শান্তিনিকেতনে আর এক তেরেসা

সমর্পিতা ঘটক

0
bty

তেরেসা ভিয়া-র সঙ্গে আলাপ হল শান্তিনিকেতনে। স্পেন থেকে এসেছেন। মধ্যবয়সী সাহসী, উচ্ছ্বল মেয়েটি পেশায় একজন আইনজীবী, চোখে অনেক স্বপ্ন। অনেক বছর ধরেই তিনি ভারতে বেড়াতে আসছেন এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী-সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজও করেছেন এ দেশে। স্পেনের লুগো শহরে তাঁর বাস, সেখানে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এখন আছে্ন শান্তিনিকেতনে, নিজের দেশ, কাছের মানুষদের থেকে দূরে মনের তাগিদে। কারণ, তিনি এখানকার নিঃসম্বল মানুষদের জন্য কিছু করতে চান। ভাঙা ভাঙা ইংরেজি আর বাংলা একটুও না জেনে মনের জোরে জুলাই মাস থেকে রয়েছেন রবি ঠাকুরের লাল মাটির দেশে। মশা-প্রতিরোধক ক্রিম গায়ে মেখে সাইকেল চালিয়ে চষে বেড়াচ্ছে্ন শান্তিনিকেতনের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত।
স্মিত মুখে পরম আন্তরিকতার সঙ্গে বলছিলেন নিজের কথা, “গত ফ্রেব্রুয়ারি মাসে এমনিই এসেছিলাম শান্তিনিকেতনে, ঘুরতে। এখানকার প্রকৃতি, পরিবেশ, নির্জনতা, বিশ্বভারতীর পরিমন্ডল, আমার এত ভাল লেগে গেল যে জুলাই মাসে আবারও ফিরে এলাম এখানে, স্পেনের সেই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে। অন্য বেসরকারী সংস্থার সঙ্গে আমাদের মৌলিক পার্থক্য আছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক এবং অন্যান্য পেশার সঙ্গে যুক্ত মানুষজন মিলেমিশে এই সংস্থা তৈরি করেছি। আমাদের উপদেষ্টা এবং সভাপতি হিসেবে কলকাতার একজন স্প্যানিশবিদ অধ্যাপক আছেন। বাংলায় আমরা একটি সংস্থা গড়তে চলেছি। আমাদের প্রাথমিক উদ্দেশ্য দরিদ্র এবং পিছিয়ে পড়া অসহায় শিশুদের সর্বপ্রকারে সাহায্য করা এবং এই কাজে সারা মাসে যা খরচা হয় তা আমাদের সংস্থা বহন করবে। আমরা কেউ কখনও এই সংস্থার অর্থ গ্রহণ করি না। আমার যাতায়াত এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ নিজের সঞ্চিত অর্থ থেকে ব্যয় করি।”
শান্তিনিকেতনের একটি স্কুলের সঙ্গে মিলেমিশে তেরেসা এই সমাজসেবার কাজটি করতে চায়। এরকম একটি বেসরকারি স্কুল তেরেসাদের পরিকল্পনার কথা শুনে আগ্রহ প্রকাশ করায় এবং দু-পক্ষই রাজি হওয়াতে শুরু করা গেল প্রকল্পের কাজ। স্থানীয় মানুষজনের সঙ্গে ভাব জমতে শুরু করল। তেরেসা খুব খুশি। এই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা যাতে শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে পুষ্টিকর খাবার পায় তার চেষ্টায় তিনি এখন লিপ্ত। নিজেই সেই খাবারের উপকরণ কিনে আনেন। ইতিমধ্যেই রাঁধুনীকে তাঁর প্রাপ্য বেতন দিয়ে ভাত, ডাল, তরকারি, ডিম, মাংস ইত্যাদি রান্না করার ব্যবস্থা করেছেন বাচ্চাদের জন্য, সঙ্গে থাকে ফল, দুধ,। ওই স্কুলে প্রতিদিন ১৬-১৭ ঘণ্টা নিজেও কাজ করেন তেরেসা। ছবি পাঠান আমাদের। বাচ্চাদের হাসি মুখের ছবি। ছাত্রছাত্রীদের দরিদ্র, অসহায় মায়েদের সেলাই শেখাবার জন্যে কলকাতা থেকে দুটি সেলাই মেশিন কিনেছে ওঁর সংস্থা, মায়েরা যাতে স্বনির্ভর হতে পারে তার চেষ্টা করা এই সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তেরেসার নিজের দেশের স্থানীয় সরকারের সৌজন্যে স্পেন থেকে কিছু পোষাক, বই, কম্পিউটার কলকাতায় এসে পৌঁছেছে। এ সবই শিক্ষার্থীদের কাজে লাগবে, জানান তিনি।
mde
– তেরেসা’র উৎসাহে কাজে মগ্ন মহিলারা।
তেরেসা দেখেছেন ওঁদের প্রকল্পের অন্তর্গত সেইসব অসহায় পরিবার যারা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে থাকে, যাঁদের চার পাঁচটি সন্তান আছে, অনেকের অধিকাংশই কন্যা সন্তান, কোনও বাড়িতে বাবা হয়তো অসুস্থ কিংবা মাতাল, কাজ করতে অসমর্থ। তেরেসার উদ্বেগ ওঁর চোখে মুখে দেখতে পাই। কিছুদিন আগে একটি ছেলের পা আগুনে পুড়ে যায় এবং তার পায়ের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করার ব্যবস্থা করেছিলেন তেরেসা। শিশু কিংবা বড়দের চক্ষু চিকিৎসার জন্য ওঁর এক বান্ধবী, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, স্পেন থেকে নভেম্বর মাসে এখানে আসবেন, যাঁরা দৃষ্টিশক্তির সমস্যায় ভুগছেন তাদের চোখ পরীক্ষার পর চিকিৎসা করা হবে এবং প্রয়োজনমতো চশমা বিনামূল্যে দেওয়া হবে।
তেরেসার অনেক পরিকল্পনা আছে মাথার মধ্যে, বলছিলেন “খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এগুলি নিরন্ন মানুষের প্রাথমিক চাহিদা কিন্তু তারপর ছাত্র-ছাত্রীদের পেশাগত দিকটি দেখা দরকার। যারা বেশিদূর পড়াশোনা করবে না, তাদের বিভিন্ন পেশায় শিক্ষিত করার ব্যবস্থা হবে। আমরা ভেবেছি ইলেক্ট্রিশিয়ান, সাইকেল বা মোটর সাইকেল মেরামত অথবা অন্য কোনও পেশায় তাদের আকৃষ্ট করতে হবে এবং তাদের শিক্ষাকালীন অর্থ সাহায্য করা হবে। যদিও এটি মোটেই সহজ কাজ নয়। তবুও চেষ্টাতো করতেই হবে।”
ওঁর কথা শুনে মনে হচ্ছিল, অনেক কঠিন পথ ওঁকে পেরোতে হবে। ভাল কাজে বাধা আসবেই, এ দেশের কিছু দস্তুর আছে সেসবও তিনি হয়তো ঠেকে শিখবেন। ওঁর জন্য রইল শুভকামনা।