খুকুদি চলে যাওয়ার দিন লালদীঘির বাড়িটির কথা মনে পড়ছিল

মইনুল হাসান

0

মহাশ্বেতা দেবী (১৯২৬-২০১৬)
লালদীঘির ধারের বাড়িটি এখন আর নেই। বহরমপুরের খুকুদি’ও চলে গেলেন। এই বাড়ির স্মৃতি আমার মতো অনেকের কাছে এখনও টাটকা। আমাদের কলেজ জীবনে গ্রান্ট হলে’র পাশ দিয়ে যাবার সময় একজন মানুষকে মাথায় টুপি দিয়ে মাঠে বসে থাকতে দেখতাম। যুবনাশ্ব। মনীশ ঘটক। ‘পটলডাঙ্গার পাঁচালি’ আমাদের তখন পড়া। গ্রান্ট হল লাইব্রেরির আমিও সদস্য। ১৯৭৮ সাল। কলেজ শেষ। একদিন গ্রান্ট হলের মাঠে বসে থাকা স্থিতধী মানুষটি হঠাৎ উঠলেন। বললেন, ‘‘খুকু এসেছে। আমাদের বাড়ি যেও।’’ কি করে চিনলেন জানি না। পরদিন সকালে লালদীঘির বাড়ি।
ও মা! এযে চাঁদের হাট ! কে নেই সেখানে? শহরের গন্যিমান্যি লোকে ভর্তি। সবার সঙ্গে খুকুদি মানে মহাশ্বেতা দেবী কথা বলছেন, সবাই তাঁকে নানা সম্বোধনে ডাকছেন। আমি পালাতে পারলে বাঁচি। কিন্তু হল না। তিনিই আমাকে ক্যাঁক করে ধরলেন। প্রথম কথা- ‘‘এই যে ছাত্রনেতা! কবিতা লেখা হচ্ছে? তোমার বাড়ি যেন কোন গ্রামে?’’ আর কিছু লাগে, সেদিন থেকে তিনি আমার ‘দিদি’ হলেন।
১৯৭৯ সালে মনীশ ঘটক মারা যাবার পর ‘বর্তিকা’ প্রত্রিকার সম্পাদক হলেন। বহুবার লিখতে বলেছেন। লিখিনি। তবে পত্রিকা চালাতে সাহায্য করেছি। একটা সামান্য টাকার বিজ্ঞাপন পাঠালেও তার উত্তরে এমন সব চমৎকার চিঠি দিতেন যার দাম আজ লাখ টাকা। বহরমপুরের প্রথম বইমেলায় তিনি সভানেত্রী। মূল হোতা আমার শিক্ষক দীপংকর চক্রবর্তী। ২-৩ বার বইমেলা চলার পর একটা সাধারণ সভায় কমিটি পাল্টালো। অধ্যাপক অভিজিৎ ভট্ট সম্পাদক হলেন। আমিও বেশ বড়ো দায়িত্ব পেলাম। অভিজিৎ দা’র সঙ্গে দিদির সম্পর্ক ছিল খুবই মধুর। সবাই দিদিকে বোঝাল সিপিআই(এম)এই কমিটি দখল নিয়েছে (যদিও আদৌ তা নয়), আপনি থাকবেন না। তিনি একটি চিঠি দিয়ে কমিটি থেকে তাঁর নাম তুলে নিলেন। আমি বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হয়ে কলকাতায় তাঁর বাড়ি গিয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়ালাম। আমার কাচমাচু মুখ দেখে বললেন, ‘কি হয়েছে বলো?’ চিঠিটা দেখালাম। বললেন- ‘‘হ্যাঁ আমি থাকবো না। এখন আমার পক্ষে এসবে জড়ানো ঠিক না।’’ আমি বললাম- ‘‘কি বলছেন! এর সম্পাদক অভিজিৎ দা, আমি সংস্কৃতি সম্পাদক। আপনি প্রধান উপদেষ্টা না থাকলে মেলা বন্ধ করে দেব।’’ আমাকে বসতে বললেন। আমি বললাম- ‘‘যতক্ষণ আপনি হ্যাঁ না বলবেন, ততক্ষণ বসবো না।’ এবার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন- ‘তোরা আছিস, তা তো কেউ বলেনি।’ সেদিন থেকে ‘তুই’ হলাম। না খাইয়ে ছাড়লেন না। আমি পরপর ৭ বছর জেলা বইমেলার সম্পাদক ছিলাম। প্রতিবছর টেলিফোনে কথা বলতাম। কোনও অসুবিধা হয়নি।
তাঁর লেখা পড়েই বুঝতে পারি লোধা কারা আর তাদের জীবনযাত্রা কি। একবার চলে গিয়েছিলাম মেদিনীপুরের লোধাশুলি। তখন যুব আন্দোলন করি। মহাশ্বেতা দেবীর পর্যবেক্ষণ কত সঠিক তা নিজের চোখে দেখেছি। ‘হাজার চুরাশির মা’ এখন প্রবাদ। নকশাল আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিত। আমাদের হাতে হাতে ঘুরেছে একসময়। ‘অরণ্যের অধিকার’ ও ‘শ্রী গনেশায় নমঃ’ আমার মতে শ্রেষ্ঠ।
‘কথাসন্ধি’, ‘রুদালী’ যেন গল্প নয়- জীবন আলেখ্য, দর্শন, চিন্তা। বহু সম্মান পেয়েছেন। সুনামের অন্ত নেই। দুর্নামও যে পাননি তা নয়। তবে একজন প্রতিবাদী মানুষ- গরীব, প্রান্তিক মানুষের আপনজন হয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। একটা জীবনে এর চাইতে মানুষে কি চাইতে পারে?
আমিও তখন লালদীঘির পাড়ে থাকি। তিনি সেবার আমার বাড়ির সামনের হোটেলে আছেন। নিজেদের বাড়িটি বাসযোগ্য ছিল না। সন্ধ্যায় দেখা করলাম। আমার ফ্ল্যাটটা দেখালাম। বললেন- ‘‘তোর ফ্ল্যাটেই তো থাকতে পারতাম।’’ আমি বললাম- ‘‘তিন তলায়। আপনার অসুবিধে হতো।’’ ‘‘কিছু হতো না, কাল তোর ওখানে যাব।’’ খুশিই হলাম। ২০০৬ সাল।
তাঁর আসা হয়নি। রাত দু’টোয় হোটেল থেকে লোক এসে আমাকে জাগিয়ে বললো- ‘‘দিদি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আপনাকে ডাকছেন।’’ আমি গিয়ে দেখি খুব খারাপ অবস্থা। ডাক্তারদের ডাকা হল। ঐ রাতে ডাক্তার পাওয়া মুশকিল। তবুও তাঁর জন্য সবাই তৈরি। ভালো এ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে ডাক্তার-সহ কলকাতায় পাঠানো হল। বাকি দায়িত্ব রাজ্য সরকার নিয়েছে।
আমার বাড়ি তাঁর আর আসা হয়নি। আজ প্রণাম ও শ্রদ্ধা জানানো ছাড়া আর কিছু আমার করার নেই।