‘গাছ পাগল’ মাস্টারমশাই

টিম বিতর্ক

0

নিজের বাগানে বঙ্কিম চক্রবর্তী। ছবি- শভদীপ দেবনাথ।
একটি গাছ একটি প্রাণ, সবুজ পৃথিবী সুন্দর পৃথিবী – এরকম হাজারো স্লোগান এখন হামেসাই আমাদের চোখে পড়ে বা কানে আসে। অরণ্য সপ্তাহ, বিশ্ব পরিবেশ দিবস নিয়ে চারিদিকে ঘটা করে অনুষ্ঠান হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা থেকে কর্পোরেট সংস্থার কর্তা ব্যক্তি, অভিনেতা-অভিনেত্রী সকলেই পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে বক্তব্য রাখছেন, বৃক্ষ রোপণের প্রয়োজনীয়তার কথা শোনাচ্ছেন এবং পরিবেশ দিবসে ‘ফোটো সেসনে’র জন্য দু-একটি চারা গাছও রোপণ করছেন। কিন্তু এদের কতজনকে গোটা বছর জুড়ে পরিবেশ নিয়ে সচেতনতা তৈরী করতে বা গাছ লাগাতে দেখা যায়?
থাক, এই বিতর্কে না গিয়ে এমন একজন মানুষের কথা বলি, যিনি শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা বারো মাস নিজের গাঁটের কড়ি খরচ করে এলাকায় এলাকায় গাছ লাগান এবং মানুষকে গাছ লাগানোর জন্য, গাছের পরিচর্যা করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। বছরের পর বছর ধরে নিঃশব্দে নানা বাধা-বিঘ্ন-কটূক্তি উপেক্ষা করে এই কাজ করে চলেছেন তিনি। যেমন, এক সময় তাঁর লাগানো ছোট্ট চারাগাছ আজ মহিরুহে পরিণত হয়েছে, তেমনি আবার নতুন চারাগাছ তাঁর পরম যত্নে বেড়ে চলেছে।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অশোকনগরের ১৮নং কাকপুল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বঙ্কিম চক্রবর্তী। এলাকায় ‘গাছ পাগল মাস্টারমশাই’ নামে পরিচিত। বঙ্কিম বাবুর কথায়- ‘‘গাছ আমার মা। আমার জন্মদাত্রী মায়ের মতো গাছও আমাকে এবং আমাদের আগলে রেখেছে। গাছের কান্না-হাসি-গান আমি শুনতে পাই, অনুভব করতে পারি।’’ আর তাই অবসর নেওয়ার প্রায় ১১ বছর পরেও ‘সবুজের অভিযান’এ মেতে রয়েছেন বঙ্কিম চক্রবর্তী ওরফে বঙ্কিম মাস্টার। নিজের উদ্যোগে যেমন এলাকার বিভিন্ন স্কুলে, খেলার মাঠে, পার্কে, রাস্তার ধারে গাছ লাগিয়ে চলেছেন, তেমনি বিভিন্ন সংগঠন, প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের দোরে দোরে ঘুরে বেরাচ্ছেন বৃক্ষরোপণের কর্মসূচী গ্রহণ করার জন্য।
কবে থেকে এই গাছ লাগানোর নেশা চাপল? জিজ্ঞাসা করলেই মাস্টারমশাইয়ের চোখ এখনও চকচক করে ওঠে। গড়গড় করে বলে চলেন- কল্যানগড় বিদ্যামন্দিরে পড়ার সময় এক শিক্ষক গার্ডেনিংয়ের ক্লাস নিতেন। সেই সময় থেকেই গাছ লাগানোর ভূতটা মাথায় চেপে গিয়েছিল। তার উপর উদ্বাস্তু পরিবারের সদস্য হওয়ায় বাড়ির সদস্যদের দেখেছি নিজেদের একচিলতে জমিতে নতুন নতুন গাছের চারা, বীজ বপন করে নতুন করে নিজের পরিবেশ গড়ে তুলতে। ছাত্রজীবনে নিজের স্কুলে গাছ লাগানো দিয়ে শুরু, তার পরে শিক্ষকতার জীবন শুরু হওয়ার পর স্কুলে একের পর এক গাছের চারা লাগিয়েছেন। সেগুলি আজ ডালপালা, শাখাপ্রশাখা বিস্তার করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। বঙ্কিমবাবু গর্ব করে বলেন- ‘‘অশোকনগর-কল্যানগড় এলাকার মানুষ এখন বসন্ত কাল শুরু হয়েছে বুঝতে পারে বিভিন্ন জায়গায় আমার লাগানো পলাশ গাছে ফুল ফুটতে দেখে।’’
নিজে গাছ লাগানোর পাশাপাশি অন্যদের গাছ লাগানোর জন্য নিজের উদ্যোগে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন। কারও সন্তান হওয়ার খবর পেলে তিনি গাছের চারা নিয়ে হাজির হয়ে যান। আবার অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, বিয়ে’র মতো শুভ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পেলে তিনি গাছের চারা উপহার দেন। কাঁধে ঝোলা নিয়ে এখনও বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন গাছের বীজ কুড়িয়ে বেরান। সেই বীজ রোপণ করে তার থেকে চারা তৈরি করেন। সেই চারা বিভিন্ন মানুষকে, সংগঠনকে দিয়ে দেন। আবার কোথাও গাছ কাটা হচ্ছে শুনলে তিনি ছুটে যান। নিজের সাধ্য মতো গাছটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করে চলেন।
বঙ্কিম বাবু বলেন, ‘‘যে ভাবে গাছ কাটা হচ্ছে, বনভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে যাচ্ছে তাতে পৃথিবী একদিন ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার জন্য আমি সাধ্য মতো চেষ্টা করছি।’’ বঙ্কিমবাবু বয়সকে, শারিরীক প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে আজও কাঁধে ঝোলা নিয়ে ছুটে চলেছেন ‘সবুজের অভিযান’এর লক্ষ্যে।