রবীন্দ্রনাথে আধুনিকতা

হোসে গার্সিয়া নিয়েতো

0


কয়েক দশক আগে রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র সাহিত্য নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন স্পেনীয় কবি হোসে গার্সিয়া নিয়েতোবিতর্ক’র পাঠকদের জন্য সেই লেখাটি অনুবাদ করেছেন তরুণ ঘটক

নয়াদিল্লি থেকে এক পত্র এসেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণের প্রস্তুতির সংবাদ। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র-জন্মশতবর্ষের উপলক্ষটি পালন করার উদ্দেশ্যে সারা বিশ্বকে একসূত্রে বাঁধার চেষ্টা চলছে। আজ এই কবির রচনা পড়া হয় না বললেই চলে, কবিকে ঐতিহাসিক নিদর্শনের মতো সরিয়ে রাখা হয়েছে যেন আধুনিক কবিতার পথপরিক্রমায় তাঁর কণ্ঠস্বরে শোনার মতো কিছু নেই। এবং ঘটনা হল এই যে ১৯১৩ সালের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ যাঁর আত্মার নির্দেশে আমাদের কাছে এলেন, তাঁর নাম সেনোবিয়া কামপ্রুবি এবং তাঁর সহযোগী হুয়ান রামোন। হুয়ান রামোন ভারতীয় কবির উদ্দেশ্যে বলেছেন-“তোমার মহান হৃদয়ে আমরা একটি নতুন শরীর গড়তে চেষ্টা করেছি, এই গ্রন্থে তোমার অকপট হৃদয় উজাড় করে দিতে চেয়েছ। তোমার হৃদয় কি সাড়া দেবে এই হৃদয়ের শোণিত ছন্দে? আমাদের অঙ্গে তোমার মুক্ত হৃদয় কি স্পন্দিত হবে? বলে দাও কেমন করে এই দেহে তোমার হৃৎস্পন্দন অনুভব করব?…’’
    হুয়ান রামোন-এর কথার প্রেক্ষিতে আমরা নিজেদেরকেই প্রশ্ন করি-আমাদের আজকের শরীরে কীভাবে সাড়া দেবে গতকালের কবির হৃদয়? সেই নিষ্পাপ আহ্বানে, কবির যুগান্তকারী কণ্ঠস্বরে, যদি বিস্মরণ না ঘটে যায় তবে অবশ্যই সেই ডাক প্রাধান্য পাওয়ার যোগ্য… কবিরা কি সাড়া দেবেন, আজকের পাঠকরা?
    রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকীর কথা আমার পাশের মানুষটিকে বলতেই অনীহায় সে মুখ ব্যাঁকাল। রবীন্দ্র সাহিত্য আজ মৃত, সেনোবিয়া-হুয়ানরামোন-এর স্প্যানিশ রবীন্দ্র-সাহিত্যও তাই, দুবার সমাধিস্থ হয়েছে তাঁর রচনা। এই মুহূর্তে সময়ের অবিচার প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে, এখনকার বিচারে অনেক প্রচলিত ভাবনা মুছে ফেলা হচ্ছে এবং যা চিরদিনের, যা ধ্বংস হবার নয় তাও মুছে ফেলা হচ্ছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ এই সত্যদ্রষ্টা কবির সত্য কণ্ঠস্বরও ডুবে যেতে বসেছে।
    আজ থেকে প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল আগে পুরোদস্তুর ফরাসি এক জ্যোতির্ময় পুরুষ জাঁ এপ্‌স্ত্যাঁ (Jean Epstein) “আজকের কবিতা” গ্রন্থে বলেছিলেন “সত্যের অন্বেষণই সমস্ত নান্দনিকতার মূল উপাদান…” এবং আসল কথা হল, যে নতুনের জন্যে উদ্বেগাকুল মন ঘোর আচ্ছন্নময়তায় আমাদের টেনে নিয়ে যায় অবিচারের গহ্বরে, যা আমাদের কাছের তা ভুলে যাই এবং বেঁচে থাকি অগভীর চেতনার স্তরে আর ভাবি বর্তমানের শেষ পত্রের উত্তর আসে না। আজকের মতো খুব কম সময়ই স্বভাব, অভ্যেসবশে কবিরা চলতি ধারা মেনে নেন। এই মানা সর্বসম্মত এবং একথা আমাদের ভুললে চলবে না, সাহিত্যের স্বৈরাচার ও একাধিপত্য বড় জরুরি হয়ে পড়েছে চলতি হাওয়ায়।
    আমার তরুণ বন্ধুর মতামত মেনেও বলব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চির নতুন, তিনি আজীবন সত্যান্বেষী এবং অন্য সত্যের ভারে চাপা পড়ে না পূর্বের সত্য। বরং যে সত্য লাঞ্ছিত হয় তার জন্যে চাই বড় হরফের অঙ্গীকার। অনন্তকাল মানুষ তার জন্যে হাপিত্যেশ করে অপেক্ষা করে থাকে তবু সে থেকে যায় অধরা। সত্য কবিতা সব সময় নতুন, যদিও মনে হতে পারে তার সুর উঠে আসছে চেনা জায়গা থেকে এবং তার কাঠামো নতুন নয়। আজ মনে হতে পারে অনেক কবি অকালবৃদ্ধ। কারণ, তাদের গলা মেলাতে হচ্ছে এক কোরাস্-এ, গাইতে হচ্ছে নকল নতুনত্বের গান, তাদের ত্যাগ করতে হচ্ছে অবিসংবাদিত সত্য, নতুনত্বের খাঁটি পথ যা ছেড়ে যাওয়া চলে না।
    রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে ওর্তেগার কথা তরুণদের আবার পড়তে হবে, বিশেষত যখন তাঁর শতবর্ষ আসন্ন। রোমান্টিক ডাকহরকরার ভঙ্গিতে আমাদের শিক্ষাগুরু বলেন, “সেন্যোরা, যখনই আমরা এক মহান কবির সম্মুখে পড়ে যাই একই ঘটনা ঘটে। আমি বলব যে এক মহান কবির লক্ষণ এই যে তিনি এমন কথা বলবেন যা আগে কেউ বলেননি কিন্তু তা আমাদের কাছে নতুনও নয়…।” আরও এক পা এগিয়ে বলেন, “সেটা হচ্ছে এই যে লিরিক-এর আবিষ্কার আমাদের স্মৃতি রোমন্থন যা আমরা জানতাম কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম। সব মহান কবি আমাদের জীবন নিয়ে প্লাজিয়ারিসম্ করেন।”
    ওর্তেগার ভাবনায় রবীন্দ্র-অধ্যয়নের বোধ এই যে, তাঁর জীবনের প্লাজিয়ারিসম্ করেছেন কবি, তাঁর রচনা বোধগম্য এবং স্মরণযোগ্য। শুধু সুন্দরের অন্বেষণে কবিতা গড়ে উঠতে পারে কারণ মানুষের চিরায়ত সত্যের প্রতি আকর্ষণ অনেকটাই এক ছদ্মবেশী সৌন্দর্য।
*ওর্তেগা ‘সেন্যোরা’ (শ্রীমতী, মাননীয়েষু) বলে সম্বোধন করেছেন সেনোবিয়া কামপ্রুবিকে।
লেখক পরিচিতি :
হোসে গার্সিয়া নিয়েতো স্পেনীয় কবি, তাঁর জন্ম সাল ১৯১৪। যুদ্ধোত্তর সময়ে তাঁর কবিতায় ধ্রুপদী চিরায়ত এক সুর পাঠকদের বিমোহিত করে। কবি গার্সিলাসোর একনিষ্ঠ ভক্ত গার্সিয়া নিয়েতো ‘গার্সিলাসো’ শীর্ষক পত্রিকার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সমাজ ও রাজনীতির চাপে নত না হয়ে তিনি নিজস্ব শৈলীতে প্রেম, ধর্ম এবং নিসর্গচিত্রের অনবদ্য কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলি হল- ‘কবিতা’ ‘তোমার দিকে যাবার আগে’ , ‘স্মৃতিকথা ও দায়’ , ‘একা একা কথা’ ইত্যাদি। ১৯৯৬ সালে তিনি সেরভান্তেস পুরস্কার লাভ করেন।