরফ ডেকচি ভরে এনে জল তৈরি করে নিলাম। রাত যত বাড়ছে ঠাণ্ডা তত বাড়ছে। এদিকে বরফ জমে যাচ্ছে তাঁবুর গায়ে। শুয়ে পড়ার আগে যতটা পারলাম বরফ পরিষ্কার করে দিলাম। বেশি রাতে কি হবে জানিনা। সিনিয়ারদের কাছে অনেক ঘটনা শুনেছি যেখানে বরফের চাপে তাঁবু ভেঙ্গে অভিযাত্রীদের চিরশয়ানে শুয়ে দিয়েছে। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুম ব্যাগের ভেতরে ঢুকলাম। ঠাণ্ডার ঠেলাতে ঘুম আসছে না, তার ওপর প্রচণ্ড হাওয়ায় বাইরে বিচিত্র সব আওয়াজ হচ্ছে। বুঝতে পারছি তাঁবুর ছাদের কাপড় বরফের ভারে একটু একটু করে নেমে আসছে। ভেতর থেকে হাত দিয়ে যতটা পারছি ঠেলে ফেলছি। অসম্ভব ক্লান্ত লাগছে। বাইরে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলেছি।
এক কষ্টকর রাত শেষ করে ভোরে বাইরে এসে দেখি চারপাশ সাদা আর সাদা। অন্য কোনও রঙ নেই। গাছপালা সাদা, মাটি সাদা, আকাশের রঙ ও সাদা। মাঠের শেষ আর আকাশের শুরু যে কোনখানে তা বোঝার জো নেই। সামনের রাস্তা যে কোথায় সেটা খুঁজতে গ্রে হাউন্ড লাগবে। কোনওরকম ঝুঁকি নেব না এই চিন্তা করে ঠিক করলাম আজ এখানেই থাকব। বেলায় আবহাওয়া একটু ঠিক হলে কিছুটা এগিয়ে রাস্তাটা রেকি করে আসব। কিন্তু বেলা বাড়ার সাথে সাথে আবার স্নোফল শুরু। দুপুরে চিরেভাজা,চানাচুর,পেয়াজ-লঙ্কা দিয়ে লাঞ্চ। রাতের দিকে স্নোফল থেমে, আকাশ পরিষ্কার হয়ে গেলেও আমরা ডালের স্যুপ আর আলুসিদ্ধর ডিনারই রাখলাম।
ঝকঝকে সুন্দর সকাল, বরফের ওপর সোনা গলানো রোদ, দূরে মহিমাময় কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাদের সুপ্রভাত জানাল। আমরাও খুশিতে হাত – পা গুলো রোদে সেঁকে নিয়ে তাঁবু গুটিয়ে রওনা দিলাম। প্রথমে বেশ কিছুটা ভুল রাস্তাতে হেঁটে নেমে গেলাম ভার্সের দিকে। পরে ভুল বুঝতে পেরে আবার নতুন রাস্তা ধরে রওনা দিলাম পাসের দিকে। এখানে কোনও নির্দিষ্ট মার্কিং না থাকার জন্য রাস্তা খুঁজে এগোতে হচ্ছিল। তাই আমাদের চলার বেগ ছিল কম। কিছুক্ষণ বাদে আবার মেঘের খেলা শুরু। মাঝে মাঝেই একটা মেঘের চাদর এসে চারদিক সাদা করে আমাদের ঢেকে দিচ্ছে। আবার একটু বাদে পরিষ্কারও হয়ে যাচ্ছে। একটা রিজের মাথা ধরে হাঁটছি। দু’পাশে দুই দেশ। একদিকে ভারত আর অন্যদিকে নেপাল। মাঝে মাঝে ডিমার্কেশন পিলার পাচ্ছি। আর আবিষ্কার করছি প্রতি মুহুর্তের বিদেশ ভ্রমণ। কারণ রাস্তা তৈরি না থাকাতে কখনও নেপাল বা কখনও ভারত দিয়ে হাঁটছি।
ইতিমধ্যে মেঘের পর মেঘ জমেছে, প্রচণ্ড হাওয়া দিচ্ছে। ভীষণ ঠান্ডা লাগছে। white out এর ফলে সামনের রাস্তা ও বোঝা যাচ্ছে না। সঠিক দিকে যাচ্ছি কিনা তাও বুঝতে পারছি না। সকাল থেকে অনেকটা হাঁটাও হয়ে গেছে। হিসেব মতো এতক্ষণে পাস পেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। আমাদের মনে সন্দেহ দেখা দিচ্ছে। ঠিক করলাম বোকার মতো না হেঁটে এক জায়গাতে স্যাক দুটো রেখে দুজন আলাদা আলাদা রাস্তাতে গিয়ে আগে রেকি করে আসব। এদিকে আকাশের অবস্থাও ভালো লাগছে না। তারপর এই কনকনে হাওয়া। উইন্ডচিটার ভেদ করে সরাসরি হাঁড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
ইতিমধ্যে অমিয় নিচের রাস্তাতে একটা গোট হাট খুঁজে পেয়েছে। আমরা ওখানেই সাময়িক শেল্টার নেব ঠিক করলাম। হাটে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ আর ভেতরে একটা ‘হাউন্ড অফ বাস্কারভিল’ এর মতো ভয়ানক পাহাড়ি কুকুর। আমাদের দেখেই কুকুর যা হাঁক ডাক শুরু করল তাতে বুঝলাম ঢোকার চেষ্টা করলে তা প্রাণান্তকর হতে পারে। এই গোট হাট গুলো যারা পাহাড়ে ছাগল ভেড়া চড়ায় তারা তাদের থাকার জন্য তৈরি করে। এখানেও তাই আর সেই ভেড়া ছাগল পাহারা দেওয়ার জন্য যে কুকুর থাকে সেটাই এখন হাটকে পাহারা দিচ্ছে। কাছে গেলে ছিঁড়ে ফেলবে।
এদিকে ঠান্ডার প্রকোপ বাড়ছে। চারদিক সাদা হয়ে গেছে। এত তীব্র হাওয়া যে গায়ে কিছু পড়ে আছি মনে হচ্ছে না। স্যাকের ওজন বাড়াব না আর আবহাওয়া ভালো থাকবে এটা ধরে নিয়ে মূর্খের মতো শুধু একটা পাতলা উইন্ডচিটার এনেছি। তার ফল এখন সঠিকভাবেই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কিছু সময় পর বুঝলাম এভাবে হাওয়া খেতে থাকলে অচিরেই আমার প্রাণবায়ু হাওয়াতেই মিলিয়ে যাবে। আশেপাশে কোথাও তাঁবু বসানোর মতো একটু জায়গা ও নেই। বাধ্য হয়ে তাঁবুর আউটারটাই গায়ে জড়িয়ে হাটের সংলগ্ন শুয়োরের খোয়াঁড়ের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। কপাল এমন খারাপ তাতে শুয়োরও ছিল না।  এদিকে বেলা শেষ হয়ে আসছে। ঈশ্বরকে ডাকার মতো হাটের মালিককে প্রাণপণ ডেকে যাচ্ছি। আর এদিকে প্রচন্ড ঠান্ডাতে আমাদের শক্তি শেষ হয়ে আসছে। শেষ উপায়, হাটের দরজা ভেঙ্গে কুকুরটার সাথে লড়াই করে ঘরে ঢোকা। যদিও তাতে আমরা আর কুকুরটা দুজনেই কেউ ভাল থাকব না।
ঠিক এই ক্লাইমেক্সে আবির্ভূত হলেন হাটের মালিক শেরিং। একটা বিশাল কাঠের গুঁড়ি কাঁধে নিয়ে। সে নেপালি ছাড়া কিছু বোঝে না আর আমরা এক বর্ণ নেপালি বলতে পারি না। কিন্তু মজার কথা, ভাষা এক মুহুর্তের জন্য ও আমাদের মধ্যে অন্তরায় হয়নি। সে মুহুর্তের মধ্যে আমাদের হাটের ভেতরের আগুনের চুল্লীর পাশে নিয়ে বসাল। বেশ ভালো করে একটা আগুন তৈরি করে তাতে একটা বড় ডেকচি চাপিয়ে নমকিন চা বসাল। দশ মিনিটের মধ্যে আমরা এক মগ করে নমকিন চা হাতে নিয়ে আগুনের পাশে বসে আরামে চুমুক দিতে থাকলাম। এক ঘণ্টা আগের অবস্থাটা এখন স্বপ্ন মনে হচ্ছে। আবার বিশ্বাস করলাম, ঈশ্বর মানুষের মধ্যেই বাস করেন।
রাতে শেরিং ভাত আর ইয়াকের দুধের মাখনে ভাজা শাক রান্না করল। মনে হল অমৃতের স্বাদ পেলাম। এক জন মানুষ এমন দু জন মানুষকে আশ্রয় দিল, নিজের ভাগের থেকে রান্না করে খাওয়াল, যাদের সে কয়েক ঘণ্টা আগেও চিনত না বা ভবিষ্যতেও পরিচয় থাকবে না। এ বোধহয় আমাদের সরল, গ্রাম্য, পাহাড়ি মানুষের পক্ষেই সম্ভব। এদের সামনে  আমাদের শহুরে, উন্নাসিক মন অত্যন্ত হীন হয়ে যায়। নিজের মাথা আপনিই ঝুঁকে আসে এইসব মানুষের কাছে। রাতে আগুনের পাশে শুয়ে এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেছি।
ঘুম ভাঙল শেরিং এর সকালের চা করার শব্দে। ওর এই ডেকচিতে সারাদিনই ইয়াকের দুধের নমকিন চা হয়। আর সারাদিনে যতবার ইচ্ছে খাওয়া হয়। এই ঘন দুধের চা আর বিস্কিট দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে শেরিং এর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। আজ সকালে একদম ঝকঝকে আবহওয়া। কালকের সেই ভয়ঙ্করের কিছুমাত্র চিহ্ন নেই। কাল যে কুকুরটা হাটে ঢুকতে দিচ্ছিল না সে আজ আমার নাক, মুখ চেটে তার আদর জানাচ্ছে। এরপর থেকে আর আমাদের রান্না করে খেতে হবে না, তাই আমাদের যা খাবার ছিল সব শেরিং’কে দিয়ে দিলাম। ও অনেকটা এসে আমাদের ফালুটের রাস্তা দেখিয়ে দিল।
আমি আমার ঈশ্বরকে তার স্বর্গে রেখে ফিরে চললাম সেই পুরনো পৃথিবীতে, যেখানে চেনা মানুষগুলো একটু স্বার্থের জন্য অচেনা পশুতে পরিণত হয়।
ছবি- প্রতিবেদক।