‘মেঘনাদবধ রহস্য’ উচ্চমানের থ্রিলার নয় কিন্তু দর্শকদের ভাবতে বাধ্য করে

সমর্পিতা ঘটক

0
Meghnad Badh Rahasya Bengali suspense

লাখ-লাখ, কোটি-কোটি রহস্য, রোমাঞ্চ আর গোয়েন্দা গল্প নির্ভর ছবিগুলিকে দিব্যি অবজ্ঞা করতে পারলেও ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ উদ্‌ঘাটনের আকর্ষণ এড়িয়ে যেতে পারলাম না, তার একটাই নিপাট কারণ হলেন স্বয়ং পরিচালক মহাশয়। অনীক দত্তের তৃতীয় ছবি। গত দুটি ছবি দেখে ভিন্ন ভিন্ন কারণে উদ্বেলিত হয়েছিলাম। নিজেকে একই ছকে বসিয়ে দর্শককে বোকা তিনি বানাবেন না এই ভরসাটুকু সম্বল ছিল। এবার আবার থ্রিলার। নামটার মধ্যেও একটা মায়াজাল আছে। কিছুটা অন্যরকম গন্ধ ছিল পোস্টার বা টিজারে।
ছবিটির নির্মাণ আর পাঁচটা থ্রিলারের মতো নয়, প্রথমার্ধ বেশ কিছুটা অংশ দেখে মনেই হবে না যে এটি একটি থ্রিলার। তবে প্রবাসী কল্পবিজ্ঞান লেখক আর তাঁর অভিনেত্রী স্ত্রীর অভিজাত জীবনযাপনের গল্প দেখতে দেখতে দর্শকের মনে একটা খচখচানি থেকেই যায়। এই খচখচানির সূত্র আসে প্রথম দৃশ্যে লেখক অসীমাভ বসুর বইয়ের বঙ্গানুবাদ প্রকাশের অনুষ্ঠানের দিন সিরাজুল ইসলামের(যাকে দেখলে এবং শুনলে আজিজুল হকের কথা মনে পড়বেই) প্রশ্ন শুনে আর লেখকের জন্মদিনে রহস্যজনকভাবে ‘মেঘনাদবধ’ কাব্য উপহার পাওয়ার ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। প্রছন্ন হুমকি লেখক বুঝতে পারেন, কারণ বিশেষ একটি পংক্তি দাগিয়ে এই বইটি বিদেশেও তাঁকে পাঠিয়েছিল কেউ, কে তিনি তা জানেন না। আমরাও বুঝতে পারি লেখকের অতীতে সত্তর দশক আছে এবং মেঘনাদের অনুষঙ্গও জড়িয়ে আছে। কারণ, তিনি তাঁর অতীত ভুলতে চাইলেও অতীত তাঁকে ভোলেনি। নকশাল আন্দোলনের টুকরো টুকরো ছবি আর ভুলতে না পারা কোনও গ্লানি তিনি বয়ে বেড়ান। তারপরের গল্পে রহস্য ঘনায় এবং তা উদ্ধারও হয় গল্পের নিজের আঙ্গিকে। আমার মনে পড়ে যায় মৃণাল সেনের ‘একদিন অচানক’ ছবিটার কথা। না সেটি থ্রিলার নয় হয়ত কিন্তু ছবির শেষে ‘কোথায়’, ‘কীভাবে’ এবং ‘কেন’ এই তিনটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর সে ছবিতেও পাওয়া যায় না। এখানেও দর্শকের ওপর দায়িত্ব বর্তায়।
নকশাল আন্দোলনকে ভিত্তি করে অনেক ছবি হয়েছে, এ ছবিতেও কোনও এক চরিত্র এই একই থিম নিয়ে বাঙালিদের পড়ে থাকাকে ‘নকশালজিয়া’ বলে বিদ্রুপ করেছেন। অনীক ‘ভূতের ভবিষ্যতে’ও এই থিম ছুঁয়ে গেছেন। এই আন্দোলন তাঁকে ভাবায় বা হয়ত কোনও পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ যোগ আছে তাঁর সত্তরের বিপ্লবের সঙ্গে। তিনি ‘pun’ মিশিয়ে সংলাপ লেখেন, সমাজ, রাজনীতি, ঠুনকো সম্পর্ক, সরকারি খেতাব, শিল্পীদের শিরদাঁড়া বেঁকিয়ে ‘যো হুঁজুর’ অবস্থান নিয়ে দিব্যি নিজের স্টাইলে উপহাস করেন, তারমধ্যে কিছু ক্লিশেও থাকে তবু সেসব নিয়ে ঠাট্টা শুনতে ও বলতে বাঙালির ভালোই লাগে। কিন্তু তার বাইরেও তাঁর ছবি নিয়ে ভাবার কিছু থাকে। সিরিয়াল-মার্কা সম্পর্কের গল্প, প্রেম-একাকিত্ব, আধুনিক জীবন ও চর্বিত চর্বণ নিয়ে ছবিগুলো একঘেঁয়ে লাগে, তাই যখন এ ছবিতে থ্রিলারের মোড়কে কিছু প্রশ্ন ওঠে তখন ভাবতে ইচ্ছে করে, সত্যি একজন বিপ্লবী তাঁর আদর্শ, বিপ্লবের পথ পরিত্যাগ করে কীরকম জীবন অতিবাহিত করেন? শুনেছি অনেক নকশাল বিপ্লবীই নাকি বিদেশে সেটল করেছে্ন। তাদের জীবন তো অসীমাভর মতোই, ভুরভুরে ফরাসী সুগন্ধ, বিদেশী স্কচ-ভদকা, হাভানার তামাকের স্পর্শে class apart। আবার অনেক বিপ্লবী বিনি সুতোর মালার মত আদর্শ বয়ে বেড়াচ্ছেন, ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ হয়ে সয়ে যাচ্ছেন সময়কে, বয়ে বেড়াচ্ছেন এ জীবন। আবার সিরাজুলরাও আছেন, এঁদো গলিতে, বারো ঘর এক উঠোন পেরিয়ে, স্যাঁতলা দেওয়াল আর খুপরি ঘরে কিছুটা বীতশ্রদ্ধ আর খানিক ভঙ্গুর স্বপ্ন নিয়ে…। যখন দেখি কোনও এক সময়ে সাম্যে, যৌথ-খামারে বিশ্বাস করা অসীমাভ তাঁর আশ্রিত-কর্মচারী(সম্পর্কে ভাগনে) এবং ভৃত্যের প্রতি অসম আচরণ করেন, তখন তা তাঁর পলায়ন মনোবৃত্তির থেকে অনেক বেশি অসহনীয় মনে হয়।
থ্রিলার হিসেবে প্রচুর চমক, আলো আঁধারির খেলা এ ছবিতে নেই। বরং বলা যায় অতীত বা একটি বিশেষ সময়কাল এই গল্পে নাটকীয় মোড় তৈরি করে, তাতে উচ্চ মানের থ্রিলার তৈরি হয় না ঠিকই তবে ভাবনার উদ্রেক হয়, জিজ্ঞাসা ভর করে… আবার পপকর্ন আর কফির গন্ধে তা ভেসেও যায় মাল্টিপ্লেক্সের করিডর বেয়ে…।
গৌতম হালদারের ‘মেঘনাদ বধ’ নাটকটাই ছবির টাইটেল কার্ড, ভালো লাগে নাটকীয় অভিঘাত। সবার অভিনয় খুব ভালো। ছবিতে অনীকীয় ঘরানা আছে আবার নেইও। শেষের গানটি ছবির থ্রিলার-মার্কা মুড বদলে দেয় এবং গানটি অসাধারণ।