শোভনা সরকার- রূপকথার মানবী

মইনুল হাসান

0

আমাদের এই বেঁচে থাকাটা কোনও কোনও সময় অসহ্য মনে হয়। অসহ্য মনে হয় এই গ্রহটাকে। তার কারণ, প্রাত্যহিক জীবনের গ্লানি। আমাদের চতুর্দিকে যে ঘটনাগুলো ঘটে যাচ্ছে, মনে হয় সবই যেন পৌনঃপুনিকতা দোষে দুষ্ট। আমরা নিজেরাই নিজেদের উপর যথেষ্ট বিরক্ত।
তার মধ্যে এমন কিছু সংবাদ হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো আমাদের সামনে এসে পড়ে যাতে আবার নতুন করে আমরা এই জীবনের প্রতি, এই পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসায় পড়ে যাই। আবার নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ‘প্রাণ আছে, এখনও প্রাণ আছে’।
শোভনা সরকার। আমাদের ভালোলাগা, চিরসবুজ পৃথিবীটি আরও একবার আমাদের দিয়ে গেলেন। তাঁর পুত্র-সহ বাড়ির সকলে যে মনোভাব দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়ও। যখন পুরো ঘটনাটি দূরদর্শনে শুনলাম, খবরের কাগজে পড়লাম মনে হল যেন রূপকথার গল্প। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল- এমনও হতে পারে! অসুস্থ অবস্থায় শোভনাদেবী ভর্তি হয়েছিলেন শহরের পাশে একটি নামী হাসপাতালে। ভালোই ছিলেন। এসব অসুখ নিয়ে ভর্তি হলে ডাক্তার ও হাসপাতালের যত্নে কয়েকদিনের মধ্যে বাড়ি ফিরে যাবার কথা। শোভনাদেবী’র পরিবারের লোকেরাও তাই ভেবেছিলেন। কিন্তু ঘটনা ঘটল সম্পূর্ণ বিপরীত। সবাইকে অবাক করে দিয়ে অন্য একটা সমস্যা দেখা দিল তাঁর। তাড়াতাড়ি অন্য হাসপাতালে তাঁকে বদলি করা হল। অবস্থার কোনোরকম পরিবর্তন হল না। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন শোভনাদেবীকে বাঁচিয়ে তোলার। হয়নি। সম্মিলিতভাবে তাঁরা ঘোষণা করলেন তাঁর ‘ব্রেন ডেথ’ হয়েছে। অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো তখনও সজীব আছে। এমন অবস্থায় কোনও সিদ্ধান্ত ডাক্তার এবং পরিবারের মানুষদের পক্ষে গ্রহণ করা প্রায় অসম্ভভ। সেই অসম্ভভ কাজটাই করলেন শোভনাদেবী’র পুত্র এবং তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। ওরা বুঝতে পারছিলেন মা’কে জীবিত অবস্থায় বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না। মা’এর হৃদপিণ্ড, কিডনি, চোখ তাঁরা ‘দান’করে দিতে চাইলেন। ইচ্ছেটা খুবই ছোট, কিন্তু বুক ভাঙ্গা এই সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ কাজ নয়।
যারা এক অপরিসীম হতাশা আর যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন। বেঁচে থাকার সমস্ত আশা যখন একেবারেই তাদের শেষ। তখনই তারা ফিরে পেলেন নতুন জীবন। শোভনা সরকারের ইচ্ছে অনুযায়ী চারজন মরণাপন্ন রোগীর দেহে তাঁর অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হল। কেয়া রায়, যাঁর কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে তাকে দূরদর্শনের পর্দায় দেখলাম – কি চমৎকার দেখতে সে। তাঁর বাবা এবং বোনের কান্না দেখলাম। মাঝে রয়েছে হাসির রুপোলী ঝিলিক আর জীবনের হাতছানি। যুবক ফিরোজ উদ্দিন। তাঁরও জীবন বেঁচে গেল। সে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি ছিল। প্রহর গুনছিল কখন তার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবে। কিন্তু তা হতে দিলেন না শোভনা সরকার– এক মহীয়সী নারী।
এক বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকলো এই কলকাতা। চিকিৎসকরা যে এখনও আমাদের সম্পদ তা আর একবার প্রমাণ হলো। ডাঃ প্রতীম সেনগুপ্ত পুরো ঘটনাটায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। বয়সে তরুণ। বিখ্যাত নেফ্রোলজিস্ট। তিনি বলছিলেন আইন কানুনের বাধা টপকে শুধুমাত্র টেলিফোনে মেসেজ পাঠিয়ে তিনি টিম গঠন করে ফেলেন। ওটিতে ঢুকে তিনি নিজেই আশ্চর্য হয়ে যান দেখে যে এত তাড়াতাড়ি সবাই এসে গেছে। এবার প্রতিস্থাপনের পালা। এসএসকেএম-এ ফিরোজউদ্দিন এবং কেয়া রায় ছিলেন বেলভিউ হাসপাতালে। শোভনা সরকার নেই। কিন্তু তাঁর চারটি অঙ্গ চারজন মানুষকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
 প্রসেনজিত সরকার, শোভনা সরকারের পুত্র। যিনি প্রধান সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন। একটা দূরদর্শনের কর্মসূচিতে এসেছিলেন সাদা পোশাক পড়ে। এই পোশাক শোকজ্ঞাপন সময়ের জন্য পরা হয়। কিন্তু শোভনা সরকারের জন্য আমাদের কোনও শোক নেই। তিনি তো বেঁচে আছেন আমাদের ভাই-বোনদের মধ্যে। শোভনা সরকার তাঁর চোখ দিয়ে আমাদের দেখছেন। আমরা তাঁর অমূল্য স্পর্শ পাচ্ছি।
পৃথিবীতে সবচাইতে আশ্চর্য প্রজাতির নাম মানুষ। যুধিষ্ঠিরকে বকরূপী ধর্ম যখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তখন তিনি এরকমই একটা উত্তর দিয়েছিলেন। আমারও তাই মনে হয়। মানুষের কার্যকলাপেই আমরা বিরক্ত হই। মন খারাপ করি। কোনও কোনও সময় পরিস্থিতি এত খারাপ হয় যে আমরা সব কিছুর মায়া কাটিয়ে হঠকারিতা করে বসি।
কিন্তু শোভনা সরকাররা সংখ্যায় কম হলেও থাকেন। এই পৃথিবীর যাবতীয় ক্লেদ, কালিমা যাঁরা এক লহমায় মুছে দিতে পারেন। এই পৃথিবীকে আমাদের সকলের জন্য বাসযোগ্য করে দেন। হাজার হাজার হিংসা এক মুহূর্ত শুষে নিয়ে শান্তির পতাকা উড়িয়ে দিতে পারেন।
শোভনা সরকার, আজ তিনি প্রশংসার বাইরে। আর শুকনো পরামর্শ আমাদের নিজের কানেই ক্লিশে মনে হচ্ছে। তিনি যেন আমাদের সকলকে আশীর্বাদ করেন। শোভনা সরকার বেঁচে থাকবেন চিরদিনের মতো।