লাস ভেগাস হত্যাকাণ্ড কি আমেরিকার অস্ত্র আইনে পরিবর্তন আনবে ?

মানস রায়, ক্যালিফোর্নিয়া

0
Gun law in the USA

পয়লা অক্টোবর, ২০১৭। রাত দশটা। দুনিয়ার আমোদ প্রমোদের আকর্ষণীয়তম স্থান  লাস ভেগাসে চলছে country music ফেস্টিভ্যাল। বাইশ হাজার মানুষ উপভোগ করছেন অক্টোবর মাসে ফসল তোলার উৎসবের সঙ্গীতানুষ্ঠান। কান্ট্রি মিউজিককে অনেকটা আমাদের লোকগীতির সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। সবে God Bless America গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জনতা একটু হাফ ছাড়ছেন এমন সময় আকাশ থেকে ছুটে আসতে লাগল গুলির পর গুলি। ঠিক কি হচ্ছে বোঝার আগে লুটিয়ে পড়ল শয়ে শয়ে মানুষ। গোলাগুলি বন্ধ হতে মালুম হল পঞ্চাশ জন নিহত (এই লেখার সময় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮) এবং আহত অন্তত: ৫০০।
সঙ্গীত অনুষ্ঠানের পাশের এক হোটেলের বত্রিশ তলার জানালা থেকে চলেছে গুলি। পুলিশ হোটেলের সেই ঘরে পৌঁছে দেখে আততায়ী মৃত, আত্মহত্যা করেছে। নামধাম জানতে দেরী হয়নি এবং তৎক্ষণাত তা প্রকাশ করে দেওয়া হয়েছে (যা প্রায়শ: করা হয় না)। আততায়ীর নাম স্টিফেন পডোক। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সে শ্বেতকায়, বয়স ৬৪। লাস ভেগাসের ৮০ মাইল দূরে তার বাড়ি। জুয়া খেলত অনলাইনে বা লাস ভেগাসে এসে। ডিভোর্সী, সন্তান নেই। গার্লফ্রেন্ড আছে। গার্লফ্রেন্ড এখন বিদেশে। তার সঠিক পরিচয় নিয়ে কিছু ধন্ধ আছে এবং টাকা পয়সার লেনদেন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সে আমেরিকায় ফিরে আসবে জানিয়েছে। দেখা যাক সে কবে ফেরে।
স্টিফেন পডোক কোনও রাজনীতি বা ধর্মীয় দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে শোনা যাচ্ছে না। প্রতিবেশীরা  তাকে ভালো মানুষ বলেই জানে (এটা অবশ্য প্রায় সব সন্ত্রাসবাদীদের প্রতিবেশীদেরও বলতে শোনা গিয়েছে)। তার বাবা জেল পালানো ব্যাঙ্ক ডাকাত, এফবিআই-এর  ক্রিমিনাল লিস্টের প্রথম ১০ জনের মধ্যে  ছিল।  বাবা অনেক কাল মৃত।  তার হোটেলরুমে পাওয়া গেছে ২৩টি বন্দুক, বাড়িতে আরও ১৯টি বন্দুক।  তার বন্দুকের মোট সংখ্যা ৪২টি।

Las-Vegas-shooting

হঠাৎ কী হল? কেন লোকটি এতগুলো মানুষ মারল? মেরে আত্মঘাতী হল। কি কারণ? না, এখনও কারণ জানা যায়নি। জানার চেষ্টা চলছে।  ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বলছে সম্প্রতি জুয়ায় সে হাজার দশেক ডলার হেরেছে। পাকা জুয়াড়ির কাছে এটা বড় ব্যাপার হওয়ার কথা নয়। হারজিত তো জুয়ার অঙ্গ। ISIS দাবি করছে স্টিফেন পডোক তাদেরই যোদ্ধা, সম্প্রতি সে ইসলাম কবুল করেছে। ISIS এর বাজার এখন একটু মন্দা তাই সরকার এই দাবিকে পাত্তা দিচ্ছে না। কিন্তু ইসলাম কবুল করার ব্যাপারে কেউ মুখ খুলছে না। কেউ কেউ আবার এই হত্যাকাণ্ডকে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে উগ্র ট্রাম্প বিরোধীদের হাত দেখছেন। মনে করিয়ে দিচ্ছেন গত জুন মাসে রিপাবলিকান সেনেটার ও কংগ্রেসম্যানদের ওপর ট্রাম্প বিরোধী বন্দুকবাজের আক্রমণ এবং ক্যালিফোর্নিয়ার ও অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে ট্রাম্প সমর্থকদের আক্রমণের ঘটনাগুলিকে। আমেরিকান মিডিয়া CBS এর এক আইন বিশেষজ্ঞ পরিষ্কার বলেছেন যে ভেগাসে যারা মারা গেছে তাদের প্রতি তার কোনও সহানুভূতি নেই। কারণ, কান্ট্রি মিউজিক প্রেমীরা রিপাবলিকান ও বন্দুকপ্রেমী।
খুব প্রত্যাশিতভাবে ডেমোক্রাট পার্টির নেতারা ও তাদের অনুসারী মিডিয়া এই ঘটনার জন্য সরাসরি দায়ী করেছেন রিপাবলিকানদের, তাদের বন্দুক প্রেমের জন্য।
এখানে এই বন্দুক প্রেমের ব্যাপারটা একটু খোলসা করা যাক। আমেরিকার সংবিধানের বিল অব রাইটস এর দ্বিতীয় ধারায় (second amendment)লেখা আছে: “A well regulated Militia, being necessary to the security of a free State, the right of the people to keep and bear Arms, shall not be infringed.” অর্থাৎ নাগরিকদের অস্ত্র রাখার ও সঙ্গে নিয়ে ঘোরার অধিকার লঙ্ঘন করা চলবে না।
অস্ত্র কাকে বলে, যারা অস্ত্র রাখবে তাদের কোনও নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র দলের(regulated militia)সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক কিনা ইত্যাদি নিয়ে গত একশ বছরে অনেক বিতণ্ডা হয়েছে, মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে অনেকবার। সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত (২০১৬) অনুযায়ী নাগরিকদের পছন্দমতো বন্দুক সঙ্গে রাখার অধিকারকে অক্ষুন্ন রয়েছে তবে স্থানীয় প্রশাসন প্রয়োজনমতো কিছু নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে পারে।
ডেমোক্রাটরা কঠোর নিয়ন্ত্রণের পক্ষে এবং নীতিগতভাবে সেকেন্ড এমেন্ডমেন্ট বা অস্ত্র রাখার অধিকার বাতিল করার পক্ষে। তাদের যুক্তি অস্ত্র কেনা ও রাখার ওপর কড়াকড়ি হলে এ জাতীয় হত্যাকান্ড কমে যাবে।
অন্যদিকে রিপাবলিকানরা মনে করে কড়াকড়ির ছুতোয় ডেমোক্রাটরা সংবিধানে প্রদত্ত একটি নাগরিক অধিকারকে হরণ করার দিকে এগোচ্ছে। তারা মনে করে হত্যার জন্য বন্দুক নয়, তার পেছনের মানুষটি দায়ি। যেমন, নাইন ইলেভেন (২০০১ সালে নিউইওর্কে ইসলামিক আক্রমণ, মৃত ৩০০০) বাবস্টন বম্বিং-এ (২০১৩, ৩ জন মৃত, শতাধিক আহত) বন্দুক ছিল না। ছিল একটি বিকৃত মতালম্বী মানুষেরা।
লাস ভেগাস হত্যাকাণ্ডর ঘটনা সত্যি কি অস্ত্র আইনে পরিবর্তন আনবে? কিভাবে  একজন সাধারণ নাগরিক অনায়াসে ৪২টি আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে পারে, বাড়ি থেকে হোটেলের ঘরে আনতে পারে এই সব প্রশ্ন কি আমেরিকার মানুষকে নতুন করে ভাবাবে?
বলা মুস্কিল।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে কানেকটিকট প্রদেশে Sandy Hook Elementary School এমাত্র কুড়ি বছরের যুবক এডামলানজা গুলি করে হত্যা করে কুড়িটি শিশুকে। সারা দেশ শিউরে উঠেছিল সেই বীভৎস হত্যাকাণ্ডে। second amendment বিরোধী বরাক ওবামা তখন প্রেসিডেন্ট। অনেকেই আশা করেছিলেন এই শিশু হত্যা বন্দুক প্রেমীদের হৃদয় পরিবর্তন করবে। ওবামা চেষ্টা করেছিলেন বন্দুক কেনা ও ব্যবহারে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ আনার আইন কংগ্রেসে পাশ করাতে পারেননি। তখন ওবামাকে সমর্থন করেছিলেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আবার সেই ট্রাম্প ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারে second amendment এর সমর্থনে ও বন্দুক কেনা ও ব্যবহারে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন এবং ভোট জিতেছিলেন।
সুতরাং আমেরিকার মানুষ সত্যিই কি বন্দুকের অধিকার ত্যাগ কতে চায়? সর্বশেষ খবর: লাস ভেগাস হত্যাকাণ্ডের ফলে বন্দুক ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার প্রস্তাবিত আইনটি আপাতত কংগ্রেসে আনা হবে না বলে ঘোষণা করেছেন স্পীকার পল রায়ান।