বোরখার তলায় লিপস্টিক কেন না-পসন্দ সেন্সর বোর্ডের ?

সমর্পিতা ঘটক

0

আজ শিবরাত্রি। মেয়েরা স্বামীর কল্যাণে শিবরাত্রি করবে, নির্জলা উপোস করবে, যাদের বিয়ে হয়নি তারা শিবের মতো বর চাইবে- মেয়েদের এমনটাই হওয়া উচিত। গল্পে, উপন্যাসে, সিনেমায় এমন মেয়েদের গল্প বললেই ঝামেলা চুকে যায়। হয় না বলেই তো ফতোয়া দিতে হয়। ক্রিয়েটিভ লাইসেন্সের চক্কোরে, ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেশনের বুলি আউড়ে যা কিছু নিয়ে ছবি করলেই হল? এ কি মগের মুলুক নাকি? এ হল ফতোয়ামুখী ভারতবর্ষ। এই সেদিন বনশালিকে চড় মেরে কেমন সবাইকে ঠান্ডা করার লেসন দেওয়া হল তাতেও হল না? বোরখার তলায় খ্যামটা, চুমু, সেক্স! ছি ছি ছি! ‘লেডি ওরিয়েন্টেড’ ছবি দেখিয়ে হবেটা কী? এইসব শিখবে এ দেশের মেয়েরা?
অতএব প্রকাশ ঝা প্রযোজিত, অলঙ্কৃতা শ্রীবাস্তব পরিচালিত ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বোরখার’ মুক্তি বিশ বাঁও জলে। মুক্তি পেলেও নীতিবাগীশ পুলিশেরা দাড়ি, টিকি নেড়ে কী কী বলতেন তাও জানা। দীপা মেহেতার ‘ফায়ার’ মুক্তির সময় থেকেই যা যা চলে আসছে তা থেকে নতুন কী হল? সেই জং ধরা পহলাজ নিহালনি আর গ্যাদগ্যাদে গজেন্দ্র চৌহান আর তাদের অষ্টাদশ শতকের মস্তিষ্ক ঠিক করে দেবে ভারতবর্ষ কী সিনেমা দেখবে, কতটা দেখবে! ভুল বানানে লেখা সেন্সর বোর্ডের চিঠি এতক্ষণে সবার গোচরে এসেছে। টোকিও এবং মুম্বই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত, জেন্ডার ইকুয়ালিটি পুরস্কার প্রাপ্ত এ ছবিতে অলঙ্কৃতা চারটি মেয়ের গল্প বলেছেন (রত্না পাঠক শাহ, কঙ্কনা সেনশর্মা প্রমুখ অভিনীত)- তাদের কামনা, বাসনা, স্বপ্ন এবং যৌন চাহিদার প্রেক্ষিত আছে। তারা যেমন চায় তেমন করে বাঁচতে চায়। ওইটি চাইলেই মুশকিলে পড়ে যান পহলাজরা। মেয়েদের চাওয়া-টাওয়াগুলো কেটে ছেঁটে মাপ মতন বানিয়ে দিতে চায় সেন্সর বোর্ড কিন্তু অলঙ্কৃতা কী চান? তিনি জানিয়েছেন তিনি আদালতে যাবেন।

Lipistick_bitarka.2

অশ্লীলতার দায়ে, ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত লাগতে পারে এই ভয়ে, কোনও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়ে বিতর্কিত কিছু দেখানোর প্রচেষ্টা হলে, সমকামিতা দেখালে, কোনও মহান ব্যক্তিত্বকে ভগবতরূপে না দেখিয়ে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে দেখালে, কোনও বিতর্কিত রাজনৈতিক/ধর্মীয় ঘটনা নিয়ে ডকুমেন্টারি বা পূর্ণ দৈর্ঘ্যের ছবি যাই বানানো হোক না কেন পরিচালকের কপালে সেন্সর বোর্ডের কাঁচি নাচবেই, তারপর আদালত, মামলা, মোকদ্দমা, ছবি মুক্তি নিয়ে হাজারও ঝক্কি। গা বাঁচিয়ে, নিজের চেতনাকে বাক্সবন্দি করে এমন ছবিই বানিয়ে যাও যা সেন্সর বোর্ডের পছন্দ হবে। অথচ দিনের পর দিন টিভি সিরিয়ালে হয় মূল্যবোধের এবং বৈজ্ঞানিক মানসিকতার দফা রফা করে, কুসংস্কার, মান্ধাতার আমলের বিধি নিষেধ দিব্যি দেখানো হচ্ছে সংস্কারের মোড়কে আর নয়তো মহিলাদের বিজ্ঞাপনী পণ্য হিসেবে, হীনতর জীব হিসেবে, যেমন হয়েই থাকে আর কি! শিশুদেরও সিরিয়াল বা রিয়ালিটি শোয়ে এমন ভাবে উপস্থাপিত করা হয়, তা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন করে যেকোনও সুস্থ চেতনা সম্পন্ন মানুষকে। নীতি-বাগীশরা তখন চুপচাপ। তখন কাঁচির ধার কমে যায়।

 

Lipistick_bitarka.3


সেন্সরবোর্ডের গাইড লাইনে কী আছে তা কেউ জানেনা, ‘মস্তিজাদে’, ‘গ্র্যান্ড মস্তি’ বা ‘কেয়া কুল হ্যায় হাম’-এর মতো অ্যাডাল্ট সেক্স কমেডি, যেসব ছবির সংলাপ দ্ব্যর্থবোধক এবং নিম্নরুচির দিব্যি মুক্তির আলো দেখে অথচ জেমস বন্ডের চুম্বনে কিংবা ভারতীয় ছবিতে ‘লেসবিয়ান’ শব্দে আপত্তি ওঠে। সংস্কারি সেন্সর বোর্ড নিয়ে হাসির হররা ছোটে ফেসবুকে বা অন্যান্য ভার্চুয়াল মাধ্যমে, খবরের চ্যানেলগুলোয় বিতর্ক হয় তারপরও সেই একই ঘটনা, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি।
কিছুদিন আগেই সফলভাবে এই দেশ একক রকেট-লঞ্চের মাধ্যমে ১০৩টি উপগ্রহ পাঠিয়েছে অন্তরীক্ষে, ইসরোতে নাকি অনেক মেধাবী মেয়ের এইসব সফল প্রচেষ্টায় যোগদান এবং অবদান আছে- এইসব খবর পড়লে মনে হয় ভারত এগোচ্ছে, স্বাবলম্বী হচ্ছে কিন্তু এই পহলাজ আর তাদের সেনারা নিজেদের দায়িত্বে পিছন দিকে টানবেনই সময়কে। সামনেই নারী দিবস- নানা সেমিনার হবে, যোগ্য মহিলাদের পুরস্কৃত করা হবে, সংসারে মায়ের অবদান নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে নানা মেসেজ আসবে হয়ত মহিলাদের নিয়ে সেই একই বস্তাপচা স্থূল জোকগুলো সেইদিন কম সংখ্যায় প্রচারিত হবে…।