‘জগ্গা জাসুস’ দেখে মনে হয় অনুরাগের ছোটবেলা ছিল সত্যজিৎ, টিনটিনময়

সমর্পিতা ঘটক

0
Jagga Jasoos and Anurag Basu

আমাদের কেন একটা অনুরাগ বসু থেকেও নেই? মানে এই কলকাতায়! না হলে হয়তো পাগলা দাশু, সাধু কালাচাঁদ, হর্ষবর্ধন গোবর্ধন, ঘনাদা নিয়ে আমরা এমন ছবি পেতাম, মাতৃভাষায়! আমাদের এই কলকাতায় তো একটা রণবীর কাপুরও নেই, যিনি পরিচালকের এমন অভূতপূর্ব এবং ঝুঁকিপূর্ণ কল্পনার বাস্তবায়নে নিজের পুঁজি খরচ করেন বিনা দ্বিধায়!
ডিজনি অনেকগুলো ছবি প্রযোজনা করল এ’দেশে! কিন্তু জগ্গা জাসুস দেখে মনে হল হ্যাঁ ডিজনির সিনেমা দেখলাম বটে! অস্ত্রব্যবসা, পুরুলিয়া অস্ত্রবর্ষণ, অস্ত্রের চোরা কারবারি এমন সব গম্ভীর বিষয় নিয়ে মজার ছলে গানে গানে, শখের গোয়েন্দাগিরির ওপর ভর করে কী মায়াজাল বুনলেন অনুরাগ! ‘লাইফ ইন এ মেট্রো’-র পর থেকে আপনার প্রতি অনুরাগ গাঢ়তর হয়েছিল। ‘বরফি’ আস্বাদনের দিন থেকে (সব ফালতু সমালোচনাকে কাঁচকলা দেখিয়ে) আপনার প্রতি সে অনুরাগ টইটুম্বুর হয়ে উঠেছিল, এবার উপচে পড়ল। এ ছবি নিয়ে ভালোলাগার পাশাপাশি বেশ কিছু জিনিস নিয়ে সমালোচনা করারও ছিল কিন্তু বিষয় নির্বাচন, উপস্থাপনার ধরণ আর এমন ঝুঁকি নেওয়ার জন্য ছবির দৈর্ঘ্য-টৈর্ঘ্য নিয়ে যা বলব ভেবেছিলাম ওসব শিকেয় তুলে দিলাম। যাঁরা স্বপ্ন দেখেন না বা স্বপ্ন দেখার ‘ভাও’ নিয়েও ভাবেন তাঁরা সেসব খুঁত ধরে আপনার মুন্ডুপাত করবেন, তৈরি থাকুন। টিনটিন বা ঘনাদার অনেক জিনিসই আমাদের আজগুবি ঠেকে কিন্তু তাতে কি ভালবাসায় কমতি হয়! না তো! হালের ‘হ্যারি পটার’ বা আমাদের ‘ব্যাঙ্গমা ব্যাঙ্গমী’, ‘বুড়ো আংলা’, ‘বাতাস বাড়ি’র বাতাস যাদের প্রাণে বুড়বুড়ি কাটে, যারা আমার মত বিশ্বাস করে ‘কাতুকুতু বুড়ো’, ‘হুকুমুখো হ্যাংলা’, ‘কুমড়ো পটাশ’রা আছেন তাদের জগ্‌গার সঙ্গে ময়নাগুড়ি, উখরুল, আফ্রিকাতে পাড়ি জমাতে একটুও অসুবিধা হবে না। যখন জানবেন যে ব্যাডলাকিদের ব্যাড লাকটা ততটাও খারাপ না যতটা আর পাঁচটা লোক ভাবে, ‘গলতি সে মিসটেক’ করে ফেললেও মনটা তখন খারাপের বদলে বেশ ভাল ভাল হয়ে যাবে।

Jagga Jasoos

জগ্গা আর পাঁচটা লোকের মত নয়, সে আলাদা। সে সবার মধ্যে থেকেও একা আর তাঁর একাকিত্বই তাঁকে করে তুলেছে অনুসন্ধিৎসু, সে রহস্যের গন্ধ পায়, লুকিয়ে থাকা সূত্র জুড়ে জুড়ে সে রহস্যের কিনারা করে মগজাস্ত্রে ভর করে। তাঁর বোর্ডিং স্কুলে সবাই ছুটির সময় বাড়ি যায় কিন্তু জগ্গার কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই। তবে তাঁর টুটিফুটির জন্য অপেক্ষা আছে, প্রতি জন্মদিনে টুটিফুটির কাছ থেকে ভিডিও-ক্যাসেট-বন্দি শুভেচ্ছা বার্তা পাওয়ার উত্তেজনাময় প্রতীক্ষা আছে। জীবনে যে রোমাঞ্চ, অ্যডভেঞ্চার থাকতে পারে, জীবন যে সরল রৈখিক নয় সে তো তাঁর পালক-পিতা উরফ টুটিফুটির কাছেই জেনেছে এবং মেনেছে। টুটিফুটি আর জগ্গার সম্পর্কের সমীকরণ যেমন সরল-মায়াময় তেমনি ছেলেমানুষিতে-ভরা। আর তাতে বাঙালি বাঙালি গন্ধ, বাগচি, ভাদুড়ি, সেনগুপ্তদের ঘিরেই তো গল্প এগোয়। নেতাজি আসেন, মনিপুরের উখরুলে সুড়ঙ্গপথ আজাদ হিন্দ ফৌজ ব্যবহার করেছিল এবং এখন এই সুড়ঙ্গ পথ আস্ত্রব্যবসায়ীরা ব্যবহার করছে এমন সব গায়ে কাঁটা দেওয়া তথ্য মজার ছলে গানে-গল্পে ফ্যান্টাসির মোড়কে বলতে থাকেন পরিচালক। তাই জগ্গার জার্নি আমাদের টাইম ট্যাভেল করায় আর আমরাও কমিক বইয়ের পাতায় ভেসে ভেসে কত রকমের কান্ডকারখার সাক্ষী হই। অনেক পাগলামি, তোতলামি, ক্ষেপামি পেরিয়ে.. না না, গল্প বলে দেওয়া তো সমালোচকের কাজ নয়..।
লিরিকে-সুরে প্রীতম, অমিতাভ ভট্টাচার্য যে কাজটা করলেন, সে সব দেশ হলে (যারা লা লা ল্যান্ড বানায়) আপনাদের নিয়ে হইচইটই হত! তবে এখন না হলেও এদেশের ট্র্যাডিশন অনুযায়ী ভবিষ্যতে আপনাদের কীর্তি নিয়ে কিছু নিশ্চই হবে। টেকনিক্যালি যা যা ভালো কিছু হয়- সিনেম্যাটোগ্রাফি, কালার টোন, অ্যানিমেশন, সব কিছু খুব ভালো। অভিনয় সবারই অসাধারণ, ক্যাটরিনা চেষ্টা চালিয়ে গেছেন কিন্তু…। এ ছবিতে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় আর রজতাভ দত্ত যতবার পর্দায় আসেন ততবারই জাত চিনিয়ে দিয়ে যান। আর রণবীরকে নিয়ে যতই বলা হবে কম হবে, কাপুর বংশের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা আর ওঁর প্রজন্মে ওঁকে টক্কর দেওয়ার মত ধারে-ভারে হাতে গোনা কয়েকজনই আছে।
স্টেশনের নাম টিকটিকি, হোটেলের নাম আগাপাশতলা, জায়গার নাম শুন্ডি… অনুরাগ আপনার ছোটবেলাটা নিশ্চই সত্যজিৎ, টিনটিন, গুগাবাবা-দের ঘিরেই কেটেছে, তাই আপনি এখনও এত ফ্যান্টাসিময়… ছবির শেষে যখন অস্ত্রের বদলে কেক পড়ছে প্যারাশুটের মাধ্যমে তখন গুপি গাইন বাঘা বাইনের আকাশ থেকে মিষ্টির হাঁড়ি নেমে আসার দৃশ্য আর কবীর সুমনের গান মনে পড়িয়ে দেয়-
“…ভয় নেই এমন দিন এনে দেব
বোমারু জঙ্গী যত বিমানের ঝাঁক থেকে
বোমা নয়, গুলি নয়, চকলেট, টফি রাশি রাশি
প্যারাটুপারের মত ঝরবে ঝরবে
শুধু তোমারি তোমারি উঠোন জুড়ে প্রিয়তমা।।…”
অভিবাদন অনুরাগ… সিক্যোয়েলের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।