ঝুমুর গান শ্রেণিচ্যূত হয়ে এখন ভদ্রলোকেদের নির্মাণে পরিণত হচ্ছে

অরূপশঙ্কর মৈত্র

0

অনেকদিন আগে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে শান্তিনিকেতনে বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমার বন্ধু অরুনাভ চক্রবর্তী কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ অধ্যাপক। শহরতলিতে থাকেন। শান্তিনিকেতনে একচিলতে জমির ওপর ওঁর একটি বাসা আছে। কলকাতার ভদ্রলোকদের অনেকরই শান্তিনিকেতনে বাসা থাকে। বাঙালি ‘ভদরলোক’রা যৎকিঞ্চিৎ রাবীন্দ্রিক হয়। কোনও বড় মুদির দোকানদার, ধরা যাক তিলক হালদার অথবা রুটে তিনখানা বাস চলে, যার মালিক কল্যাণ সরকার। ওনারা কিন্তু শান্তিনিকেতনে বাড়ি করেন না(ওঁরা অধ্যাপকের চেয়ে অনেক বেশি রোজগার করলেও)। যদি কেউ বাড়ি করে, জানবেন, তা করেছে সিজনে ভাড়া দেবার জন্য, কখনই পৌষমেলায় বা দোলের সময় গিয়ে, দু’পেগ রয়্যালস্ট্যাগ নিয়ে বাউল শুনতে শুনতে ছুটি কাটাতে নয়। আহা চাঁদনী রাত, দোল আর খোয়াই। হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে বন্ধুদাস বাউলের ‘ভোলা মোওওওওওন’।
যেখানে আমার বন্ধুর বাসা, তার কাছেই এক গ্রামে আমার বন্ধুর বৈবাহিক সূত্রে প্রাপ্ত এক দূর সম্পর্কীয় আত্মীয় থাকেন। তিনি এসেছিলেন তাঁর গাঁয়ের বাড়িতে আমাদের আমন্ত্রণ জানাতে। অধ্যাপক জামাইকে গ্রামে নিয়ে গেলে যে হৈহৈ পরে যাবে আর তার ফলে যে দেবতুল্য মর্যাদা বাই প্রোডাক্ট হিসেবে পাওয়া যাবে তা গ্রামের সাধারণ প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক সুব্রত ঘোষ হারাতে চাননি। সুব্রত ঘোষ কায়স্ত (জেনেছি বন্ধুর কাছেই। প্রেমের বিবাহ। তাই অসবর্ণ। এ বাবদ অধ্যাপক বন্ধুর সামান্য গর্ববোধও আছে। তবে এও জেনেছি, ওঁরা গয়লা ঘোষ নয়! ঘোষ, বোস, গুহ, মিত্তিরের ঘোষ)।
কথায় কথায় গানের কথা উঠল। ঝুমুর নাচনীর কথা। জানতে পারলাম, সুব্রতবাবুদের গ্রামের একটু দূরে বাগদিপাড়ায় প্রায়ই ঝুমুর গানের আসর বসে। ওখানে নাচনীরা আসে। সাধারণতঃ গ্রামের পরিত্যক্ত মেয়েরাই নাচনী হয়। রূপেও ভদ্রঘরের মেয়েদের মতো হয় না। হবার কথাও নয়। আজন্ম (মায়ের পেটে থাকা থেকেই) অপুষ্টিতে আক্রান্ত। আজীবন কার্যত বেশ্যাবৃত্তিই করতে হয়। ঝুমুরগানের শিল্পীরা একটুআধটু মর্যাদা পেলেও নাচনীরা পায় না। মারা যাবার পর, এদের লাশ পায়ে দড়ি বেঁধে জঙ্গলে বা নদীর চরে ফেলে দিয়ে আসা হয় আকাশের শকুন ও কুকুরদের ভোজ্য হিসাবে। অবাঞ্ছিত, পচে যাওয়া জঞ্জালের মতো। আমি তখন টেলিভিশনে নাচনী নিয়ে একটি ধারাবাহিকের চিত্রনাট্য রচনা করছি। স্বভাবতই আমার নাচনিশালিয়া দেখার ও শোনার উৎসাহ হল। সুব্রতবাবু আঁতকে উঠলেন- ‘না না, ওখানে যাবেন না। ওসব ছোটলোকদের কালচার। ওই পাড়ায় কাহার, বাগদিরা থাকে। ওখানে ভদ্দলোকেরা যায় না।’ এই ঘটনা ২০০২ সাল নাগাদ।
২০১৩য় যখন নাচনীদের জীবন নিয়ে নান্দীকার নাটক তৈরি করল, তখন কিন্তু ব্যাপারটা বদলে গেল। তবে কি নাচনিশালিয়া জাতে উঠল? কাহার বাগদিরা কি ভদ্রলোক হল? নাচনীরা কি পাঙতেয় হল? না। হল না। বরং কলকাতায় নাচনীদের ‘ভদ্দলোকি’ নির্মাণ হল। ওই নাটক নিয়ে বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্রে অনেকগুলি কলাম ভর্তি হল। অনেকটা বাচ্চাদের বইতে যেমন ‘মৌমাছি মৌমাছি, কোথা যাও নাচি নাচি দাঁড়াও না একবার ভাই।’ তারপর মৌমাছির সঙ্গে কত গল্পটল্প হয়। বাচ্চার মগজ ওই ‘মৌমাছি’র নির্মাণের মতো। এক কল্পনার মৌমাছি। এ মৌমাছি কামড়ায় না। এই মৌমাছি গুণগুণ করে গান করে, আর সেই গান শুনে স্পষ্ট বোঝা যায় কী বলছে। নাচনীরাও কিন্তু শহরের বাবুদের নির্মাণ করে তাদের গানে নৃত্যে।

Nandi-Karer-natok

নান্দীকারে’র নাটক ‘নাচনী’তে স্বাতীলেখা ও দেবশঙ্কর হালদার।
কলকাতায় সত্যিকারের নাচনীদের নিয়ে কোনও অনুষ্ঠান হয় না। হলেও ভদ্রলোকেরা দেখেন না। তাই ওই বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের জন্য নান্দীকারের নাচনী আমাদের দেখতেই হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়।
আমার মনে পড়ে গেল ছোটবেলার একটা ঘটনা। তখন আমি বাইশ-তেইশ বছরের তরুণ। পুরুলিয়ার গ্রামে বন্ধুর কাছে বেড়াতে গিয়েছিলাম। প্রশান্ত সবে কানুনগোর চাকরি পেয়েছে। পুরুলিয়া শহর থেকে দূরে চড়িদার কাছে ওর পোস্টিং। একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকে। আমি এবং প্রশান্ত উভয়েই সাতের দশকের বিপ্লবের আগুনে বেগুনপোড়া হয়েছি। পরে ব্যর্থ বিল্পব ছেড়ে বিপ্লবী গণসঙ্গীতের দল করে বিপ্লবের সাইডলাইনে বসে আছি। আরও পরে চাকরিবাকরি নিয়ে যে যার মতো এদিক ওদিক ছিটকে গেছি। আমাদের গণসঙ্গীতের দলের মাথা ছিলেন অজিতেশ লাহিড়ী। অসাধারণ ঝুমুর গাইত। বলতেন, বিপ্লবের সময় মাসের পর মাস নাকি ও একটা ঝুমুর দলে আত্মগোপন করেছিল। ওখানেই শিখেছে। ওর কাছে অসহায় নাচনীদের গল্প শুনে মনে মনে একদিন নাচনীদের নিয়ে কিছু একটা করব ভেবেছিলাম। অনেক পরে ২০০৩ সালে একটি বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলে ‘নাগরদোলা’ নামে একটি ধারাবাহিক কিছুদিন করেছিলাম। মূল দুটি নারী চরিত্রে ছিল দুই নাচনী। সেই সময় অজিতেশের কাছে ঝুমুর গান শিখেছিলাম। ‘শোন বলি মীনার মাই, কান্দাকাটা করিস লাই, ই বছরটা চালাহ কুন মতে।’ অসাধারণ গান। গানের এক জায়গায় ছিল, ক্ষুব্ধ মীনার মা প্রত্যুত্তর করছে, ‘আমি মোটা কাপড় মাথায় লিয়া কতই রহিব গো, ই বছর ডেক্রন শাড়ি লিব।’ আমরা যত জায়গায় অনুষ্ঠান করেছি, সব জায়গায় শ্রোতা এই গানের কদর করেছে। বিশেষ করে দরিদ্র হতভাগী এক আদিবাসী রমণীর ওই ‘ডেক্রন শাড়ী’র আকাঙ্খা অদ্ভুত বেদনাময় এক অনুভূতি এনে দিত শ্রোতাদের মনে। এক কথায় হিট গান ছিল।
সেই রাতে পুরুলিয়ার চড়িদায় আক্ষরিক অর্থে চাঁদের হাসি বাঁধ ভেঙ্গেছে। যেন দুধসায়রের দেশ। দূরে অযোধ্যা পাহাড়। আমি আর প্রশান্ত খাওাদাওয়া সেরে রাত দশটা নাগাদ রাস্তায় হাঁটছি। বেশ চওড়া স্টেট হাইওয়ে। দু’পাশে বড় বড় গাছেরা গায়ে অন্ধকার মেখে নীল জ্যোৎস্নায় স্নানরত। সুন্দর হাওয়া বইছে। কয়েক বছর আগে হলে, নির্ঘাৎ দূরের অযোধ্যা পাহাড়কে চিংকাং ভেবে রোমাঞ্চিত হতাম। মনে মনে লালফৌজ নেমে আসত। আমার পিঠে ঝোলানো স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। গায়ে গাঢ় সবুজ সামরিক পোষাক। মাথায় টুপির ঠিক সামনে রেডস্টার। ওঃ! কিন্তু আপাতত বিপ্লব ডেফারড। কবে হবে জানি না। সাদা পায়জামা, নীল পাঞ্জাবি, পায়ে হাওয়াই, বা’হাতে সিগারেট। হাঠাৎ দূরে মাদলের বাজনা। দেখলাম একদল আদিবাসী নারী-পুরুষ জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে বড় রাস্তায় উঠে আসছে। ওদের হাতে ধামসা মাদল। আমাদের দু’জনের মনে একসঙ্গে কতগুলো যে ধামসা বেজে উঠল তার ইয়ত্তা নেই। কাছে আসতেই ওদের দাঁড় করালাম। একজনকে প্রশান্ত চেনে। কাত্তিক ওঁড়াও। শ্রেণিচ্যূত হবার তাৎক্ষণিক আবেগে বলে ফেললাম, আমরা তোমাদের গান জানি, গাইতে পারি। ওরা বলল গাও। আমরা দু’জনে উদাত্ত কণ্ঠে ‘শোন বলি মীনার মা’ গাইলাম। বেশ দরদ দিয়ে গাইলাম। যতক্ষণ গাইছিলাম, দেখলাম ওদের অনেকেই হাসছে। ভাবলাম ওই হাসি নিশ্চয়ই আমাদের শংসা। গান খুব ভাল গাইছি বলে নয়, বরং আমরা শহর থেকে আসা বাবু হলেও ‘আমরা তোমাদেরই লোক’ গোছের একটা স্বীকৃতির চিহ্ন হয়ত এই হাসি। গান শেষ হল। ওদের কাছে জানতে চাইলাম কেমন লাগল? ওরা বলল, ভাল। হাসছিলে কেন? এই প্রশ্নে আবার হাসির রোল। অবশেষে ওরা সলজ্জভাবে জানাল, যে গানটি আমরা পরিবেশন করলাম ‘উটো মুদের গান লয়গো বট্যে’।
ওদের গান নয়! সেকি! এতদিন তো ওদের গান বলেই জেনেছিলাম! অজিতেশকে এই গান শিখিয়েছিল মানা নামে কোনও এক নাচনী! আমরা তাই জানি। ঠিক যেন টুইন টাওয়ার হুশ করে ধসে গিয়েছিল, তেমনি আমার এতদিনের গণসঙ্গীতের টাওয়ারটাও হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল(যদিও টুইন টাওয়ার অনেক পরের ঘটনা!)।
অজিতেশ যে সত্যিই এক নাচনীর গলায় গানটা শুনেছিলেন তার মধ্যে মিথ্যা ছিল না। কিন্তু ধীরে ধীরে গানটাই শ্রেণিচ্যূত হয়ে পরেছিল। ওটা হয়ে গেছিল আমাদের ভদ্রলোকেদের নির্মাণ। বাইরে রঙের আদলে মিল, ভিতরে সম্পূর্ণ গোঁজামিল। আমাদের সেই গণসঙ্গীতের দল অনেক আগেই উড়ে গেছে। এখন অজিতেশ লাহিড়ি আার গণসঙ্গীত গায় না। ও ওঁর মুক্তির স্বাদ পেয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতে।