মুসলিম নারীরা ‘মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে’র অক্টোপাস থেকে মুক্তি চায়

গিয়াসুদ্দিন

0

মুসলিম ব্যক্তিগত আইন শরিয়া আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ । শরিয়া আইন সম্পর্কে মুসলিম সমাজের ধর্মগুরুরা যা যা বলেন  তা হলো, এ আইন যেহেতু খোদ আল্লাহ তা’আলার সৃষ্টি,  তাই এর মধ্যে  কোনো ভুল নেই, ভুল থাকতে পারে না  । তাঁরা আরো বলেন,  এত ভালো ও সর্বাঙ্গ সুন্দর আইন তৈরী করা মানুষের সাধ্যের অতীত । কারণ মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা আছে, মানুষের মনের সংকীর্ণতা আছে, মানুষের মধ্যে পক্ষপাতিত্ব  আছে এবং সর্বোপরি মানুষ কখনই ত্রুটিমুক্ত নয় । তাই  মানুষের তৈরী আইনে নানা ভুল-ত্রুটি থাকে  ।  আর তাইতো  মানুষকে তাদের নিজেদের  তৈরী করা আইন বারবার সংশোধন করতে হয়,  সংযোজন করতে হয়, কিংবা  বাতিল  করে  আবার নতুন   আইন  প্রণয়ন করতে হয় । কিন্তু আল্লাহপাক  যেহেতু মহাজ্ঞানী, সর্বজ্ঞ, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, মহান ও উদার, মানুষের প্রতি দয়াবান ও সহানুভূতিশীল, এবং যাবতীয় ভুল-ত্রুটির ঊর্দ্ধে,   তাই আল্লাহর তৈরী করা  প্রত্যেকটি আইন’ই সকল মানুষের স্বার্থবাহী হয় এবং হয় সর্বাঙ্গ সুন্দর,  নিখুঁত,  নির্ভু্‌ল,  ত্রুটিমুক্ত  ও  চিরন্তন । ফলে আল্লাহর আইন বাতিল করার প্রয়োজন হয় না,  এমনকি সংশোধন ও সংযোজনেরও প্রয়োজন হয় না ।  সুতরাং মুসলিম ব্যক্তিগত  আইন চিরন্তন ।
পৃথিবীতে অধিকাংশ মুসলিম দেশই শরিয়ত আইন ও মুসলিম ব্যক্তিগত আইন সম্পর্কে মুসলিম ধর্মগুরুদের উপরে উল্লেখিত বাখ্যা ও বিশ্লেষণকে বালখিল্য বা পাগলের প্রলাপ বলে মনে করে ।  অধিকাংশ দেশই বিশ্বাস করে যে  শরিয়া আইন পশ্চাদপদ, অগণতান্ত্রিক ও বর্বর আইন  এবং আধুনিক যুগ ও সভ্য সমাজের পক্ষে একেবারেই বেমানান ও অনুপযুক্ত  । তাই  শরিয়া ফৌজদারী  আইন তো মুষ্টিমেয় কয়েকটি মুসলিম দেশ ছাড়া বাকি সকল মুসলিম দেশই  সম্পূর্ণ  বাতিল করে দিয়েছে, এবং তারই পাশাপাশি  মুসলিম ব্যক্তিগত  আইনেও  তারা ব্যাপক সংশোধন  করেছে ।  যে দেশগুলি মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে সংশোধন ও সংযোজন করেছে সেই দেশগুলির কয়েকটি হলো তিউনিসিয়া, মরক্কো, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইরান, তুরস্ক, লিবিয়া, আলজিরিয়া, মিশর, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ইত্যাদি । এখন প্রশ্ন হলো,  ভারতের মুসলিমরা  মুসলিম ব্যক্তিগত আইন সম্পর্কে  কী ধারণা পোষণ করেন ?  ভারতে এখনও মুসলিম ব্যক্তিগত আইন সম্পূর্ণ অপরিবর্তিতই রয়েছে । তাই আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে  ভারতের মুসলিম সমাজ  মুসলিম ব্যক্তিগত আইন সম্পর্কে উলামার [মুসলিম সমাজের ধর্মগুরু সমাজ] বাখ্যা ও বিশ্লেষণের সঙ্গে সহমত পোষণ করে ।  কিন্তু, না, এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত । সমগ্র  মুসলিম সমাজ এই আইন সম্পর্কে উলামার সঙ্গে মোটেই  সহমত নয়  এবং চিরন্তন বলে মনে  করে না । ভারতের মুসলিম পুরুষদের মধ্যে এই আইন নিয়ে বিস্তর  মতভেদ আছে । তবে আশার কথা এই যে, নারীদের মধ্যে কার্যতঃ কোনো মতভেদ নেই । ভারতীয় মুসলিম নারীরা প্রায় একশ’ শতাংশই  এই আইনের বিরোধী । তারা মনে করে যে এই আইনটি  নারী-বিরোধী এবং  তাদের স্বার্থের পক্ষে খুবই হানিকর  ।  তারা এই আইনটির সংস্কার বা  বিলোপ চায় ।  চায়  একটি  নতুন আইন  ।
হ্যাঁ, সাম্প্রতিক কালের একটি সমীক্ষা থেকে এই তথ্যটি উঠে এসেছে । ৯২% নারী বলেছে যে মুখে মুখে তিন তালাক দেওয়ার যে আইনটি আছে তা তারা সমর্থন করে না । ২০১৩ সালের জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ভারতের দশটি রাজ্যে ৪৭১০ জন নারীর মধ্যে একটি  সমীক্ষা চালানো হয় । তাদের মধ্যে  ৯২.১% নারীই বলেছে যে তারা মৌখিক  তালাক  আইনের অবসান চায় ।    এমন  একটা আইন তারা চায় যাতে পুরুষরা একতরফা খেয়াল খুশীমতো  তালাক দিতে না পারে ।   তারা চায় সালিশি বা আদালতের মাধ্যমে তালাকের বিষয়টা যেনো নিষ্পত্তি হয় । সমীক্ষায় তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে একটা ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে এসেছে । তা হলো এখন পুরুষরা তালাক দেওয়াকে আরো সহজ করে তুলেছে । আগে কোরানীয় পদ্ধতি মেনে স্বামী স্ত্রীকে সামনা সামনি তালাক দিত । এখন পুরুষরা তালাক দেওয়ার ক্ষেত্রে মোবাইল, টেক্সট মেসেজ, হোয়াটস আপ, স্কাইপ, ইমেইল, ইত্যাদি মাধ্যমগুলো ব্যাপক হারে  ব্যবহার করছে ।  মুসলিম সমাজের একাংশ এভাবে তালাক দেওয়া ইসলাম-সম্মত নয় বললেও  ইসলামি পণ্ডিতরা তাদের আপত্তিকে গ্রাহ্যের মধ্যে আনছেন না । এতে তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না । কারণ স্বয়ং মুহাম্মদ এবং তাঁর পরে দ্বিতীয় খলিফা ওমর ফারুক কোরানের জটিল তালাক আইনকে  অনেকটাই  সরল সহজ  করে দিয়ে গেছেন  ।  কোরানে তালাক দেওয়ার বিধান হলো, স্বামী  যদি মনে করে যে  স্ত্রীর  আচরণে দাম্পত্যজীবন দুঃসহ হয়ে উঠেছে তবে সে প্রথমে  এক তালাক দেবে । তার একমাস পর  পরিস্থীতির উন্নতি না হলে অর্থাৎ স্বামী  স্ত্রীর প্রতি সন্তুষ্ট না হলে    দ্বিতীয় তালাক দেবে ।  তার একমাস পরও স্বামী যদি স্ত্রীর প্রতি  অসন্তুষ্ট থাকে তবে তৃতীয় ও চূড়ান্ত তালাক দেবে । কোরানের এই পদ্ধতিকে  সংশোধন করে যান স্বয়ং মুহাম্মদ এবং তাঁর প্রিয় সাহাবি ও দ্বিতীয় খলিফা  ওমর ফারুক । তাঁরা বলেন যে, স্ত্রীর প্রতি অসন্তুষ্ট স্বামী তার স্ত্রীকে একসঙ্গে পরপর তিন তালাক দিলেও সে  তালাক বৈধ ও কার্যকর হবে । তাই  মুহাম্মদের জীবদ্দশাতেই  এই তিন তালাক  আইন শরিয়তি আইন হিসেবে  হিসেবে স্বীকৃতি পায় ।  তবে এর  ব্যাপক প্রচলন শুরু হয় ওমরের খেলাফতের সময় ।   সুতরাং ইন্টারনেটের যুগে তালাক দেওয়ার পদ্ধতিটি আরো সহজ করে মোল্লা-মুফতিরা কিছুই ভুল করেন নি, বরং তাঁরা ইসলামের ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করেছেন । প্রসঙ্গতঃ  উল্লেখ্য যে  শরিয়তি তালাক আইন সম্পূর্ণ একপেশে ও পুরুষকেন্দ্রিক । এই আইনে   স্ত্রীদের না আছে তালাক দেওয়ার অধিকার, না আছে তালাক প্রতিরোধ করার অধিকার ।  ইসলামি পণ্ডিতরা অবশ্য বলেন যে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে স্ত্রীদেরও তালাক দেওয়ার বিধান আছে যেটাকে খুলা তালাক বলে । না, এটা সম্পূর্ণ সত্যি নয়, আংশিক সত্যি । এবং সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, মুসলিম নারীরা খুলা তালাক দিতে চাইলে  নানা অজুহাতে তা কার্যকর করা সম্ভব হয় না । কীভাবে ও কেনো মুসলিম নারীদের খুলা তালাক দেওয়ার বিধানটি কার্যকর করা যায় না তার বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছেন ‘মুসলিম নারী ও ভারতী মুসলিম মহিলা আন্দোলন’ – এর সংগঠক নেতৃবৃন্দ  । সে সব  কথা  এখানে  আলচনা করার অবকাশ নেই, পরে অন্য   নিবন্ধে   তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে  ।
মুসলিম নারীরা শুধু  তালাক আইনের বিরুদ্ধেই নয়,  তারা বহুবিবাহের বিরুদ্ধেও । ৯১.৭% নারী জানিয়েছে যে তারা বহুবিবাহ আইনের অবসান চায় । স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে  তারা চায় না ।  কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, বা পাশ করা উচ্চ শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী  ও স্বনির্ভর মুসলিম নারীদের মধ্যে এই সমীক্ষা চালানো হয়েছে এমনটা নয় । যে নারীদের মধ্যে সমীক্ষা চালানো হয়েছে তাদের ৭৩%ই দরিদ্র পরিবারের সদস্য যাদের বাৎসরিক আয় ৫০,০০০ টাকারও কম । তাদের মধ্যে ৪৭% নারী একটি বা দুটি সন্তানের মা ।    ৫৫%  নারীরই বিয়ে হয়েছে ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে । তাদের  ৮২% নারীই গৃহকর্মী, তারা দিনরাত খাটে কিন্তু তাদের উপার্জন  কিছু  নেই, এবং তাদের  কারো নামে নিজস্ব কোনো সম্পত্তিও নেই  ।  আর একটি ভয়ঙ্কর তথ্য উঠে এসেছে সমীক্ষায়, তা হলো –  ৫৩% নারীই  পারিবারিক হিংসার [domestic violence] শিকার । ভারতের মোট  দশটি রাজ্যে এই সমীক্ষাটি  চালানো  হয়েছে । রাজ্যগুলি  হলো মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও বিহার। লেখাপড়া না জানা বা কম লেখাপড়া  জানা মুসলিম নারীরা তাদের  জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতার আলোকে  বুঝেছে যে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন তাদের কী সর্বনাশ করছে । যদিও  তাদের কানের কাছে নিরন্তর  সেই ভাঙা ক্যাসেট বাজানো হয় যে মুসলিম ব্যক্তিগত আইন স্বয়ং  আল্লাহপাকের তৈরী,  এই আইন সকলের মঙ্গলের জন্যে তৈরী করেছেন মহান ও সর্বশক্তিমান  আল্লাহ, এবং এর মধ্যেই নারীরকল্যাণ নিহিত রয়েছে,  তবুও তারা  নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝেছে যে  আইনটি যেই তৈরী করুক না কেনো, আইনটি তাদের জীবনে যন্ত্রণা আর দুঃখ-কষ্ট ছাড়া তাদের অন্য কিছু উপহার দেয়নি । তাই তারা অকপটে আইনটির পরিবর্তন বা সংশোধন  চায় । একে তো নারীরা  বেশী ধর্মপরায়ণ, তারপর মুসলিম সমাজে নারীদের উপর শরিয়ত ও পুরুষতন্ত্রের কড়া অনুশাসন এখনও বিশেষ শিথিল হয় নি, তাই মুসলিম নারীরা ব্যক্তিগত আইনের ফাঁস কেটে  বেড়িয়ে আসতে চাইছে এটা অনেকের কাছেই  অবিশ্বাস্য  মনে হতে পারে । আর ধর্মান্ধ ও  গোঁড়া মুসলিমরা তো একেবারেই  বিশ্বাস করবে না ।   ইসলামকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তৈরী করা এটা একটা ভূয়া প্রতিবেদন বলে তারা উড়িয়ে দিতে চাইবে । কিন্তু না, কোনো মুসলিম-বিদ্বেষী সংস্থা এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে নি এবং এটা কোনো  ভূয়া প্রতিবেদনও নয়  । সমীক্ষাটি করেছে মুসলিম নারীদেরই একটি সংগঠন যার নাম বিএমএমএ (ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন) ।  সংস্থাটি অনেকদিন ধরেই মুসলিম নারীদের উন্নতির  জন্যে কাজ করছে ।   পশ্চিমবঙ্গেও  এ রকম অন্ততঃ দুটি সংগঠন আছে যারা মুসলিম নারীদের উন্নতির জন্যে কাজ করছে যাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন মুসলিম নারীরাই  । সংগঠন দু’টির একটি হলো ‘রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতি’ এবং অন্যটি হলো ‘ফোরাম ফর এমপাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন ইন ইণ্ডিয়া’ ।  প্রথমটি কাজ করছে মূলতঃ মুসলিম অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদে এবং দ্বিতীয়টি কাজ করছে রাজ্য জুড়ে ।   সংগঠন দুটিও মনে করে যে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের জন্যেই মুসলিম নারীদের জীবনে দুর্দ্দশার অন্ত নেই এবং এর ফলে শুধু মুসলিম নারীরাই নয়, পিছিয়ে পড়ছে সমগ্র মুসলিম সমাজই ।  ‘রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতি’ জানিয়েছে যে শুধু মুর্শিদাবাদ জেলাতেই লক্ষাধিক তালাকপ্রাপ্তা ও স্বামী পরিত্যক্তা  মুসলিম নারী রয়েছে যাদের প্রত্যকের ২/৩ টা করে নাবালক সন্তান আছে । তারা যে কী  সীমাহীন কষ্টের মধ্যে দিয়ে জীবন-যাপন করছে তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব । এর জন্যে ‘রোকেয়া নারী উন্নয়ন সমিতি’ এবং  ‘ফোরাম ফর এমপাওয়ারমেন্ট অফ উইমেন ইন ইণ্ডিয়া’ শরিয়তি  তালাক আইনকেই  প্রধানতঃ দায়ী বলে  মনে করে । তাই  তারাও মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সংস্কারের   দাবিতে আন্দোলন  চালিয়ে যাচ্ছে  । ২০১০ সালে ৯ই ডিসেম্বর এই দু’টি সংগঠন সহস্রাধিক মুসলিম নারীকে সংগঠিত করে কলকাতার বুকে পদযাত্রা করে  মুখ্যমন্ত্রীকে ডেপুটেশন দেয় এবং সে বছরেই ২৮শে ডিসেম্বর প্রতিনিধিত্বমূলক ডেপুটেশন দেয় রাজ্যপালকে । রাজ্যপালের কাছে ডেপুটেশনে আমিও ছিলাম । মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের কাছে পাঁচ দফা দাবি পেশ করা হয় যার প্রধান তিনটি দাবি ছিলো – এক]. তালাক দেওয়ার সম অধিকার (নারী ও পুরুষের) রাখতে হবে এবং তালাক হবে আদালতের মাধ্যমে । দুই]. একাধিক স্ত্রী (বহুবিবাহ) নিষিদ্ধ করতে হবে । তিন]. উত্তরাধিকার সম্পত্তির সম অধিকার [নারী ও পুরুষের] দিতে হবে ।
তালাক আইনের একটি বিশেষ ধারা আছে  যেটা এখানে আলোচনা করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও আবশ্যক ।সেই ধারাটা এ রকম – স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার  পর স্বামী যদি  ভুল বুঝতে পেরে তার সেই স্ত্রীকে পুনরায় বিয়ে করতে চায় এবং স্ত্রীরও যদি তাতে সম্মতি থাকে তবুও তারা সরাসরি বিয়ে করতে পারবে না । এক্ষেত্রে তালাক  আইনের বিধি হলোঃ  “অতঃপর যদি সে (স্বামী) তালাক দেয়, সে (স্ত্রী) তার জন্যে বৈধ হবে না, যে পর্যন্ত অন্য ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহিত না হবে  । তারপর সে (দ্বিতীয় স্বামী) যদি তাকে তালাক দেয় এবং আল্লাহর সীমারেখা রক্ষা করতে পারবে বলে ধারণা হয়  তবে প্রত্যাবর্তনে পাপ নেই ।” (কোরান – ২/২৩০) আর দ্বিতীয় ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে নাম কা ওয়াস্তে হলে চলবে না, দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে সহবাস করাটা বাধ্যতামূলক ।  স্ত্রীজাতির প্রতি এর থেকে বেশী অবমাননা  আর হয় না । নারীর পক্ষে এর থেকে সহমরণ প্রথাও বোধ হয় মন্দের ভালো ।  মূল কথা হলো সামগ্রিকভাবে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনটিকে  শুধু  নারী-বিরোধী ও নারী-বিদ্বেষী আইন  বললেই যথেষ্ট বলা হয় না, এটা একটি অমানবিক, অসভ্য ও বর্বর আইন। স্বভাবতই এই আইনটি বিশ্বের অধিকাংশ মুসলিম দেশই বর্জন করেছে এবং ভারতের নারীরাও বর্জন করতে চায় । তবুও ভারতে এই আইনটি আজও চালু  আছে, শুধু এই কারণে যে মুসলিম  সমাজের ধর্মীয় নেতারা এই আইনে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ চায় না  । তাদের অভিমত হলো মুসলিম ব্যক্তিগত আইন ভোগ করা তাদের ধর্মীয় অধিকার । মুসলিম নারীদের অশেষ দুঃখ, কষ্ট ও নির্যাতনের বিনিময়ে তারা সেই অধিকারে ভোগ করে চলেছে । হিন্দু সমাজে ধর্মীয় নেতারাও হিন্দু ব্যক্তিগত আইনের সংরক্ষণের পক্ষেই অনড় ছিলেন, তবু নেহেরু সরকার আমলে সেই আইনটির ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে । ফলে হিন্দু সমাজে বহুবিবাহ এবং আদালতের বাইরে বিচ্ছেদ [তালাক]  সম্পূর্ন নিষিদ্ধ ।
বিজেপি বাদে সমস্ত রাজনৈতিক দলই দাবি করে যে তারা সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজের বন্ধু ।  মুসলিম সমাজের সত্যিকারের কল্যাণ করতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন মুসলিম নারীদের মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অক্টোপাস থেকে মুক্ত করা । প্রয়োজন তাদেরকে পুরুষের সমান মর্যাদা, সুযোগ,  অধিকার ও  ক্ষমতা প্রদান করা ।  আর এর জন্যে  মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের  সংস্কার করা  সবার আগে জরুরী  ।   অথচ এ বিষয়ে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিই নীরব ।  তারা নীরব, কারণ তারা  মুসলিম সমাজের প্রকৃত বন্ধু নয়,  তারা তাদের উন্নতি চায় না, চায় কেবল তাদের ভোট । সমস্ত রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দই আসলে ভোট-ভিক্ষুক ও ক্ষমতার দাস  ।  মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সংস্কারের কথা বললে  মুসলিম ধর্মগুরু ও মৌলবাদীরা চটে যাবে বলে  তারা সে কথা বলেন না । তবে শুধু ধর্মীয় নেতারাই নয়, মুসলিম সমাজের পুরুষরাও মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সংস্কার চায় না । মাওলানা-মুফতি-ইমামই হোন,  আর ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়র-উকিল-ব্যারিস্টার-অধ্যাপক-লেখক-শিল্পীই  হোন নারীর উপর প্রভুত্ব ও কর্তৃত্ব করার প্রশ্নে সবাই এক । সবাই নারীকে সমান অধিকার, স্বাধীনতা ও ক্ষমতা দিতে অপরাগ । তাই মুসলিম বুদ্ধিজীবী  সমাজ থেকেও মুসলিম ব্যক্তিগত আইন সংস্কারের দাবি ওঠেনা ।  সেজন্যেই  মুসলিম নারীরা চাইলেও অদূর ভবিষ্যতে এ দেশে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের সংস্কার হবে এমন সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ । মুসলিম নারীদের  এর জন্যে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে, তাদের অনেক অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে  ।
(প্রকাশিত মত লেখকের নিজস্ব। লেখকের বক্তব্যের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে bitarka.com আইনগত বা অন্য কোনো ধরনের কোনো দায় নেবে না।)