মানবতার মুখোশ পরে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে মুসলিম সংগঠনগুলি সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়াচ্ছে

গিয়াসুদ্দিন

0
protest against the killings of Rohingya

অনলাইনে চোখ রাখলেই ভেসে উঠছে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসে নিপীড়িত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের করুণ দৃশ্য। খবরের কাগজের পাতা ও দুরদর্শনের পর্দা জুড়েও সেই একই দৃশ্যের মিছিল। রোহিঙ্গা ইস্যু এখন ভাইরাল হয়ে উঠেছে। এমনটা হচ্ছে তার কারণ হল মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ওপর যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালাচ্ছে তা মানবতা ও মানবাধিকারের সমস্ত সীমা লঙ্ঘন করেছে। অভিযোগ উঠছে যে, রোহিঙ্গাদের গ্রামগুলি একের পর এক জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং নির্মমভাবে গুলি করে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। ফলে রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়েই বিপজ্জনক পথে দলে দলে দেশ ছাড়ছে এবং পালাতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে না হয় নদীতে ডুবে শয়ে শয়ে মারা যাচ্ছে ও আহত হচ্ছে।  এই অভিযোগ করেছে  অষ্ট্রেলিয়ার একটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। তারা বলেছে-Many people are risking their lives to escape using perilous routes – some are badly injured, and with children. এই অষ্ট্রেলিয় মানবাধিকার সংগঠনটি আরও বলেছে যে গত দু’সপ্তাহেরও কম সময়ে ৩,৭০,০০০ রোহিঙ্গা মায়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশের সীমান্তে পৌঁছে গেছে –  In less than two weeks, 370,000 Rohingya people have had to flee Myanmar to nearby Bangladesh. রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের যে খবর আসছে তাতে হয়ত কিছু অতিরঞ্জন আছে, কিন্তু পরিস্থিতি যে খুবই ভয়াবহ তা নিয়ে সংশয় নেই। ফলে বিব্রত বৌদ্ধ ধর্মগুরু দলাই লামাকেও আং সান সুচি’র উদ্দেশ্যে  বলতে হয়েছে, “আপনারা শান্তি এবং সৌহার্দ্যের মাধ্যমে জনমানসে সম্প্রীতি ফিরিয়ে আনুন।” পরিস্থিতি এতই ভয়াবহ হয়ে উঠেছে যে ১৩ই সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে অবস্থিত ৪০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসঙ্গে রাষ্ট্রসঙ্ঘকে রোহিঙ্গা সংকটে হস্তক্ষেপ করার আবেদন জানিয়েছে। পরিস্থিতি যে ভয়াবহ তা বোঝা যায় রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার সংক্রান্ত হাইকমিশনার জায়েদ আল হুসেনের মন্তব্যেও। তিনি বলেছেন– “মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপরে যা চলছে তা “জাতি নিধনের আদর্শ উদাহরণ।”
হুসেন ঐ বিবৃতিতে ভারতেরও তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, “মায়ানমারে যখন রোহিঙ্গারা আক্রমণ ও হিংসার শিকার হচ্ছে, ঠিক তখনই ভারত নিজেদের এলাকা থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহিষ্কার করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অন্যায়।” প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে ভারতে চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী রয়েছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রশ্নে ভারত সরকারের এই সিদ্ধান্ত সত্যিই খুবই হতাশাজনক। এই সিদ্ধান্তের আমি তীব্র প্রতিবাদ করছি। এটা ঠিক যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া খুবই ঝুঁকির, তথাপি যারা ভারতে ইতিমধ্যেই প্রবেশ করেছে তাদের বহিষ্কার করা হবে অমানবিক কাজ। কারণ, অসহায় এই ছিন্নমূল শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়াটা সভ্য সমাজের ন্যূনতম মানবিক দায়িত্ব।
তবে মায়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে মুসলমান নিধনের যে অভিযোগ উঠেছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অবশ্য এমনটা সন্দেহ করার যথেষ্ট অবকাশ আছে যে, রোহিঙ্গা নিধনের পরিকল্পনা রয়েছে মায়ানমার সরকারের। এ কথা আমি এই ওয়েব ম্যাগাজিনেই এর আগের নিবন্ধেই বলেছি।
আরও পড়ুন: রোহিঙ্গাদের সমস্যা রাজনৈতিক, সাম্প্রদায়িক নয়
ঐ লেখায় এই অভিযোগও করেছি যে, রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের পাশাপাশি মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব-সহ সকল মৌলিক অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের উপর পরিকল্পিতভাবে ভয়ঙ্কর মানসিক নিপীড়নও চালাচ্ছে যাতে তারা মায়ানমার ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমি এও বলেছি যে, মায়ানমার সরকারের রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হচ্ছে একেবারে সাধারণ নিরীহ রোহিঙ্গারাও। সে লেখায় আমি দাবি জানিয়েছি যে, জঙ্গি রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর হোক, কিন্তু সরকারকে নির্দোষ রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ করতে হবে।
আমার লেখায় মুসলিম মৌলবাদীরা বেজায় রুষ্ট। রুষ্ট মানবাধিকার কর্মী ও সেক্যুলার তকমাধারী বন্ধুরাও। তাদের রোষের কারণ, আমি বলেছি যে, এক) মায়ানমার সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে ঠিকই, কিন্তু রোহিঙ্গারাও ধোওয়া তুলসী পাতা নয়। দুই) রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে একপেশে আলোচনা হচ্ছে। তিন) মুসলমান বলেই রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন হচ্ছে এই অভিযোগ অবাস্তব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং চার) মুসলিম মৌলবাদীরা রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়াচ্ছে।
আমি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাচ্ছি যে, রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ করা, তাদের নাগরিকত্ব ও অন্যান্য সমস্ত মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যে দাবি উঠেছে তার প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন আছে।  তৎসত্ত্বেও বলব যে, পূর্বানুমানের ভিত্তিতে রোহিঙ্গা সংকটের মূল্যায়ন না করে আন্তর্জাতিক মহল ও রাষ্ট্রপুঞ্জকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করতে হবে এবং মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের উপর যে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চালাচ্ছে তা কি ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকে, না এর পেছনে অন্য কারণ আছে তা রাষ্ট্রসঙ্ঘকে খুঁজে দেখতে উদ্যোগী হতে হবে।
 ( http://(http://www.anandabazar.com/international/un-raised-their-voice-on-rohingya-crisis-issue-1.673312)
এই দাবি জানাচ্ছি কারণ, রোহিঙ্গা-সংকট নিয়ে যা আলোচনা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ একপেশে ও একবগ্গা। এরূপ আলোচনা রোহিঙ্গা-সংকটের সমাধানকে ত্বরান্বিত করবে না, বরং আরও জটিল করবে। একবগ্গা আলোচনার ফলে রোহিঙ্গা-সংকটের জন্যে রোহিঙ্গাদের কোনও দায় আছে কী না তা বোঝা যাচ্ছে না। অথচ রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ঘটনাগুলি পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে যে মায়ানমার সরকার বিনা প্ররোচনায় রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন করেছে এমনটা বলা যাবে না। বরং যে সত্যিটি উঠে আসছে তা হল, রোহিঙ্গাদের বৌদ্ধ ও রাষ্ট্রবিরোধী সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপই মায়ানমার সরকারকে বাধ্য করছে বারবার তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত নিতে। এ প্রসঙ্গে দুটো টাটকা উদাহরণ সামনেই রয়েছে। গত বছর (২০১৬) ৯ ই অক্টোবর সন্ত্রাসবাদী রোহিঙ্গারা ৩টি সীমান্ত চৌকিতে হামলা চালিয়ে ৯ জন সীমান্তরক্ষীকে হত্যা করলে মায়ানমার সরকার তাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের নির্দেশ দেয়। গত মাসেও মায়ানমার সরকারকে সেনাভিযানের নির্দেশ দিতে বাধ্য করেছে জঙ্গি রোহিঙ্গারাই। রোহিঙ্গাদের নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ‘আরসা’ (আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি) গত আগষ্ট মাসের শেষের দিকে ৩০টি পুলিশ চৌকি ও একটি সেনা ছাউনিতে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ১৫০ জনকে হত্যা এবং অনেককে আহত করে।রোহিঙ্গা মুসলমানরা সবাই যে শান্তিপ্রিয় নয় এবং তারাও যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী হিংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে সরকারকে সেনা নামাতে বাধ্য করছে এ কথাটা সবাই কিন্তু বেমালুম চেপে যাচ্ছে। সকলেই কেবল মায়ানমার সরকার ও আং সান সুচিকে রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ করার জন্যে চাপ দিচ্ছে, কেউই রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের এই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ নতুন কিছু নয়। সে এক দীর্ঘ ইতিহাস যা আলোচনা করার পরিসর এখানে নেই। তবুও একান্ত প্রাসঙ্গিকতার কারণে সেই ইতিহাসের পাতায় একটু চোখ বোলাতে চাই।
১৯৮২ সালে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয় যা সমর্থনযোগ্য নয়। তথাপি নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার কোনও কারণ আছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। আর সেজন্যে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। ১৯৪৮ সালে মায়ানমার স্বাধীন হয়। ১৯৪৭ সালে মায়ানমারের আকাশে বৃটিশ-সূর্য যখন প্রায় অস্তমিত তখন রাখাইন প্রদেশকে মায়ানমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য করার জন্যে রোহিঙ্গারা বার্মিজ মুসলিম লীগ তৈরী করে এবং গড়ে তোলে মোজাহিদ বাহিনী। অর্থাৎ তারা মায়ানমারের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ছিল না। তথাপি সদ্য স্বাধীন মায়ানমার সরকার তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়ার কথা ভাবেনি। এতদসত্ত্বেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মায়ানমারকে কখনওই নিজের দেশ মনে করেনি, মনে করেছে দারুল হারব (শত্রু দেশ)। তাই তারা মায়ানমারকে মুসলিম রাষ্ট্র বানাবার লক্ষ্যে সন্ত্রাসবাদী জিহাদি কার্যকলাপ অব্যাহত রাখে এবং পরে তৈরী করে জিহাদি সংগঠন ‘আরসা’ যার লক্ষ্য মায়ানমারকে বার্মিজদের হাত থেকে মুক্ত করে ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করা। রোহিঙ্গাদের এই ধারাবাহিক জঙ্গি হামলা দমন করার জন্যেই নে উইন সামরিক সরকার রোহিঙ্গাদের উপর প্রথম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন শুরু করে ১৯৬২ সালে। এই নে উইন সরকারই প্রথম রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশী আখ্যা দেয় এবং রাষ্ট্রীয়  নিপীড়নের মাধ্যমে তাদের বিতাড়নের প্রক্রিয়া শুরু করে। তারই ধারাবাহিকতায় মায়ানমার সরকার ১৯৮২ সালে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া নিশ্চয় নিন্দাজনক, কিন্তু এই কথা কি অস্বীকার করা যায় যে মায়ানমার সরকারকে উক্ত পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করেছে রোহিঙ্গারাই?
মায়ানমারে আরবরা এসেছিল ৮ম/৯ম শতাব্দীতে বাণিজ্যিক কাজে। অথচ বৌদ্ধরা সেখানে বাস করছে ১৩ হাজার বছর ধরে। বৌদ্ধদের দেশ সেই আরাকান ১৪৩০ সালে দখল করে সেখানে মুসলিম রোহিঙ্গা রাজ্য স্থাপন করেন সুলায়মান শাহ যিনি একদা বৌদ্ধ রাজা ছিলেন। প্রচুর সৈন্য দিয়ে তাকে সাহায্য করেছিল গৌড়ের তৎকালীন মুসলমান শাসকরা। সেই রোহিঙ্গা রাজ্য ১৪৭৮ সাল পর্যন্ত টিকেছিল। বলা বাহুল্য যে, এই সময়কালে রোহিঙ্গা মুসলিমরা ব্যপক নিপীড়ন চালিয়েছিল সাধারণ বৌদ্ধদের উপর। এই নিপীড়ন ও অত্যাচারের ইতিহাস তারা তো সবাই ভুলে যায়নি। বৌদ্ধদের উপর রোহিঙ্গা মুসলিমদের সেই দীর্ঘ ও নৃশংস অত্যাচারই বৌদ্ধদের একাংশের মধ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও আক্রোশের জন্ম দিয়েছে। শুধু কি অত্যাচার? অসামরিক বৌদ্ধদের উপর জঙ্গি রোহিঙ্গাদের চোরাগোপ্তা সন্ত্রাসবাদী হামলা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সমগ্র পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে তাই এটাই প্রতীয়মান হয় যে, রোহিঙ্গা-সংকটের সমাধান শুধু মায়ানমার সরকারের হাতে নেই। রোহিঙ্গারা যতদিন না জিহাদের আদর্শ পরিত্যাগ করে মায়ানমারকে নিজের দেশ মনে করতে পারবে, সে দেশের সংবিধান ও সংস্কৃতিকে সম্মান ও মান্য করতে পারবে ততদিন রোহিঙ্গা-সংকটের সমাধান আশা করা বৃথা।
রোহিঙ্গা-সংকটের নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশ্বেই পরিলক্ষিত হচ্ছে যা যথেষ্ট উদ্বেগের। রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন চালাচ্ছে মায়ানমার সরকার, আর মুসলিম মৌলবাদীরা ঘৃণা ও হিংসা ছড়াচ্ছে সমগ্র বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। রোহিঙ্গাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে অস্ত্র করে মুসলিম সংগঠনগুলো নিজ নিজ জায়গায় অমুসলিমদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। ভারতেও তারা এ কাজ করছে। এই তো সেদিন ১২ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় মুসলিম সংগঠনগুলো লক্ষ কণ্ঠে আওয়াজ তুলল- ‘নাড়ায়ে তকবির – আল্লাহু আকবার’। মিছিলে তো মুসলিম অমুসলিম সবাই ছিল, তাহলে ‘আল্লাহ শ্রেষ্ঠ’ – এই ‘নাড়া’ কেন?

Map_Rohingya Migrant

ভারত থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। আমার ধারণা, অধিকাংশ হিন্দু এটা সমর্থন করে না। কিন্তু মুসলিম সংগঠনগুলি এই প্রশ্নে প্রচার চালাচ্ছে যে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিন্দু সমাজ রয়েছে মোদীর পিছনে। মুসলিম সংগঠনগুলি এর আগেই দাবি জানিয়েছে- রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ভারতে আশ্রয় দিতে হবে। এই দাবি কি সুবিবেচনা প্রসূত? কোটি কোটি মানুষ যে দেশে আজও বাস করে খোলা আকাশের নীচে, কোটি কোটি বেকার কাজের অভাবে ধুঁকছে, কত শত শিশু অচিকিৎসা ও অপুষ্টিতে মারা যাচ্ছে প্রতিদিন, যে দেশ জনস্ফীতির ভারে ন্যুব্জ, সে দেশের পক্ষে ভিন দেশের লাখ লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব? একই কারণে বাংলাদেশও তো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে প্রচণ্ড অনিচ্ছুক। যারা ঢুকেছে তারা লুকিয়ে চুরিয়ে। এটাকে গোপন করে মুসলিম সংগঠনগুলি এখানে প্রচার করছে যে, রোহিঙ্গারা মুসলমান বলে তাদের জন্যে ভারতের দরজা বন্ধ। এভাবে তারা সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়াচ্ছে।
আর একটা কথা বলে নিবন্ধটি শেষ করব। প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গা স্মরণার্থীদের বহিষ্কার করার সিদ্ধান্তের পিছনে অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও দুটি কারণ আছে বলে মনে হয়। তা হল, মুসলিম বিদ্বেষ ও ভয়। প্রথমটি ঘৃণ্য ও নিন্দনীয়, কিন্তু দ্বিতীয়টিকে অমূলক বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ সরকারও রোহিঙ্গা স্মরণার্থীদের নিতে একদমই চায় না। এবং যারা ঢুকে পড়েছে তাদের নিয়ে রীতিমতো ভয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কথাতে তা স্পষ্ট। তিনি বলেছেন-“স্মরণার্থীর সাথে ষড়যন্ত্র, অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র অনুপ্রবেশ করতে পারে।”
ভারতের ক্ষেত্রেও রোহিঙ্গা শরণার্থীরা এখানকার জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাথে জোট বাঁধবে না এ’কথা হলফ করে কেউ বলতে পারে না। শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, আজ গোটা বিশ্বই মুসলমান শরণার্থীদের নিতে ভয় করছে। একদিন যে দেশগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইরাক ও সিরিয়ার লক্ষ লক্ষ মুসলিম শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছিল, আজ তারা সবাই ভয় করছে। শুধু মুসলিম-বিদ্বেষ বা ইসলাম-ফোবিয়া বলে চিৎকার করলে হবে না, কেন মুসলিমদের সম্পর্কে অমুসলিমদের মধ্যে ভীতি তৈরী হয়েছে এবং দ্রুতগতিতে  বাড়ছে তা খতিয়ে দেখতে হবে মুসলিমদেরকেই। তা না হলে, মুসলিমরা আরও বিচ্ছিন্ন ও কোণঠাসা হয়ে পড়বে।