আবেগের সুতোয় টান দিয়ে যাওয়া একটি ছবি

সমর্পিতা ঘটক

0

সত্যি ঘটনা অবলম্বনে ছবি। মূল চরিত্র সারু (সারু ব্রিয়ারলি), তাঁর নিজের লেখা বই (আ লং ওয়ে টু হোম) এই ছবির কাহিনিসূত্র। সারুর শিকড় সন্ধানের গল্প যা অনেকটাই জানা (কাগজে প্রকাশিত হয়েছিল তো, বিস্মিত হয়েছিলাম পড়ে), তাই ছবিটির পরিণতিও দর্শকদের কাছে প্রত্যাশিত। তবু ভাল লাগে কেন এ ছবি? গার্থ ডেভিসের পরিচালনা এবং প্রত্যেকের অসাধারণ অভিনয়। ছোট সারুর চরিত্রে তাক লাগানো অভিনয় সানি পাওয়ারের। বড় সারুর চরিত্রে দেব প্যাটেলও অসামান্য, তিনি সত্যি চরিত্রটিকে ধারণ করেছিলেন। সারুর দাদা গুড্ডুর ভূমিকায় অভিষেক ভারাতেও অসাধারণ (সানি আর অভিষেক-কে আবার দেখা যাবে ‘লাভ সোনিয়া’ ছবিতে)। ছবি জুড়ে ওদের নিঃশব্দ অভিনয় বাঙ্ময় হয়ে ওঠে। কিন্তু অবাক হতে হয় সানি পাওয়ারকে দেখে! তিনি তো জানেন না মেথড অ্যাক্টিং বা বিহেভ করা কাকে বলে? তবুও কি করে ফুটিয়ে তোলেন এমন অভিব্যক্তি এবং শরীরী ভাষা অক্লেশে! পরিচালক ডেভিসের এবং কাস্টিং ডিরেক্টর ক্রিস্টি ম্যাকগ্রেগর-এর কৃতিত্ব (২০০০ বাচ্চার মধ্যে থেকে ‘স্লামকিড সানি’কে নির্বাচন করা হয়) অবশ্যই আছে কিন্তু সানির অসামান্য প্রতিভাকেও অস্বীকার করার উপায় নেই। হৃদয়ের দখল নিয়ে নেওয়া সানির জন্য কেবল এই আশঙ্কাই হচ্ছে- এই অসামান্য প্রতিভাও কি হারিয়ে যাবে? ‘স্লামডগ মিলিওনিয়ার’-এর রুবিনা আলি বা আজহারউদ্দিন মহম্মদ ইসমাইলকে নিয়ে যেমন হইচই হয়েছিল, সানিকে নিয়েও হবে, রূপকথার মতো ঘিরে থাকবে সবকিছু- নিকোল কিডম্যানের গ্ল্যামার, জিম কিমেলের লায়ন কিং-মার্কা আদর, দেব প্যাটেলের কোলে কোলে বাফতা এবং অস্কারের সমারোহে ঘুরে বেড়ানো, কিন্তু তারপর? সানির রূপকথায় কেমন যেন এ ছবির গল্প মিশে থাকে।
সারু হারিয়ে যায় খান্ডোয়ায় তার নিজের গ্রাম গনেশতালায় থেকে। তারপর কলকাতা চলে আসে, সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়া কীভাবে পৌঁছয় আর কুড়ি বছর পর হঠাৎ করেই পূর্ব জীবন তাকে হাতছানি দেয়। তার বর্তমান ভেসে যায় অতীতের ঝোড়ো হাওয়ায়। শুরু হয় ফিরে আসার যাত্রা, একবার নিজের ভিটে মাটি, মা, দাদা, বোনকে দেখতে পাওয়ার অদম্য ইচ্ছে। পালিত মা-বাবার কাছ থেকে অনুমতি পায় আর তারপর শিকড় মিলে যায় শিকড়ে, নাড়ির টানে পাঁচিল ভাঙে দুই পৃথিবীর।

Lion-1-bitarka

ছবির শেষে দুটি ভাবনা মাথায় এল- ভারতবর্ষে কত কিছুই নেই। কিন্তু দীনতা, অভাব, অপুষ্টি, অপরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি এদেশে আছে সম্পর্ক- একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে থাকতে পারাটাই এখানে বেঁচে থাকার রসদ। ঝুপড়িতে থাকা সারু, তার দাদা গুড্ডু, বোন শাকিলা আর তা্দের মা জুড়ে থাকে ভাঙা ঘরে, নড়বড়ে অস্তিত্ব নিয়ে। একে অপরকে যত্ন করে, পরস্পর পরস্পরকে ঘিরে বাঁচে।
আর অন্যদিকে, পশ্চিমি সংস্কৃতিতে লালিত সমাজ অপরিসীম গুরুত্ব দেয় অন্যের মতামতে, অন্যের স্বাধীনতায়। জোর করে চাপিয়ে দেওয়া অনুশাসনের যেকোনও মাহাত্ম্য থাকতে পারে না, সে কথা মনে করিয়ে দেন সারুর পালিত বাবা-মা (সু এবং জন ব্রিয়ারলি)- তাই তো অস্ট্রেলিয়ায় সারুর পাতানো দাদাকে ওঁরা পৃথক স্পেস দেন, ওদেরকে ওদের মতো করে বড় করে তোলেন। আর সারু এদেশে ফিরতে চাইলে খুশি হন কারণ, সারুর দোটানার যন্ত্রণায় জর্জরিত মন মুক্তি পাবে। ভণিতা নেই, জটিলতাও তৈরি হয় না পালিতা মা আর ছেলের মধ্যে। কোনও মেলোড্রামা ছাড়াই তাই এ ছবি আবেগের  সুতোয় টান দিয়ে যায়।