হিন্দুরা এবার আমেরিকান কংগ্রেসে তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী

0
Author Image মানস রায় ক্যালিফোর্নিয়া

 

২০১৭’র জানুয়ারিতে শুরু হল ১১৫ তম আমেরিকান কংগ্রেসের অধিবেশন। গণনা করা হল ইলেকটোরাল ভোট। তিনটি রাজ্যে ভোট পুনর্গণনা, ইলেকটোরাল ভোটপ্রদানকারী রিপাবলিকানদের ভয় দেখানো, টেলিভিশনের পর্দায় নামিদামী অ্যাঙ্কারদের কান্নাকাটি, বিনোদন কর্মীদের কানাডা-ইওরোপে স্বেচ্ছা নির্বাসনের হুমকি ও পড়ে পাল্টি খাওয়া, কলেজে বিশ্ববিদ্যালয়ে হিলারি পতনে মুমূর্ষু ছাত্র ছাত্রীদের পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দেওয়া ইত্যাদি হাজারো নাটকের অবসান ঘটিয়ে উপরাষ্ট্রপতি জো বাইডেন ৬ই জানুয়ারি দুপুরে ঘোষণা করলেন, “It’s Over.”  আর বিতর্ক নয়, ট্রাম্প সাহেবের ঝুলিতে ৩০৪ টি, হিলারির ২২৭ টি ভোট। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম রাষ্ট্রপতি হলেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। আমেরিকার ইতিহাসে প্রথম রাষ্ট্রপতি যিনি আগে কোনওদিন কোনও রাজনৈতিক, সামরিক বা সরকারি পদে কাজ করেননি। যাঁর পরিচয় শুধুমাত্র এক সফল ব্যবসায়ী।

trump_bitarka_3

এই ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে নীরবে যোগ হল আরেকটি গুরুত্ত্বপূর্ণ অধ্যায়– ১১৫তম কংগ্রেসে হিন্দুরা তৃতীয় বৃহত্তম গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি পেল– খ্রিস্টান ও ইহুদিদের পরেই। সংখ্যাটা অবশ্য বেশি নয়, পাঁচ। ১১৪তম কংগ্রেসে হিন্দু ছিলেন দুজন, হাওয়াই থেকে নির্বাচিত প্রথম হিন্দু কংগ্রেস ওম্যান তুলসী গাব্বার্দ ও ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত অমিবেরা। ১১৫তম কংগ্রেসে এলেন আরও তিনজন হিন্দু– ইলিনয় থেকে রাজা কৃষ্ণমূর্তি, ওয়াশিংটন থেকে প্রমীলা জয়পাল এবং ক্যালিফোর্নিয়া থেকে আরেক হিন্দু রো খান্না। এরা সবাই নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্রাটিক পার্টির টিকিটে।
এই উপলক্ষে রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসি’তে বিভিন্ন হিন্দু সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজন করা হয় এক মিলন সন্ধ্যা। হিন্দু কংগ্রেস সদস্যরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্রাটিক পার্টির নেত্রী ন্যান্সি পেলোসি, দক্ষিণ-এশিয়ার দায়িত্ব প্রাপ্ত অ্যাসিস্টেন্ট সেক্রেটারি অব স্টেট নিশা বিসোয়াল, সার্জনজেনারেল বিবেক মূর্তি,ভারতের রাষ্ট্রদূত নভতেজ সিং শর্মা ও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি।
হাওয়াই থেকে নির্বাচিত প্রথম হিন্দু কংগ্রেস ওম্যান তুলসী গাব্বার্দ জানান যে তিনি ভাগবত গীতা স্পর্শ করে কংগ্রেস সদস্যপদের শপথ নিয়েছেন, কারণ এই গ্রন্থ তাকে প্রদান করে শক্তি ও শান্তির চিন্তাধারা। এই গ্রন্থ তাকে সাহস যুগিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে রণপ্রাঙ্গণে মৌলবাদী শক্তির সাথে লড়াই করতে। এখানে উল্লেখযোগ্য, তুলসী গাব্বার্দ কংগ্রেসে ইসলামী মৌলবাদীদের সাহায্যকারী শক্তি ও দেশগুলির (সৌদি আরব, পাকিস্তান ও অন্যান্য) বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের দাবি তুলেছেন বারবার। বাংলাদেশে ইসলামী আক্রমণে বিপর্যস্ত হিন্দুদের সপক্ষেও তিনি আওয়াজ তুলেছেন কংগ্রেস ও অন্যান্য মঞ্চে।
নবাগত রাজা কৃষ্ণমূর্তি এবং প্রমীলা জয়পালও গীতা স্পর্শ করে শপথ নেন। রো খান্না শপথ নেন আমেরিকান সংবিধান স্পর্শ করে। শ্রী খান্না বলেন, উনি বিশ্বাস করেন হিন্দু ধর্মের বহুমত-সহনশীলতায় (pluralism)এবং ধর্ম ও রাষ্ট্রের পৃথক অবস্থানে।
আমেরিকায় আর্থিক, শিক্ষা ও সামাজিক অবস্থানে প্রথম সারিতে গণ্য হিন্দু সমাজের এবার রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে এক সঠিক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন আমেরিকান হিন্দু ফাউন্ডেশনের ডিরেক্টর জয় কানসারা। তিনি মনে করেন হিন্দু কংগ্রেস সদস্য, সরকারি উচ্চপদস্থ আধিকারিকও বিশিষ্ট ব্যক্তির এই সমাবেশ আমেরিকার রাজনীতিতে ও নীতি নির্ধারণে ভারত ও হিন্দু বিরোধীদের (ডেমোক্রাট ও রিপাবলিকান দুই দলেই এদের সংখ্যা কম নয়)সতর্ক করবে।
আমেরিকান রাজনীতিতে বিনা প্রতিবাদে ভারত ও হিন্দুদের নিন্দা ও অবজ্ঞা করার দিন যে শেষ হতে চলেছে তার আভাস এই সমাবেশের কিছুদিন আগের একটি ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে। ডেমোক্রাটিক পার্টির সম্ভাব্য ভবিষ্যত নেতা হিসেবে কংগ্রেসম্যান কিথ এলিসন (Keith Ellison) এর নাম ঘোষণা হতেই আশঙ্কা প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় প্রায় ত্রিশটি হিন্দু সংগঠন। বিবৃতিতে বলা হয় যে কংগ্রেসম্যান কিথ এলিসন ভারত বিরোধী সংগঠনের সঙ্গে কর্মকান্ডে যুক্ত ছিলেন, কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের সমর্থক, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদে আনা প্রস্তাবের সমর্থন করেননি। এখানে উল্লেখযোগ্য যে কংগ্রেসম্যান কিথ এলিসন একজন মুসলিম (মহম্মদ হাকিম?)এবং আগে ‘নেশন অব ইসলাম’ নামক একটি বর্ণ বিদ্বেষী ও মৌলবাদী সংগঠনের সাথেও যুক্ত ছিলেন।
হিন্দু সংগঠনগুলির বিবৃতির পর কংগ্রেসম্যান কিথ এলিসন তাদের সাথে কথাবার্তা বলেন এবং জানান যে ভবিষ্যতে উনি হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের প্রতিবাদ করবেন এবং উনি আরও বলেন যে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে গুজরাট এখন ‘closed matter’ এবং সংখ্যালঘুদের স্বার্থে কথা বললেও হিন্দুদের বিরোধিতা তার উদ্দেশ্য নয়। এই(টেলিফোন)আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন তুলসী গাব্বার্দ।
ট্রাম্প জমানায় হিন্দু ডেমোক্রাট কংগ্রেস সদস্য ও অন্যান্য হিন্দু সংগঠনগুলির রাজনৈতিক কার্য্কলাপের দিকে নজর থাকবে পর্য্যবেক্ষকদের।