ভারতে মুসলিম ব্যক্তিগত আইনটির অন্তিম দশা দেখতে পাচ্ছি

গিয়াসুদ্দিন

0

সপরিবারে পিকনিক থেকে ফেরার পর স্ত্রী তাঁর সন্তানদের নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে বাড়িতে প্রায় ঢুকেই গিয়েছিলেন। এমন সময় স্বামী স্ত্রী’কে বললেন, গাড়ির দরজাটা বন্ধ করে যাও। স্ত্রী বললেন, তুমি তো গাড়ির কাছেই আছো, তুমি বন্ধ করে এসো। এতেই স্বামী রেগে গিয়ে স্ত্রী’কে তালাক দিয়ে বসেন।  স্ত্রী’কে বলেন, তুমি আমার কাছে পরিত্যজ্য। তোমাকে ‘এক তালাক’, ‘দুই তালাক’, ‘তিন তালাক’ বাইন তালাক। তুমি এখনই আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাও, আমার বাড়িতে আর কখনও ঢুকবে না। এটা একদম সত্যি ঘটনা। ঘটনাটি ঘটে ২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর  সৌদি আরবে এবং খবরটা আরবের একটি নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয়। আমরা খবরটি তার পরের দিন জানতে পারি বাংলাদেশের ‘মানব জমিন’ খবরের কাগজ থেকে। শুধু সৌদি আরবে নয়, এ আইন ভারতেও চালু আছে।
এটাই শরিয়া আইন। এই আইনে স্ত্রী’কে তালাক দেওয়াটা এ রকমই সহজ ও সরল। হ্যাঁ, শরিয়া তালাক আইন এমনই বর্বর ও আমানবিক। ইন্টারনেটের যুগে এটাকে আরও সহজ করে তোলা হয়েছে। স্ত্রী’কে আর সামনাসামনি তালাক দেওয়া জরুরী নয়। ফোনে তিন বার তালাক বললেই তালাক হয়ে যাবে। হচ্ছেও। এমনকি মোবাইলে টেক্সট মেসেজ পাঠিয়ে কিংবা ইমেল, মেসেঞ্জার ও হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠিয়েও স্ত্রী’কে তালাক দিলে তা বৈধ। পৃথিবী যত আধুনিক ও সভ্য হচ্ছে শরিয়া আইন ততই পশ্চাদপদ ও অসভ্য হচ্ছে। এই অসভ্য আইনের মাথায় বসে আছে ‘অল ইণ্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড’ (AIMPLB)।
রাগের বশে বা ঠাণ্ডা মাথায় স্ত্রী’কে তালাক দেওয়ার যে সব ঘটনা ঘটছে সেগুলি মোটেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কারণ, দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম গ্রামগুলিতে তালাকপ্রাপ্তা মহিলদের সংখ্যা গড়ে এখন ১০/১২ জন। এই তথ্য দিয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার ‘রোকেয়া উন্নয়ন সমিতি’। সমিতির সম্পাদক বলেছেন, শুধু মুর্শিদাবাদ জেলাতেই তালাকপ্রাপ্ত বা স্বামীপরিত্যক্ত্বা মহিলার সংখ্যা এক লাখেরও বেশী। সৌদি আরবে অবস্থাটা আরও খারাপ। সৌদি আরবের একটি সংবাদপত্র আলেকতেসাদিয়ার এক সমীক্ষায় দেখা গেছে,  প্রতিদিন গড়ে ৮২টি হিসাবে ২০১২ সালে ৩০,০০০ তালাকের ঘটনা ঘটেছিল। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য যে সৌদি আরবের জনসংখ্যা মাত্র তিন কোটি।
ভারতে এই আইনটি নির্বিবাদে চালু আছে ভাবলে অবশ্য ভুল হবে। এই আইন নিয়ে মুসলিম সমাজে  তীব্র দ্বন্দ্ব রয়েছে। শিয়া সম্প্রদায়ের মতে তিন তালাকের আইন অবৈধ। এই আইনের প্রতিবাদ জানিয়ে তারা AIMPLB থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৃথক একটি বোর্ড গঠন করেছে। একই কারণে AIMPLB থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটি পৃথক বোর্ড (অল ইণ্ডিয়া মুসলিম মহিলা পার্সোনাল ল বোর্ড, AIMMPLB ) তৈরী করেছেন সুন্নি মুসলিম মহিলারাও। তারা AIMMPLB ‘শরিয়া নিকাহনামা’ নামে একটি পৃথক শরিয়া আইনও প্রণয়ন করেছে। যে আইনটি পুরুষদের বহুবিবাহ ও তিন তালাককে অবৈধ ঘোষণা করেছে।
 AIMPLB– এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সুন্নি মুসলিম সমাজের সাধারণ মহিলারাও। ৯২.১% এবং ৯১.৭% মুসলিম মহিলা বলেছেন যে তাঁরা যথাক্রমে তিন তালাক এবং পুরুষদের বহুবিবাহের অবসান চান। এটি জানা গেছে ভারতীয় মুসলিম নারীদের সংগঠন ‘ভারতীয় মুসলিম মহিলা আন্দোলন’(BMMA)- এর একটি সমীক্ষা থেকে। BMMA এর নেত্রী জাকিয়া সোনাম আরও জানিয়েছেন যে, এই দু’টি আইনের বিলুপ্তি চেয়ে ৭০,০০০(সত্তর হাজার) মানুষের স্বাক্ষর সম্বলিত একটি দাবিপত্র ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর  হাতে তাঁরা তুলে  দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, মুসলিম ব্যক্তিগত আইন রদ করার দাবি জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে তাঁরা একটি পিটিশনও দাখিল করেছেন। সেই পিটিশনের প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট AIMPLBকে বলেছিল,  কেন আইনটি রদ করা হবে না তা হলফনামা(affidavit)দিয়ে জানাতে। AIMPLB-এর নেতৃবৃন্দও ইতিমধ্যেই বহুবিবাহ ও তিন তালাকের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টে তাঁদের হলফনামা (affidavit) পেশ করেছেন। কিন্তু সে হলফনামাটি একেবারে অন্তঃসারশূন্য। তার প্রতিটি ছত্রে রয়েছে অপযুক্তি, অবাস্তব যুক্তি এবং শিশুসুলভ ও হাস্যকর আব্দার।
পুরুষদের বহুবিবাহের পক্ষে AIMPLB-এর প্রধান যুক্তি দেওয়া হল- যদি মহিলাদের সংখ্যা পুরুষদের চেয়ে বেশী হয় এবং পুরুষদের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ থাকে, তবে বহু মহিলাই অবিবাহিত জীবন কাটাতে বাধ্য হবেন। সুতরাং মহিলাদের পক্ষে সতীনের সঙ্গে জীবনযাপন মেনে নেওয়াই যুক্তিসঙ্গত। আর তা না হলে স্ত্রী’র প্রাপ্য অধিকারগুলি ছাড়াই পুরুষের উপপত্নী হয়ে জীবনযাপন করতে হবে তাঁদের। যুক্তির নামে এটা যে অপযুক্তি তা বলা বাহুল্য। তাছাড়া AIMPLB–র প্রতিনিধিরা যে অপযুক্তি দেখিয়েছেন তাতে কার্যত তাঁরা মেনে নিয়েছেন- পুরুষের বহুবিবাহের প্রয়োজন ও প্রাসঙ্গিকতা আর নেই। কারণ, ভারতে নারীর অনুপাতে পুরুষের সংখ্যাই অধিক। এই প্রসঙ্গে AIMPLBকে আর একটা কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া আবশ্যক। তা হল, মহিলারা কিভাবে জীবনযাপন করবেন- সতীনের সঙ্গে ঘর, নাকি কুমারীত্বের জীবন, নাকি উপপত্নীর জীবন- তা ঠিক করবেন মহিলারাই। তাঁদের ভাবনায় ও জীবনে নাক গলানোর অধিকার পুরুষের বিন্দুমাত্র নেই। পুরুষদের বহুবিবাহকে যুক্তিগ্রাহ্য করতে গিয়ে আরও দু’টি কথা তাঁরা বলেছেন যা হাস্যকর বললেও কম বলা হয়। তাঁরা দাবি করেছেন যে, পুরুষের বহুবিবাহ সামাজিক ও নৈতিক চাহিদা পূরণ করছে এবং নারীর জন্যে উদ্বেগ প্রসূ্ত ও নারীর মঙ্গলার্থেই বহুবিবাহের প্রচলন করা হয়েছিল।
তিন তালাকের পক্ষে AIMPLB যে যুক্তিগুলি উপস্থাপিত করেছে সেগুলির প্রতি এবার দৃষ্টিপাত করা যাক। শরিয়তি তিন তালাক আইনটি যে অমানবিক, অসভ্য ও কুৎসিত আইন তা দৃষ্টান্ত সহকারে উপরে  আলোচনা করা হয়েছে। এ রকম একটা আইনকে যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত ও অপরিহার্য প্রমাণ করতে গিয়ে হলফনামায় তাঁরা কী কী যুক্তি সাজিয়েছেন তা দেখা যাক। পুরুষদের কেন মৌখিক তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছে তার পক্ষে তাঁরা যে দুটি যুক্তি হাজির করেছেন, তা হল- পুরুষদের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা বেশী। ২)পুরুষরা সিদ্ধান্ত নেয় ভেবেচিন্তে, ক্রোধবশত কোনও সিদ্ধান্ত নেয় না।
হায় রে!  অপযুক্তি আর কাকে বলে! এ যুক্তি বা দাবি যে হাস্যকর ও বমি উদ্রেককারী তার সবচেয়ে বড়ো সাক্ষী হল ইসলামের আঁতুড় ঘর, মাত্র তিন কোটি মানুষের দেশ সৌদি আরব।
AIMPLB হলফনামায় আরও দাবি করেছে, মৌখিক তালাক আইন নারীর পক্ষেই উত্তম, কারণ তালাক নিয়ে আদালতে যখন শুনানি হয় তাতে নারীর সম্মানের হানি হয় বেশী। এ যুক্তিটি শুধু হাস্যকরই নয়, এটা পুরুষজাতির পক্ষে অবমাননাকরও বটে। কারণ, এই যুক্তি দেখিয়ে AIMPLB গোটা পুরুষজাতিকে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের নিজেদেরকে নীচে নামিয়েছেন। কারণ এ যুক্তির মানে দাঁড়ায় যে মানসম্মানের বালাই যত নারীর, ওটা পুরুষের নেই!
 AIMPLB এক জায়গায় দাবি করেছে, এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণা যে পুরুষরাই কেবল একপেশে ও অপ্রত্যাহারযোগ্য মৌখিক তালাকের অধিকারটি ভোগ করে। এটা সংশয়াতীতভাবেই সম্পূর্ণ মিথ্যে দাবি। কারণ, শরিয়ত আইন স্ত্রী’কে তালাক দেওয়ার অধিকার দেয়নি। AIMPLB পরোক্ষভাবে সেটা স্বীকারও করেছে। যেমন হলফনামায় তাঁরা লিখেছেন যে, A Muslim man can delegate his power of pronouncing talaq to his wife। অর্থাৎ স্বামী স্ত্রী’কে  তালাক দেওয়ার অধিকার দিলে তবেই সে তালাক দিতে পারবে, নচেৎ নয়।
হলফনামায় AIMPLB এর উত্থাপন করা আরও দু’টি হাস্যকর ও শিশুসুলভ যুক্তির কথা উল্লেখ করে এই   আলোচনা শেষ করব। AIMPLB বলেছে যে, যেহেতু মুসলিম ব্যক্তিগত আইন স্বয়ং আল্লাহর আইন এবং আল্লাহর ধর্মপালন করার অধিকার মুসলিমদের মৌলিক অধিকার সেহেতু সুপ্রিম কোর্ট মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এখানে একটা কথা জানাতে চাই যে, ইরাক, ইরান, মিশর, তুরস্ক, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, লিবিয়া, পাকিস্তান, বাংলাদেশ সহ ২২টি মুসলিম দেশ এই আইনটি হয় বর্জন করেছে, না হয় এর সংস্কার করেছে। মুসলিম দুনিয়ার অর্ধেকই যেখানে আল্লাহর(!)আইন মানছে না সেখানে ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে সেই আইনটা মানতেই হবে এমন দাবি যারা করে তারা নিশ্চিতভাবে হয় নাবালক না হয় আহাম্মক। আর ধর্মপালন করার অজুহাতে সর্বোচ্চ আদালতের কাছে নারীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করার অধিকার দাবি করাও কেবল মূর্খ ও আহাম্মকদের  কণ্ঠেই শোভা পায়।
উপসংহারে আর একটা কথা বলতে চাই। তা হল, মানবতাবিরোধী ও কুৎসিত মুসলিম ব্যক্তিগত আইনটি যাদুঘরে পাঠাতে মুসলিম নারীরা যে সংকল্পবদ্ধ লড়াই চালাচ্ছেন তার মধ্যে আমি ভারতের মাটিতে আল্লাহর(!) এই আইনটির  মৃত্যুঘণ্টা শুনতে পাচ্ছি। এবং তারজন্যে আন্দোলনরত বীর নারীদের কুর্ণিশ জানাচ্ছি।
(সৌদি আরবের সংবাদটি পড়তে http://mzamin.com/details.php?mzamin=NDM3MDY=&s=OA==  ক্লিক করুন)।