আগস্টে হাসিনাকে হত্যার চক্রান্ত মিলিতভাবে করেছিল বিএনপি ও আইএসআই

সুবীর ভৌমিক

0
Sheikh Hasina

গত আগস্ট মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাণঘাতী হামলা থেকে অল্পের জন্য রেহাই পেয়ে যান। বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের এবং সন্ত্রাস দমন শাখার আধিকারিকদের তৎপরতায় হাসিনার উপর ওই হামলার প্রচেষ্টা বানচাল হয়ে যায়।
২৪ আগস্ট সন্ধ্যায় যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের দফতর থেকে বেরোবেন তখন তার উপর হামলা চালানোর জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা ৬-৭জন এসএসএফ কর্মীকে (যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তায় থাকেন) প্রস্তাব দেয়।
ঠিক সেই সময় জেএমবি’র জিহাদিরা প্রধানমন্ত্রীর দফতরের আশপাশে বড় ধরণের বিস্ফোরণ ঘটাবে বলে পরিকল্পনা করেছিল। যাতে অন্য নিরাপত্তারক্ষীদের নজর সেদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায় এবং শেখ হাসিনার উপর হামলাকারীরা বিনা বাধায় এলাকা ছেড়ে নিরাপদ দূরত্বে চলে যেতে পারে।
এই প্রতিবেদককে বাংলাদেশ সরকারের এক শীর্ষ আধিকারিক একান্ত ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন- ‘‘পুরো এই হামলার ছকটি কষা হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধীর উপর হামলার অনুকরনে। ভিতরে হামলা চালাবে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের একাংশ এবং বাইরে সহযোগিতা করবে জিহাদিরা’’।
কিন্তু দুর্বৃত্তপরায়ণ ওই এসএসএফ সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের বিরোধীদলের এক প্রবীণ নেতার মাধ্যমে জেএমবি’র আলোচনার বিষয়টি ধরা পড়ে যায়। ভারত, বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা যারা যৌথভাবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় চরমপন্থীদের আলাপচারিতার উপর নজরদারি চালায়, তারা এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টি টের পেয়ে যায় এবং এসএসএফ-এর বিশ্বস্ত সদস্যরা ওই দুর্বৃত্তপরায়ণ সদস্যদের এই ষড়যন্ত্র থেকে সরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
সন্ত্রাসদমন বিভাগের আধিকারিকরা দ্রুত তাদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছে। তারা এখন কোথায় সে বিষয়ে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। সম্ভবত তারা জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যাতে তাদের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীদের শিকড়ে পৌঁছনো যায়।
যখন ষড়যন্ত্রের বিষয়টি গোয়েন্দাদের কাছে দিনের আলোর মতো পরিষ্কার তখন প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে তাঁর দফতরের বাইরে থাকতে বলা হয়, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত কারণে গিয়েছিলেন। বিশ্বস্ত এসএসএফ আধিকারিকরা এমনভাবে এলাকাটি ঘিরে রাখেন যাতে মাছিও না গলতে পারে। দুর্বৃত্তপরায়ন এসএসএফ কর্মীদের আটক করার পর প্রধানমন্ত্রী নিজের দফতরে ফিরতে পেরেছিলেন।
ওই শীর্ষ আধিকারিক জানিয়েছেন- ‘‘এই গোটা অপারেশনটা অত্যন্ত গোপনিয়তার সঙ্গে করা হয়েছে, আমরা এখনও মূল ষড়যন্ত্রকারীদের ধরার চেষ্টায় রয়েছি, তাই আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিষয়ে কিছু প্রকাশ করা হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতেও করা হবে না’’।
বাংলাদেশ এবং ভারতীয় গোয়েন্দাদের সন্দেহ, এই গোটা ষড়যন্ত্রের পিছনে রয়েছে পাকিস্তান এবং গত জুলাই মাসে লন্ডনে খালেদা জিয়া এবং তাঁর ছেলে তারেকের সঙ্গে আইএসআই-এর ব্রিগেডিয়ার ‘আশফাক’ দেখা করেন (বাংলাদেশের সব সংবাদ মাধ্যমেই খবরটি প্রকাশিত হয়েছিল)। সম্ভবত সেই সময়ই এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়।
তবে যে খবরটি বাংলাদেশের কোনও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি, সেটি হল- ২৪শে আগস্টের আগে দু’জন এসএসজি আধিকারিক মেজর জেনারেল নুম্যান জাকারিয়া এবং মেজর জেনারেল তারেক গুলজারও লন্ডনের বাণিজ্যিক এলাকায় প্রয়াত জিয়ায়ুর রহমানের আত্মীয় বিলকিস প্রধান যুথি’র বাড়িতে খালেদা এবং তারেকে’র সঙ্গে দেখা করেন।
বাংলাদেশ এবং ভারতের গোয়েন্দারা জাকারিয়া থেকে আইএসআই-র এক শীর্ষ আধিকারিক-এর ফোন কল ঘেটে জানতে পরেছে, দ্রুত বাংলাদেশকে এলোমেলো করে দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
গুলজারকে আইএসআই’র কর্তারা নির্দেশ দিয়েছিল তাদের জন্য একটা ট্রাভেল প্ল্যান তৈরি করে পাঠাতে।
বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাতে যেমন ভাল কর্মীরা রয়েছেন তেমনি ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাতে রয়েছে উন্নতমানের প্রযুক্তি (TECHINT and SIGINT)।
এর আগে ভারত এবং বাংলাদেশের গোয়েন্দারা ব্রিগেডিয়ার ‘আশফাক’ এবং আরাকান রোহিঙ্গা সলভেশন আর্মি’র (ARSA) সামরিক প্রধান হাফিজ তোহারের মধ্যেকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়। ‘আশফাক’ তোহারকে বলেন ২৪ আগস্ট রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রাক্তন মহাসচিব কফি আন্নান আং সান সুচি এবং মায়ানমারের রাষ্ট্রপতি হিনন কিউয়কে রাখাইন কমিশনের রিপোর্ট দেওয়ার পর বার্মিজ নিরাপত্তাবাহিনীর উপর একাধিক জায়গায় হামলা চালাতে।
২৪ আগস্ট মাঝরাতে তোহারের গেরিলারা রোহিঙ্গা গ্রামবাসীদের সহায়তায় ৩০টি থানা ও একটি সেনা ছাউনিতে হামলা চালায়।
এই হামলা মায়ানমারে বহু প্রতিক্ষিত শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে। আন সান সুচি রাখাইন কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে রাখাইন প্রদেশে শান্তি ফেরানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশের গোয়েন্দারা সন্দেহ করছে খালেদা এবং তারেকের সঙ্গে সাক্ষাতের পর আইএসআই বড় ধরণের একটি সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। সেটি হল, বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তবর্তী অঞ্চলকে অশান্ত করা এবং হাসিনাকে হত্যা করা।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গিয়েছে, গোটা বাংলাদেশে লাল সতর্কতা জারি করা হয়েছে। গোয়েন্দারা মনে করছে পাকিস্তান-বিএনপি মিলিতভাবে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরনার্থী এলাকায় সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর চেষ্টা চালাতে পারে, বিশেষ করে এই দুর্গা পুজোর সময়।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই নিয়ে ১১ বার শেখ হাসিনার উপর হামলার চেষ্টা চালানো হয়।

লেখক- প্রবীণ সাংবাদিক BBC, ” Insurgent Crossfire” (1996) বইটির লেখক।