দঙ্গল’কে পিতৃতন্ত্রের ঘেরাটোপে বেঁধে ফেলা ঠিক হবে না

সমর্পিতা ঘটক

0

দু’বছরে বা কখনও বছরে একটা করে ছবি, বছর শেষে মুক্তি আর তারপর একই ইতিহাস…। এবারও মাল্টিপ্লেক্সে ‘দঙ্গল’ দেখতে ঢোকার লাইন দেখে এই কথাগুলোই মনে হচ্ছিল। বাচ্চা, বয়স্ক, হাতে লাঠি নিয়ে অশীতিপর মানুষকে লাইনে দেখে ভাবছিলাম এঁরা তো রোজকার দর্শক নয়, রোজকার দর্শকদের দেখলে বোঝা যায়, চেনা যায়। সব তিনশো, চারশো কোটির ক্লাবের ছবিগুলোই দেখতে এঁরা আসেন না, ‘সুলতান’ বা ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল’ বা ‘দিলওয়ালে’ দেখতে এঁরা আসবেন না। পাশের স্ক্রিনে ফেলুদা বা ব্যোমকেশ নানা চমক নিয়ে হাজির, কিন্তু ছবির দোষেই হোক আর গোয়েন্দা নিয়ে একঘেঁয়েমি থেকেই হোক এমন উৎসবের চেহারা নেয়নি সেসব ছবির মুক্তি ঘিরে।
ছবি দেখতে দেখতে মহাবীর ফোগটরূপী আমির খানকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি আদপে মননে এবং কাজে এমনই বিশাল, এমনই শক্তিধর, ওই বিশালাকার দেহের সঙ্গে তাঁর মস্তিষ্কও বেশ মানানসই। তাঁর পাশে এ দেশের বাকি সুপারস্টাররা আসলে বেশ খুদে। তিনি ঝুঁকি নেন আর তারপর সাফল্য ‘ঝাক মারকে’ তাঁর ঝুলি পূর্ণ করে দেয়। নিজের বাহ্যিক রূপ ছবির প্রয়োজনে বদলে ফেলেন নির্ভয়ে কারণ তিনি দর্শকের উপর আস্থা রাখেন। কমল হাসান ব্যতীত এমন কোনও সুপারস্টারের কথা মনে পড়ছে না যিনি সুপারস্টার থাকাকালীন চরিত্রের প্রয়োজনে নিজের চেহারা নিয়ে এমন পরীক্ষানিরীক্ষা করেছেন। ছবিতে বয়স্ক ফোগটকে দেখে অবাক হতে হয়! কখনওই তাঁর শরীরী ভাষা আরোপিত মনে হবে না। তাঁর মুখে হরিয়ানভিও সাবলীল লাগে, নেপথ্যের পরিশ্রম বোঝা হয়ে দর্শকের কাঁধে চাপে না। মনে পড়ল যে ‘পিকে’-তে তিনি বলেছিলেন ভোজপুরি আর ‘লগানে’ আওয়াধি, ‘রংগিলা’য় মুম্বাইয়া টাপোরি ভাষা।
আমিরের নিজেকে চ্যালেঞ্জ দেওয়াটাই অর্থাৎ নিজের সঙ্গে নিজের ‘দঙ্গল’ লড়ে যাওয়াটাই আসলে সাফল্যের তুরুপের তাস, দর্শক তাঁর প্রত্যেক ছবিতে দেখতে চান নিজেকে দেওয়া চ্যালেঞ্জে তিনি কেমনভাবে উতরোলেন! অথচ নিজের সাফল্যে মগ্ন থেকে, নিজের দুর্বলতা আড়াল করার উদ্দেশ্যে তিনি তাঁর ছবির পার্শ্বচরিত্রের গুরুত্ব ছেঁটে দেন না। সামগ্রিক ছবির গুণমানের চিন্তা যিনি করবেন তাঁর এমন হীনমন্যতা থাকলে চলবে না। ‘দঙ্গল’-এও অনেক সময় তিনি নেই পর্দায়, না থাকার মধ্যেও থাকা যায় আর তেমন করে থাকতে পারলে টিকে থাকা যায় বহুদিন। আর একটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা প্রযোজক আমিরকেও সফল করে তুলেছে তা হল তাঁর বিষয় নির্বাচন। স্ক্রিপ্ট শুনে বুঝে ফেলার ক্ষমতা। পরিচালকের অন্তর্দৃষ্টির উপর আস্থা আর সর্বস্ব দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার ইচ্ছে।
আমার মনে হয়, বিনোদনধর্মী ছবির মধ্যে দিয়ে মগজে মগজে চিন্তার রসদ পৌঁছে দিতে পারার কাজটা কিন্তু খুব একটা সহজ নয়। প্রেমের জয়গান গাওয়া বা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নায়কের একক বীর গাঁথার গল্প তো অনেক হয়েছে, সফলও হয়েছে কিন্তু সেসবের সঙ্গে ছকের বাইরে অন্যরকম কিছু দেখতে চায় দর্শক। যে গল্পে দর্শক নিজেকে খুঁজে পাবে। এই সিনেমার শেষে যখন টাইটেল কার্ড শুরু হল, সবার ফেরার তাড়া, একজন বয়স্ক দর্শককে দেখলাম রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে, সাবধানে, পাশে বসা মেয়ে যেন দেখে না ফেলে- হয়ত এই বাবার জীবনে কোনও ‘দঙ্গল’ আছে নিজের সন্তানকে নিয়ে। তাই যাঁরা পিতৃতন্ত্রের ঘেরাটোপে ছবিটাকে বেঁধে ফেলতে চাইছেন, খাটো করতে চাইছেন তাদের বলি কলকাতায় বসে হরিয়ানার অখ্যাত (বর্তমানে গীতা, ববিতা আর তাঁর বাবার জন্য খ্যাত) গ্রামের চিত্রটা ধরে ফেলা সহজ নয়। সেখানে মেয়েদের ইচ্ছে অনিচ্ছে সবই বাবা, কাকা, দাদাদের হুকুমের কাছে রোজ পদদলিত হচ্ছে। মহাবীরও ব্যতিক্রম নন, তিনি নিজের ইচ্ছে চাপিয়ে দিয়েছেন নিজের মেয়েদের উপর (যদিও গীতা আর ববিতার মধ্যে পালোয়ান হওয়ার লক্ষণ দেখতে পাওয়ার পরই) তবুও সোনা আনার স্বপ্ন দেখেছেন তিনি মেয়েদের প্রতিভার এবং অধ্যাবসায়ের উপর আস্থা রেখে। আর মনে রাখতে হবে একজন হরিয়ানভি বাবার লড়াইটাও কিন্তু কম ছিল না। পুত্রসন্তান-প্রত্যাশী একজন বাবার অন্যরকম ভাবার লড়াই, ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। নিজের সঙ্কল্পে অটল থাকার লড়াই।
‘যেমন চলছে, তেমনি চলতে দাও’এই মানসিকতার বাইরে বেরোনোর মধ্যে যে তৃপ্তি থাকে কোনও সৃষ্টিশীল মানুষের মনে সেই তৃপ্তিময় অনুভূতি ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল জানতে পারা চাই, জানা থাকলে সেই সন্তুষ্টি ছড়িয়ে পড়ে দর্শকদেরও মনে। প্রত্যেকবার আমির খানের ছবিগুলোতে সেই তৃপ্তির সঙ্গে থাকে নতুন চেতনা সঞ্চারিত করার তাগিদ এবং তাও বিনোদন, মশলা সব যথোপযুক্ত রেখে।