টরোন্টোর দুর্গাপুজো’র গল্প

0
Author Image মিত্রা ঘোষ চট্টোপাধ্যায়

২০০০ সালের জুলাই মাস থেকে কানাডায়,  টরোন্টো–র বাসিন্দা আমরা। প্রথম বছরেই অভিজ্ঞতা হয়েছিল এখানকার পুজো দেখার। সে বছরে অক্টোবর মাসে প্রবল ঠান্ডায় কোট-মাফলার টুপি তে নিজেদের মুড়ে নিয়ে একে একে গাড়ী থেকে নেমে দৌড়ে পুজোবাড়িতে ঢুকে পড়েছিলাম। এরকমই হয় প্রতি বছর, মাঝেমধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে  পুজো পড়লে, বেশ সাজগোজ করে, আরাম করেই এক পুজো থেকে আরেক পুজোয় ঘুরে বেড়িয়েছি।  অনেক দূরে দূরে গুটিকতক পুজো হতো আগে, ২০০০ সালের কথা বলছি, টরোন্টো কালীবাড়ি আর প্রবাসী বাঙালী কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন ( ক্লাব )- এই দুটি পুজো দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছিল এক দিদি-জামাইবাবু তাদের গাড়িতে করে  নিয়ে গিয়েছিলেন বলে। নচেৎ, শাড়ি পরে বাসে চড়ে, ঠিকানা খুঁজে, শীতে কাঁপতে কাঁপতে পুজো দেখার সখ আমাদের কিছুতেই হতো না ! দু’- এক বছর কাটলো। ধীরে ধীরে জানলাম টরোন্টোর কাছাকাছি ‘ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে’ও দুর্গাপুজো শুরু হয়েছে।
DSCN2245ক্রমে, টরোন্টো-র  ‘বেদান্ত সোসাইটি’ তে ও পুজো হয় জেনে সেখানেও যেতে শুরু করলাম। হঠাৎ কোনো এক বছরে শুনি , দু-হাজার তিন কি চারে, বাংলাদেশের হিন্দু বাঙালীরাও টরোন্টো-র স্কারবোরো তে কান্তা স্বামী মন্দিরে দুর্গাপুজো করছে। গেলাম সেখানেও। পরে শুনলাম ওই পুজোর কর্মকর্তারা  ‘বাংলাদেশ – কানাডা হিন্দু মন্দির’ স্থাপন করে দুর্গাপুজো শুরু করেছে।  কয়েক বছর পরে জানা গেলো  টরন্টো থেকে বেশ খানিকটা দূরে, হ্যামিল্টনে খুব ঘটা করে পুজো হয়;  ও-দিকের হিন্দু বাঙালীরা, দুই দেশের-ই, সেখানে পুজো করেন। সেই পুজোতেও একবার যাবার সুযোগ হয়ে গেলো এক বন্ধু-র প্রথম কন্যার অন্নপ্রাশন অথবা জন্মদিন উপলক্ষে (এখানে অনেকেই পুজোর সময়ে মন্দিরে বিশেষ দিন বা ঘটনার জন্য আলাদা ভাবে পুজো দিয়ে থাকেন)।  বহু বছর ধরে এই পাঁচটি পুজোতেই ঘুরে ফিরে যেতেন সবাই। কানাডায় নানা দেশের নানা ধর্মের মানুষ,  সুতরাং দুর্গাপুজো বলে ক্যালেন্ডারে একটা দিন-ও ছুটি  নেই।  তাই যাঁরা উদ্যোক্তা, পুরোহিত, ভক্ত বা জনগন তাদের সকলের সুবিধার্থে, পঞ্জিকা অনুযায়ী ষষ্ঠী-র দিনের কাছাকাছি শনি আর রবি বার করে সর্বত্র পুজো হয়, একমাত্র কালীবাড়িতে পঞ্জিকা মেনে যথার্থ  দিনগুলিতে পুজো হয়। ভারত সেবাশ্রম আর বেদান্ত সোসাইটি ধর্ম প্রতিষ্ঠান হলেও সেখানে ভক্ত আর কর্মীরা শুধু বাঙালী নয়, সেখানে পুজোর আচার অনুষ্ঠান তাদের নিজেদের মতো করে। ভারত সেবাশ্রমে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার ছাড়া গায়ানীজ হিন্দু দের আধিক্য বেশী, সেখানে  আমার অভিজ্ঞতায় দুর্গাপুজা নিয়ম করে শুরু হয় ২০০৫ – ৬ থেকে । বেদান্ত সোসাইটি-তে বাঙালী ছাড়াও আমাদের দেশের নানা ভাষার মানুষ, কানাডার মানুষ, হিন্দু-খৃষ্টান ভক্ত সমাগম হয়। প্রত্যেক পুজোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছাড়া বাকী সব এক রকম – পূজা, পাঠ,  গান (আরাধনা), আরতি, অঞ্জলী এবং প্রসাদ ও ভোগ। সকলের জন্য অবারিত দ্বার।
উত্তর আমেরিকায় প্রতিমা, আলো, ডেকরেশন, ঢাক, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাবার-পোশাক-গয়না-বইপত্রের স্টল সবই মন্দিরগৃহের ভিতরে। প্যান্ডেল- আলোকসজ্জা-আড়ম্বর বা উচ্ছ্বাস গৃহের বাইরে নয়।  এ-বছর নতুন সংযোজন হলো ধুনুচি নাচ। তবে ধুনুচির মধ্যে সত্যিকারের আগুন জলন্ত নাড়কেল-ছোবড়া নয়, লাল কৃত্তিম আলো। এখানে বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রত্যেকটি পরিবার বা লোকের থেকে চাঁদা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, যে যেমন খুশী ডোনেশন দেন, ভোগ’এর প্রসাদ স্পনসর করেন। টরণ্টো কালীবাড়ি যেখানে, প্রফেশনাল কোর্ট রাস্তাটির নাম, সেখানে অনেক ধর্মের মন্দির আছে পাশাপাশি। কালীবাড়ি সবথেকে পুরনো বলে সেখানে এতো জনসমাগম হয় যে ভীড়ে চাপা পড়ারও উপক্রম হয়। এই বছর দেখলাম পাশের  মন্দিরটি-তে পূজাপর্ব সরিয়ে  নিয়ে ভীড় সামলানোর সুবন্দোবস্ত হয়েছে। কেউ কেউ বলেন যেখানে বাঙালী সেখানে মতান্তর, ক্ষমতার লড়াই,  দল-ভাগ। টরন্টো এর তার কাছাকাছি অঞ্চলে প্রত্যেক বছর পুজোর সংখ্যা বাড়ছে। পাঁচ থেকে বাড়তে বাড়তে এই বছরে পুজোর সংখ্যা হয়েছে বারো অথবা তেরো। বাংলাদেশের এখন তিন-চারটি পূজা, ডোম এভিন্যু-এ ‘হিন্দু মন্দির’ ছাড়া বার্চমাউন্ট এ ‘হিন্দু ধর্মাশ্রম’,  ‘টরোন্টো দুর্গাবাড়ি’। গত তিন চার বছর ধরে কিচেনারে ( টরন্টো থেকে প্রায় দেড় ঘণ্টার ড্রাইভ) মহালয়া আর দুর্গাপূজা হচ্ছে। দেশ থেকে কার্যসূত্রে আসা ইঞ্জিনীয়ারদের পরিবার টরোন্টোর কাছে  মিসিসাগায় ‘আমার পুজো’ শুরু করেছিল তিন চার বছর আগে। আজ একজন জানালেন সেটিও ভেঙে আমাদের পুজো নামে ব্রাম্পটনে নতুন একটি পুজো অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই বছর থেকে। এই বছরে আরো একটি নতুন পুজো শুরু হলো টরন্টো থেকে একটু দূরে,  হ্যামিলটনের দিকে, ওকভিল-এ – ‘বঙ্গ  পরিবার’।  সুতরাং, যেখানেই বাঙালী, সেখানেই একটি করে পুজো। তবে পুজোর এই সংখ্যাধিক্য-র আরও একটা কারণ আছে যেটা মোটেও ফ্যালনা নয়। এই ঠান্ডার দেশে, বহু দূরে পুজো দেখতে যাবার থেকে নিজেদের এলাকায়,  যেখানে  হিন্দু বাঙ্গালীর সংখ্যা যথেষ্ট বেশী;  নিজেদের মনের মতো করে পুজো, উৎসব-অনুষ্ঠান করতে চাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে , কালীবাড়ি, আশ্রম আর বেদান্ত সোসাইটি এই তিনটি ছাড়া আর সব প্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় আচার-অনুশাসন মানা  থেকে উৎসব হিসেবেই পালিত হয় পুজো;  ছোটো-বড়ো সকলে মিলে বছরে এক নির্দিষ্ট সময়ে মিলিত হয়ে আনন্দ-উৎসব আর  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ভয়াবহ শীতের মুখে শেষবারের মতো মিলনোৎসব। অন্য দেশে অন্য ভূগোল, রীতিনিতি, সমাজ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় বড়ো হয়ে হয়ে ওঠা ছেলেমেয়েরা যেন নিজের দেশ, এমন কি দূরে বা একসঙ্গে থাকা বাবা-মার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য  ভুলে না যায়,  প্রত্যেকটি প্রজন্মে  বিস্তর দূরত্ব তৈরী না হয়, আত্মীয়-বন্ধু-নিজেদের পরিমন্ডল ছেড়ে বিদেশে এসে দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে  সেই প্রচেষ্টা চালানো খুবই সঙ্গত আর  ঐকান্তিক।
২০০৬ এর পর থেকে আমি আর একটানা থাকি না টরোন্টোয়, আসি প্রত্যেক বছর কয়েক মাসের জন্য আর শীতের আগে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বা অক্টোবরের প্রথমে ফিরে যাই কোলকাতায়। এই প্ল্যান-প্রোগ্রামের সঙ্গে কোলকাতার পুজোয় উপস্থিত থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি ধর্ম নিরপেক্ষ, আর ভীড়, ধাক্কাধাক্কি, চ্যাঁচামেচি বেশ অপছন্দ করি, পুজোয় যোগদান করি একেবারেই আড্ডা-আর ছবি তোলার জন্য।  ছবি আর থীম-এ ভর্তি এই শারোদৎসব। পশ্চিম আর পূর্ব বাংলায় শরতের আলো, কাশফুল, নরম প্রকৃতি, ভোরে আর সন্ধ্যায় মৃদু শীতল হাওয়া মনের মধ্যে অদ্ভুত দোলা দেয়, কেমন যেন উদারতা জাগে, ভালোবাসা জাগে, কাছাকাছি হতে সাধ হয় প্রিয়জন-পরিবার আর প্রতিবেশীর সঙ্গে। দুই বাংলার পুজোয় প্রতিমা, আলো, ঢাক আর মন্ডপ তো শিল্পের অন্যমাত্রায় পৌঁছে গেছে। তাই আস্তিক, নাস্তিক, মিশুকে আড্ডাবাজ, একাচোরা গম্ভীর মানুষ এই মহোৎসবে একাকার।  টরণ্টোতেও প্রকৃতি বড়ো সুন্দর এই সময়ে। প্রথম শীতের হাওয়া, মেপল গাছের পাতায় হলুদ, কমলা, লাল, মেরুন রঙের বিজয় কেতন উৎসব-কে আলিঙ্গন করে। বিধর্মী নাস্তিক ধর্মভীরু ভারতীয় বাংলাদেশী গায়ানীজ যেই হই, আমরা সবার রঙে রঙ মেলাতে বেরিয়ে পড়ি। ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। মিলুক প্রাণে প্রাণ। যেখানেই যাই, পরিচিত মানুষ দেখলে জড়িয়ে ধরি, মনের ছোঁওয়াটা ছুঁইয়ে দিই,  আলাপ হয় নতুন বন্ধুদের সঙ্গে।