বইমেলা, ১৯৮৪ VS ২০১৭

যশোধরা রায়চৌধুরী

0

অরুণ ১৯৮৪

-যতই তুমি বুক ফেয়ার বুক ফেয়ার করো, বাবা, পুরনো বইয়ের দোকানের গন্ধের , যাই বলো , কোনও তুলনা হয় না।
-কী বলিস। আঁতলামো করিস না তো। ইন্টেলেক্ট একেবারে চোয়ালে এসে ঠেকেছে তোর। বাড়াবাড়ি!
– আরে, কী করব মামা, আমার কলেজ স্ট্রিটই ভাল্লাগে। হয় দাম কম। নয় রিবেট বেশি।
-এই প্রশান্ত, কী বলে দেখ অরুণটা।
প্রশান্ত বিড়ি পাকাতে পাকাতে তাকাল। ক্যান্টিনের টেবিল ঠুকে ‘মনে পড়ে রুবি রায়’  গাওয়াটাওয়ার পর একটা বিড়ি দরকার। পয়সা বাঁচবে বলে রোল করে সিগারেট বানায়। পাতলা সাদা কাগজে জিভ বুলিয়ে দুকোণ চিপে দিয়ে সরু রোল করে, তারপর সেটা টেবিলে ঠুকতে ঠুকতে বলল, তামাক আর পুরনো বইয়ের গন্ধে আমার ইকুয়ালি যৌন উত্তেজনা হয়।  কিন্তু নতুন বইয়ের চার্ম তুই একেবারে ফেলে দিতে পারিস না।
-হি হি দ্যাখ, বলে কিনা যৌন উত্তেজনা! হেঃ । সুব্রত খ্যাঁক খ্যাঁক হাসল।
অরুণ মুখ লাল করে বলল, তা পারি না, কিন্তু তোমাদের ওই দামি দামি ইংরিজি বইয়ের স্টলগুলোতে আমি যাচ্ছি না। গা চড়চড় করে। আর ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া ছেলেপুলেগুলো এসে কেমন হামলে পড়ে ওগুলোর ওপর।
ছেলেপুলে কেন বলছিস, বল মেয়েগুলো। মাঞ্জা দেওয়া এক একটা অ্যাটম বম্ব। তোকে আমাকে দেখলে পোকার মতো ইগনোর করবে। অসহ্য, ট্যাঁশ, বাপের পয়সায় বই কেনে। হত আমাদের মতো টিউশনের টাকা!
এই যে, প্রমোদদা, আরও তিনটে চা এদিকে পাঠাও। আমার নামে লিখে রাখবে। সুব্রত দরাজ গলায় বলল, হাসল। সেদিন একটা পেঙ্গুইনের ভলিউম উল্টে দেখলাম, দুশো টাকা। বাব্বা! ওই দুশো টাকায় আমার কুড়িটা কবিতার বই কেনা হয়ে যাবে। জানিস কাল তারাপদ রায়-এর নীল দিগন্তে এখন ম্যাজিক, শান্তনু দাশ-এর কাফের, নীরেন চক্কোত্তির শ্রেষ্ঠ কবিতা, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল-এর দেবী, আরও এত্তগুলো বই কিনেছি।
-জয় গোঁসাই পড়েছিস? হেব্বি। আমি তো পুরো পাগল হয়ে গেছি উন্মাদের পাঠক্রম পড়ে। অরুণ ঝাড়ল।
প্রশান্ত কথা অন্য খাতে বওয়াচ্ছিল। তাহলেও বাওয়া, ইংরিজি বই এক দুটো না নিলে বই মেলার মজা থাকে না। তবে ব্যাক কভার আমি অনেক পড়ে নিয়েছি। কনটেন্ট মোটামুটি জানা থাকলেই ক্যান্টিনে এক দুটো মেয়েকে ইম্প্রেস করে ফেলা যায়।  এখন তো মার্কেস না পড়লে কেউ কথাই বলবে না। হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিটিউড, সলিড জিনিস, গুরু।
-তা তোমার ওই মার্কেস নোবেল পেয়েছে, আমার কামু কাফকা পড়াগুলো মাঠে মারা গেল। হেঁড়ে গলায় হঠাৎ কিশোর কুমারের একটা গান ধরে ফেলল সুব্রত।
অরুণ ফুট কাটল, আমারও তো দৌড় ঐ ব্যাক টু ব্যাক। মানে সামনের কভার, তারপর পেছনের কভার। হ্যাঁ হ্যাঁ হ্যাঁ। আর চুরিবিদ্যাটা ভাল করে জানা থাকলে মাইরি তোমাকে অত ব্যাক পড়তে হবে না। গোটা বইটা পড়ে নেবে। পরশু অদ্রীশ আর অরূপ তো গেছিল পেঙ্গুইনের স্টলে। উদুম ভিড়ের মধ্যে দু তিনটে বই ঘাঁটতে ঘাঁটতে, একদম সোজা পকেটে আর ব্যাগে চালান । বইচুরি করতে কী করে হয় ওদের কাছে শেখা উচিত।
-তুই পারবি না অরুণ, ও আশা ছাড়। তোর মতো গুডি গুডি ভিতুর ডিমের ওসব পোষায় না বুঝলে দাদা।
অরুণ হেসে ফেলল। ধ্যাত, একটা ইংরিজি বই কিনেছিলাম তো গতবার। ওয়ার অ্যান্ড পিস। বাবার পকেট আমি বছরে একবারই কাটি।
-যাঃ , বোকার মতো ওয়ার অ্যান্ড পিস পেঙ্গুইনের কিনলি কেন? মনীষায় গেলে বাংলা অনুবাদটা পেয়ে যেতিস, ননী ভৌমিকের। অনেক সস্তায় পেতিস। রাশিয়ান বইয়ের স্টলে গেলে গুরু টাকা নিয়ে চিন্তা থাকে না। বেঁচে থাকুক লেনিনওয়ালারা, সোভিয়েট ইউনিয়ন।
-হ্যাঁচ্চো।
-আবার ধুলো লাগালি নাকি ? এত রোগাপ্যাঁটকা না তুই, নে চা খা। এ্যাই প্রমোদদা, চা তো পুরো জল। এবার থেকে দামটাও ঠান্ডা করে নেবে।
-হ্যাঁ, ধুলো খেয়েছি খুব রে।  চামড়ার বোতল থেকে ভিস্তিগুলো জল দিচ্ছিল মাঝে মাঝে কিন্তু ওইটুকু জল আর লাখখানেক লোকের পদধূলির কী ব্যবস্থা করবে?
-কাদা সব কাদা… তবে বস্‌ , ধুলোর গন্ধ আর নতুন বইয়ের গন্ধ মিলেমিশে যেটা হয়, আমার না হেব্বি নেশা ধরে যায় বইমেলায় ঘুরতে।
-আলুকাবলির রস আর কফি হাউজের পকোড়ার সঙ্গে যে হাগু হাগু কালারের সসটা দেয় সেটা মিশলে, আরও নেশা বাড়বে।
-ধ্যাত ধ্যাত। পকোড়া । আমার দৌড় ঐ ইনফিউশন অব্দি… হে হে হে।

অরুণ ২০১৭

বর্ণা যখন অরুণের ঘরে ঢোকে, সব পর্দা টানা। জানুয়ারির ম্লান শীতসন্ধ্যা নেমে এসেছে ঘর জুড়ে, কোনও আলো জ্বালা হয়নি।
দরজা খুলেছিল অরুণের স্ত্রী। সুতপা। বর্ণাকে দেখে ওর ফ্যাকাশে মুখে একটু আলো এসেছে। কাতর বলেছে, আজও ঘরের মধ্যে ঘুপটি হয়ে বসে আছে। দেখো না বর্ণা যদি ওকে বের করতে পার। কী যে ডিপ্রেশনে ভুগছে ও!

boi mela.2

বর্ণা এসেই ফট করে ঘরের আলো জ্বেলে দেয়। অরুণ খুব ক্রদ্ধ তাকায়, বিরক্ত হয়।
তারপর বলে, হুম, তুমি। তা, আলো জ্বালার কী দরকার ছিল। এমনিতেই তো তুমি এলে ঘরটা আলো হয়ে যায়।
ন্যাকামো করবেন না অরুণদা, আপনাকে আমার সঙ্গে এবার বইমেলা যেতেই হবে ।
কেন , ছেলে বন্ধু কম পড়িয়াছে? আমার মতো মধ্যবয়সি বুড়ো কেন ধরেছ ?
আপনি ডিপ্রেশনে ভুগছেন স্যার। তাইই।
হ্যাঁ, গত দশ বছর আমার কোনও বই বেরোয়নি। আমি কোনও লিটম্যাগ বার করি না। আমার দুটো বন্ধু “অবক্ষয়” লিটম্যাগ করত। সুব্রত, প্রশান্ত।  কী সব লেখা। কাঁপিয়ে দিত। সে বন্ধ হয়ে গেছে কবে। সুব্রত তো হঠাৎ করে চলেই গেল ক্যানসার হয়ে। আমার ভাল্লাগে না আর। লিটল ম্যাগের তাঁবুগুলো সারা মাঠ জুড়ে কেমন ছড়িয়ে দিয়েছে। মেলাটাও সাইন্স সিটি’র কাছে গিয়ে কেরকম একটা ঘেয়ো প্যাটার্ণের হয়ে গেছে। বোলে হরিবোল, ইউ বি আই অডিটোরিয়ামে সব জোটো গিয়ে। বইয়ের ফিতে কাটো।
চলুন না, ভাল্লাগবে অরুণদা। আপনি দেখবেন, এখনও ছেলেমেয়েরা আগের মতোই বইমেলার ময়দান কাঁপাচ্ছে। গান গাইছে, লিটল ম্যাগে কবিতা লিখছে, রীতিমতো লাফঝাঁপ দিয়ে আন্দোলন করছে।
কী দেখতে কোথায় যাব ইয়ার? কী, তোমাদের জেনারেশনের ভাষাটা ঠিক বলছি তো?  বই দেখতে তো বাঙালি আর যায় না বইমেলায়। যায় ভেতো ছাপোষা বাঙালি বাচ্চাদের ঘোরাতে।  দু-চারটে আলপনার বই কিনতে।  আর ফিশ ফ্রাই খেতে। বিরিয়ানির দোকানের সামনে লম্বা লাইন। প্যাঁকাটিতে লাগানো কাগজের ফুল, আঁকা মুখোশ , পোড়ামাটির তৈরি মালা-কানের দুল কিনতে যাও তোমরা বইমেলায়।
উফ অরুণদা। আমি , আমার বন্ধুরা , আমরা ওইসবের জন্য মোটেই যাই না।
হ্যাঁ, তোমরা তো আবার মেনস্ট্রিম না। আঁতেল। আরে আঁতলামি করবি তো সেটা ঠিকঠাক করে কর!  তোদের  আঁতলামি তো আবার সেই ড্রাই নেশার ঠেক, গিটার হাতে বেসুরো ব্যান্ডগানের গ্রুপ, আর তোদের আন্দোলন হল, মালা দুল ছবিছাবা নিয়ে বসতে দেয়নি বলে মাঠ ঘুরে ঘুরে ত্রিদিব চাটুজ্জে অনিল আচার্যদের ওপর এক হাত নেওয়া। এটাকে সিরিয়াসলি নেব কেন। ছোট পত্রিকাদের আন্দোলন আর আছে নাকি কিছু? সাহিত্য পড়ো তোমরা? বই দেখো তোমরা ? বই চুরি কর? আমাদের মতো বই নিয়ে পাগলামো করো? আসলে জানিস তো, এই বিশ্বায়নের পর থেকেই, আর মনমোহনের ইকনমিক্স পড়ে ফেলে ফেলেই, নয়া অর্থনীতির হাত ধরে, তোমাদের ভ্যালুজগুলো সব হেজেমজে গেল। এখন আর কেউ অলটারনেটিভ কাজ করে না। এখন সব্বাই মেনস্ট্রিম।
আহহা অরুণদা, খুব দিলেন একতরফা মনোলগ! যাই হোক, শুনে গেলাম। কাকুর বয়সি তবু দাদা বলি। তাই কিচ্ছু বললাম না। তবে একটা কথা বলুন, আমাদের জন্য আপনারা কী রেখে গেছেন বলুন তো, কোন লেগেসি? আপনাদের অলটারনেটিভ ধুয়ে কি আমরা জল খাব?  সুনীলের ভাষায়, কেউ কথা রাখেনি। মেনস্ট্রিম তো তবু বারফাট্টাই করে না, হোলিয়ার দ্যান দাউ, আমি কত শহিদ ভাব করে না। ব্যবসাটা মন দিয়ে করে।
হুম, ব্যবসা, ওই ব্যবসাই হবে শুধু।
শুনুন বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। ৩৪  বছরের বাম শাসন আর ৩২ বছরের বইমেলা। সব জানি মশাই। কাজের কাজ কত করেছেন তা তো জানা। খালি কালচার করে করে বাঙালি জাতটাকে বসিয়ে দিয়েছেন। সঙোস্কৃতি ! হুঃ।
শোন এই জেনারেশনটার সঙ্গে আমি কোনও সংযোগ রাখতে চাই না।  এরা হচ্ছে প্যাকেজিং এর দাস। ভেতরে ভুশি মাল। লিখে কী দেখাবি তোরা? কাভারটা চকচকে হলেই হল।
ভুলে যাচ্ছেন যে প্লেটো অব্দি বলেছিল, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কিসসু বুঝতে পারি না, ওরা আর আগের মতো স্থিতধী, বিনয়ী আর একনিষ্ঠ নেই। ওসব প্রত্যেক জেনারেশনের লোক তার পরের জেনারেশন সম্বন্ধে বলেছে। চলুন চলুন, বইমেলায় চলুন দিকি। মাথায় টুপি দিয়ে চলুন। ভাল আইসক্রিম খাওয়াব। খুব সুন্দর, প্রায় ইংরিজি পাবলিকেশনের মতো ঝাঁ চকচকে বই বের করছে দোয়েল-গাংচিল, কিনে দেব। আর কিছুর লোভ দেখাতে হবে? আপনার কোনও পুরনো বান্ধবীকে ডেকে আনব?
ছাড়ান দাও মামণি। চল তোর পয়সায় আজকে একটু মাল খাব। একটা সিগারেট দে না।
হ্যাঁ এখন সিগারেট চাইছেন। আমি স্মোক করি বলে যা তা বলেছিলেন একবার। চুল বয়কাট করেছি বলেও, খুব হেজিয়েছিলেন, চুল তার কবেকার বিদিশার নিশা, কী করে লিখবে কবিরা আর… আপনাদের এই ছেঁদো রোমান্টিসিজম চলবে না দাদা, নারীকে নতুন করে পড়তে শিখুন।
তোমাদের তো তসলিমা, মল্লিকা যা শিখিয়ে দিচ্ছে সেটাই বলবে।
শুধু তসলিমা, মল্লিকা? আসলে সমাজ কখন কোথা দিয়ে পাল্টেছে আপনি দেখতেই পাননি। যেদিন থেকে এস টি ডি বুথগুলো গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে গেল, আর মুদির দোকানে শ্যাম্পুর স্ট্রিপ , সার্ফ সাবান আর উইস্পারের প্যাকেট পাওয়া যেতে লাগল, সেদিন থেকে মেয়েদের মুক্তাঞ্চল ঘরে ঘরে তৈরি হয়ে গেছে মশাই। কী খুব শকিং কথা বললাম?
রাম রাম! তার চেয়ে তোর সঙ্গে গিয়ে ফুচকায় রাম ঢেলে খাব। একটা ছোটদের বই কিনব এমনিও ভাবছিলাম, প্রশান্তর দশ বছরের ছেলে, কিরণটাকে দিতে হবে। দোয়েল কোয়েল কী যেন বলছিলি?
ছবি- অর্পণ সাধুখাঁ