ভুটানের হিন্দু উদ্বাস্তুরা এখন আমেরিকায়

0
Author Image মানস রায় স্যাক্রামেন্টো, ক্যালিফোর্নিয়া

ভুটান মানে স্বপ্নের দেশ- সাংগ্রী-লা। বেড়াতে যাওয়া বা ট্রেকিং বা ক্লাইমবিং-এর প্ল্যান করা। পশ্চিম বাংলার প্রতিবেশী দেশ হলেও বাঙালির আলাপ আলোচনায় ভুটানের স্থান নেই। থাকার কোনও কারণ আছে বলেও মনে হয় না কারুর। যদিও কিছুদিন আগে হঠাৎ কলকাতার খবরের কাগজগুলিতে প্রথম পাতায় স্থান পেয়েছিল ভুটানের নাম। স্বয়ং ভুটানের রাজা আমাদের মুখ্যমন্ত্রীকে গাড়ি চালিয়ে সীমান্তে পৌঁছে দিয়েছেন আর খাতিরের তো কথাই নেই। দুঃখও করেছেন মুখ্যমন্ত্রী- বিদেশে এত আপ্যায়ন, তবু রাজ্যের কিছু মানুষ তাতে সুখী নয়…ইত্যাদি ইত্যাদি।

Bhutan, political map

আমি বেশিরভাগ বাঙালির মতো কোনও ভুটানিকে চিনতাম না। প্রথম আলাপ কয়েক বছর আগে তাও খুব আকস্মিক। কর্মসূত্রে গিয়েছিলাম আমেরিকার সল্টলেক সিটিতে। সন্ধেবেলা, কাজকর্মের শেষে, মরমনদের গির্জাটিরজা দেখে নৈশাহার করতে গেলাম পাশের একটি মলের ফুড কোর্টে। ফাঁকা জায়গা, এত বড় ফুড কোর্টে গুটি কয়েক লোক খাওয়াদাওয়া করছে, দোকানপাট সব বন্ধ হওয়ার মুখে, হঠাৎ কানে এল চেনা শব্দ। দু’জন ঝাড়ুদার হিন্দিতে কিছু বলছে। এটা নিউ ইয়র্ক, নিউ জার্সি হলে অবাক হতাম না, কিন্তু এখানে! একটু ভাল করে শোনার পর বুঝলাম হিন্দি নয় ভাষাটা নেপালি। এগিয়ে গিয়ে আলাপ শুরু করলাম- আপনারা নেপালি? না, আমরা ভুটানি রিফিউজি।
ভুটানি, কথা বলছে নেপালি ভাষায়, আবার রিফিউজি, ব্যাপারটা কি? রিফিউজি পরিবারে ও রিফিউজি কলোনীতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আমার মনে অনেক প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই জেগে উঠল। দুই ঝাড়ুদারের একজনের মাথায় টিকি। ব্রাহ্মণ? জিজ্ঞাসা করতেই চোখ দিয়ে জল গড়াতে লাগল তাঁর। গ্রামের মন্দিরের পূজারী ছিলেন, ছাত্র পড়াতেন, ভুটান রাজার পুলিশ স্কুল, মন্দির সব বন্ধ করে দিয়েছে, হিন্দু দেব-দেবীর পুজো, নেপালি ও সংস্কৃত ভাষা নিষিদ্ধ। দ্বিতীয় ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করলেন থাকেন কোথায়? বললাম, আপাতত ক্যালিফোর্নিয়ায়, ভাল কথা, তাহলে আপনি এখানে চলে যান আমাদের সম্বন্ধে সব জানতে পারবেন, কাজের সময় আর বেশি কথা বলে সময় নষ্ট করা উচিত নয়। এই বলে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে হাতে ধরিয়ে দিলেন। একটি ইমেলের কপি তাতে লেখা- আগামী ৮ই আগস্ট, ২০১৪ ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদর্শিত হবে চলচ্চিত্র ‘‘দি রিফিউজিস অব সাংগ্রী-লা’’।
পৌঁছে গেলাম বার্কলে। চলচ্চিত্রর বিষয় তার নামেই বলা আছে। ভুটানের স্টক শট আছে, শ্যুটিং করা যায়নি। নেপালের ক্যাম্পে ভুটান থেকে বিতারিত নেপালি উদ্বাস্তুদের করুণ কাহিনী। অপুষ্টি, অসুখ এবং ভবিষ্যৎহীন জীবনযাপন লক্ষাধিক মানুষের। উদ্বাস্তুরা ক্যামেরার সামনে জানিয়েছেন কিভাবে ভুটানের রাজতন্ত্র নির্মম ভাবে কেড়ে নিয়েছে তাদের ন্যুনতম গণতান্ত্রিক অধিকার। ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে তাদের বিদ্যালয়, মন্দির, নিষিদ্ধ করা হয়েছে মাতৃভাষার চর্চা এবং নিজস্ব পোশাক পরার অধিকার। সামান্য প্রতিবাদে কারাগারে পচতে হয়েছে নেপালি নেতাদের। তছনছ করা হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। শালীনতা হানি হয়েছে বহু মহিলার। তথ্যচিত্রের শেষাংশ দেখিয়েছে, আমেরিকার আশ্রয় পা‍ওয়া নেপালিভাষী ভুটানি উদ্বাস্তুদের বর্তমান অবস্থা- ভাল এবং মন্দ দুইই।
ভুটানের পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রধানতঃ তিব্বতীয় বংশোদ্ভূত। তবে ভুটানে নেপালিদের আগমনও বহু পুরনো, সপ্তম শতাব্দীর প্রথমভাগে ভুটানের রাজা কাঠমান্ডু থেকে নেপালি কারিগর আনান তার পিতার চিতাভস্ম রাখার বৌদ্ধ স্তুপ বানানোর জন্য। এরপর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ভুটানের রাজ সরকার নেপালিদের দেশের দক্ষিণাংশে, হিমালয়ের পাদদেশে, জঙ্গল কেটে চাষবাস ও বসবাস করার অনুমতি দেন। সমগ্র ভুটানের খাদ্য ভান্ডার হয়ে ওঠে দক্ষিণ ভুটান। তবে এই নেপালিদের ভুটানের উত্তরাঞ্চলে, অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলে, বসবাসের অধিকার ছিল না। ভারতের স্বাধীনতার পর ১৯৫২ সালে ভুটানি-নেপালিরা দক্ষিণ ভুটান সংলগ্ন পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের নেপালিভাষীদের সহায়তায় গঠন করেন ‘ভুটান স্টেট কংগ্রেস’। ভুটানের রাজ সরকারের তৎপরতায় সেই দল খুব একটা সফলতা অর্জন করেনি।

201142013920863811_20

১৯৮৫-র নাগরিকত্ব আইন আনার পর ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান পিপল’ আওয়াজ তুলে শুরু হয় নেপালিভাষী নাগরিকদের ওপর পার্বত্য অঞ্চলের তিব্বতী ভাষা, সংস্কৃতি ও পোশাক চাপিয়ে দেওয়ার সরকারি হিংস্র অভিযান, অভিযোগ- এরা যথেষ্ট ভুটানি হয়ে উঠছে না বা ওঠার চেষ্টা নেই। রাজনৈতিক মহলের ধারণা, এই বিতাড়নের পিছনে রয়েছে ভুটানের রাজপরিবারের ভয় যে সিকিমের চৌগিয়ালের মতন তাদের স্বৈরাচারী ক্ষমতাও আর বেশি দিন নেই। সিকিমের চৌগিয়ালের পতন ঘঠিয়েছিল প্রধানত নেপালিভাষী প্রজাদের আন্দোলন।
১৯৯০ সালে ভুটান তার জনসংখ্যার ২০ শতাংশকে, যারা নেপালিভাষী ও হিন্দু, বিতাড়িত করে। এখানে উল্লেখযোগ্য হল যে ভুটানের জনসংখ্যা প্রায় আট লক্ষ যার পঁচিশ শতাংশেরও বেশি হল নেপালিভাষী ও ধর্মে হিন্দু। বাকিরা বিভিন্ন তন্ত্রের বৌদ্ধ। নেপালি ছাড়া অন্য প্রধান ভাষা হল জংখ্যা (সরকারি) ও সারছপকা। বিতাড়িত নেপালিভাষী ভুটানিরা প্রধানত নেপালে আশ্রয় নিলেও এদের অনেকেই জীবিকার প্রয়োজনে পশ্চিমবাংলা ও অসমে চলে আসেন। এক ঝটকায় এত বড় বিতাড়নের (দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে) উদাহরণ দুনিয়ায় খুব কম। তবু প্রতিবেশী দেশ ভারতে, বিশেষ করে সুদূর ভিয়েতনাম, কিউবা, প্যালেস্টাইন নিয়ে চিন্তিত রাজনৈতিক সচেতন পশ্চিমবাংলায়, এত বড় এথনিক ক্লিনজিং ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কেউ বিচলিত হয়েছে বলে জানা নেই। কলকাতার কোনও পত্রিকায় এক কলম রিপোর্ট ছাপা হয়নি, কোনও প্রতিষ্ঠান বিরোধী কবি বা লেখক কলমের এক বিন্দু কালি নষ্ট করেননি। প্রতিবেশী দেশের এই নিপীড়িত মানুষগুলি ধর্মে হিন্দু। তবে কোনও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন, গেরুয়াধারী মিশন বা সেবাশ্রম এদের সহায়তায় এগিয়ে আসেননি।
প্রায় কুড়ি বছর পূর্বে নেপালের রিফিউজি ক্যাম্পে আমানবিক জীবন যাপনের পর রাষ্ট্রসংঘের প্রচেষ্টায় এক লক্ষ উদ্বাস্তুর পূনর্বাসনে এগিয়ে আসে সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিপতি আমেরিকা, ২০১০ সাল থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমেরিকা আশ্রয় দিয়েছে পঁচাত্তর হাজার নেপালিভাষী ভুটানি উদ্বাস্তুকে। অন্যান্য শ্বেতকায় পুঁজিবাদী দেশ আশ্রয় দিয়েছে আরও প্রায় পনেরো হাজারকে।
বার্কলে ফিরে যাওয়া যাক। তথ্য চিত্র শেষ হওয়ার পর কথাবার্তা হল চিত্র প্রদর্শনের উদ্যোক্তা হিন্দু আমেরিকান ফোরাম ও ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকার বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা নেপালিভাষী ভুটানি উদ্বাস্তুদের সঙ্গে। কেমন আছেন তারা আমেরিকায়? এক কথায় আগের থেকে নিশ্চয় ভাল, ভুটানি রাজার অত্যাচার ও রিফিউজি ক্যাম্পের অসহ্য লক্ষহীন বন্দী জীবনের চাইতে শতগুণে ভাল, অন্তত একটা জিনিস নিশ্চিত- ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত উজ্জ্বল সম্ভাবনা, যাকে বলে আমেরিকান ড্রীম।
ভুটানি আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন, ক্যালিফোর্নিয়ার সদস্য রাজু সুব্বা জানালেন যে ভুটানি উদ্বাস্তুরা বেশির ভাগই দক্ষিণ ভুটানে, হিমালয়ের পাদদেশে কৃষিকর্মের সঙ্গে যুক্ত মানুষ। এদের বেশিরভাগই কোনওদিন কোনও বড় শহর বা আধুনিক গ্যাজেট দেখেনি, নেপালি ছাড়া অন্য কোনও ভাষা জানে না। নেপালের পূর্বাঞ্চলের রিফিউজি ক্যাম্পেও সেই অবস্থা। সরকারি উদ্যোগে বাসস্থান ও অর্থনৈতিক সহায়তা মিললেও সেটা এক পূর্ণ জীবন নয়। ভাষা জানেন না, গাড়ি চালাতে জানেন না, কিভাবে যুক্ত হবেন এই আধুনিক সমাজে? রিফিউজি ক্যাম্পে হাজার অসুবিধা সত্ত্বেও একটা সামাজিক জীবন ছিল, পূজা, মন্দির, দশেরা, ভাইদুজ, বিয়েসাদী কত কি। সৌভাগ্যের কথা এই নেপালিভাষী ভুটানি উদ্বাস্তুদের জন্য ইংরেজি শিক্ষা, গাড়ি চালানো ও অন্যান্য হাতের কাজের শিক্ষার ব্যবস্থা করছে, ছাত্রদের বৃত্তি চালু করছে। উৎসবের সময় কাছাকাছি (ভারতীয় সমাজের) হিন্দু মন্দিরে যাওয়ার জন্য যাতায়াতের আয়োজন করেছে। এক কথায় নতুন সমাজে নিঃসঙ্গতার ব্যাধি থেকে উদ্ধার করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমেরিকান সমাজে মাথা উঁচু করে চলার পথ দেখাচ্ছে। সব সমস্যার সমাধান হয়েছে তা নয়, ভুটানি উদ্বাস্তুদের মধ্যে আত্মহত্যা ও তার প্রবণতা ও মানসিক অবসাদের হার খুব বেশি।
নেপালের শিবিরে এখনও রয়েছেন বেশ কিছু ভুটানি উদ্বাস্তু এবং দক্ষিণ ভুটানে, তরাই অঞ্চলে অত্যাচারিত হয়ে জীবনধারণ করছেন লক্ষাধিক নেপালিভাষী ভুটানি। রাজু সুব্বার অনুরোধ আপনাদের আত্মীয়স্বজন বন্ধুরা যখন ভুটানে ছুটি কাটাতে যাবেন তখন পারো, থিম্পু, গ্লেসিয়ার দেখার সঙ্গে দেশের দক্ষিণের মানুষদের একটু খোঁজ খবর করবেন।

 

পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের উত্তর সীমান্ত জুড়ে রয়েছে ভুটান। ভুটান একটি স্বাধীন দেশ। ১৯৭১ সালে ভুটান রাষ্ট্রসংঘের সদস্য হয়। ভুটানের দক্ষিণে ভারত আর উত্তরে চিন। ভুটানের আয়তন ৩৮৪০০ বর্গ কিলোমিটার, যা পশ্চিমবঙ্গের অর্ধেকের কম। আনুমানিক জনসংখ্যা সাড়ে সাত লক্ষ। ভুটানের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ ছিল নেপালি বংশোদ্ভুত যাদের বলা হয় লোৎসাম্পা। এরা মূলতঃ হিন্দু এবং নেপালিভাষী। ভুটান একটি রাজতন্ত্র যদিও সম্প্রতি সেখানে নির্বাচন করে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র স্থাপিত হয়েছে। ১৯৯০ নাগাদ ভুটানের রাজা একমাত্র ভুটানি ভাষা জোংখাকে দেশের ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেন ও নেপালি ভাষায় শিক্ষা প্রদান বন্ধ করা হয়। এছাড়া ঘরের বাইরে নেপালিদেরও ভুটানিদের মতন বস্ত্র পড়া বাধ্যতামূলক করা হয়। এর ফলে নেপালিভাষীদের সঙ্গে ভুটানের রাজতন্ত্রের প্রচন্ড সংঘর্ষ বাধে। এর ফলে ভুটান থেকে প্রায় দু’লক্ষ নেপালিভাষীকে ভুটান ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এই উদ্বাস্তু নেপালিভাষী ভুটানিরা নেপালের কয়েকটি ক্যাম্পে রয়েছেন। প্রায় এক লক্ষ উদ্বাস্তুকে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলি আশ্রয় দিয়েছে।

 

ছবি সৌজন্যে- Arid Ocean Maps