নিউটনের পূর্বসূরীরা

ভূপতি চক্রবর্তী

0
Isaac Newton

আধুনিক ভৌতবিজ্ঞান বলতে যা বোঝায় তার গোড়াপত্তন হয়েছিল গ্যালিলিও-নিউটনের হাতে। গ্যালিলিও যে যাত্রাপথের সন্ধান পেয়েছিলেন ইতালিতে তা বহু বিরোধিতার মুখোমুখি হয় ধর্মগুরুদের দিক থেকে। ইতালি ছিল পোপের অধিস্থান আর তার প্রভাব অনায়াসেই ছাপিয়ে যেত তৎকালীন ছোট ছোট রাজ্যের শাসকদের। আর তাছাড়া গ্যালিলিওর সময়টা নিউটনের থেকে ছিল কিছুটা আগের। তাঁর মৃত্যুর বছরে জন্ম হয় নিউটনের।
তবু স্যার আইজাক নিউটন তার প্রতিষ্ঠা লাভের পরে অত্যন্ত বিনীতভাবে জানিয়েছিলেন যে কিছু জ্ঞানী মহারথীদের স্কন্ধনির্ভর হওয়ার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন বলে কিছুটা দূর পর্যন্ত তাঁর পক্ষে দেখা সম্ভব হয়েছিল। তিনি আর একবার বলেছিলেন, তিনি প্রকৃতপক্ষে এক অন্তহীন জ্ঞানসাগরের বালুকাবেলায় নিছক এক বালকের মতো কিছু ক্ষুদ্র নুড়িপাথর সংগ্রহ করেছেন মাত্র। নিউটনের এই উক্তিগুলি কি সত্যিই তাঁর বিনয়ের বহিঃপ্রকাশ, না কি কিছু বক্রোক্তি তা নিয়ে এখন বিজ্ঞানের ইতিহাসবিদেরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। নিউটনের সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের কথা মনে রাখলে, বিশেষ করে পরবর্তী জীবনে তিনি যেভাবে তাঁর সমসাময়িক গণিতবিদ এবং বিজ্ঞান চর্চাকারীদের সঙ্গে তিক্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে বিনয়ের বিষয়টা ঠিক যেন খাপ খায় না বলে এখন তাঁদের অনেকেরই ধারণা। এখন অবশ্য এই প্রসঙ্গটিতে যাব না।
নিউটন তাঁর পূর্বসূরীদের পরিচয় উল্লেখ করেননি। তবে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না যে এই তালিকায় গ্যালিলিওর সঙ্গে অবশ্যই আছেন কোপারনিকাস ও কেপলার। এর সঙ্গে বা আছেন অ্যারিস্টটল, টলেমী, আর্কেমিডিস বা পাথাগোরাসের মতো সুপ্রাচীন গ্রীক গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ তথা বিজ্ঞান বিষয়ক পন্ডিতেরা। প্রশ্ন হচ্ছে নিউটনের এই তালিকায় কি টরিসেল্লি ছিলেন? এই ইতালীয় বিজ্ঞানী যাঁর বিশেষ অবদানের কথা বিদ্যালয় স্তরের সব ছাত্র-ছাত্রীকে পড়তে হয় এই তালিকায় খুব সম্ভবত ছিলেন না। অথচ ইভানগেলিস্তা টরিসেল্লিকে খুব বড় মাপের পরীক্ষাবিদ বিজ্ঞানী বলতেই হবে কারণ, পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে বিজ্ঞানের নীতি প্রতিষ্ঠা করার কাজটির সূচনা যাদের হাতে হয়েছিল তিনি তাদের অন্যতম। আর তিনি অবশ্যই নিউটনের অগ্রজ বিজ্ঞানী। তাঁ জন্ম নিউটনের জন্মের পঁয়ত্রিশ বছর আগে ১৬০৭ সালে আর নিউটন যখন মাত্র চার বছরের শিশু তখন টরিসেল্লির জীবনাবসান ঘটে। ১৯৪৬ সালে মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন গ্যালিলিওর একেবারে শেষ জীবনের এই স্বল্পকালীন ছাত্র।
বাতাসকে চোখে দেখা যায় না তার অস্তিত্ব সর্বদা অনুভব করা যাচ্ছে। আর তাই সেটি এক অতি পরিচিত নাম। বাতাসের ধর্ম সম্পর্কে সেই সপ্তদশ শতকেও কিছু ধ্যানধারণা এবং চিন্তাভাবনা ছিল। বাতাসের খুব চেনা অথচ ঠিক যে চেনা নয় এই অবস্থাটা বাতাস সম্পর্কে অনেক দার্শনিক চিন্তাধারার সূচনা করেছিল। টরিসেল্লি প্রথম একেবারে পরীক্ষা করে দেখেয়ে দিলেন যে বাতাস সত্যিই চাপ প্রয়োগ করে। আর বায়ুমন্ডলে যে বাতাস উপস্থিত রয়েছে তা যে চাপ প্রয়োগে সক্ষম তার পরিমাণ অনেকখানি। বায়ু নিষ্কাশক পাম্প তখন সদ্য তৈরি হয়েছে। এই পাম্পের সাহায্যে কোনও বদ্ধ পাত্র থেকে কিছুটা বাতাস বার করে নিয়ে সেখানে আংশিক বায়ুশূণ্য অবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছিল। টরিসেল্লি এমন একটি পাত্র নিলেন যার দুটি অর্ধাংশ আলাদা করে খুলে নেওয়া যায়। এরকম পাত্রকে আংশিক বায়ুশূণ্য করে তার দুটি অংশকে আলাদা করার জন্য দু’দিকে বেশ কয়েকটি ঘোড়া লাগিয়ে অর্ধগোলক দুটি টান দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। বাইরের বায়ুর চাপে কিন্তু দুটি অংশ আটকে রইল তাদের বিচ্ছিন্ন করা গেল না। পরিকল্পিত পরীক্ষা প্রমাণ করে দিল যে বাতাসের চাপ আছে। পরবর্তী পর্যায়ে টরিসেল্লি একেবারে বায়ুর চাপ মেপে ফেললেন। লম্বা কাঁচনলের মধ্যে পারদ ভর্তি করে আরেক পারদপূর্ণ পাত্রের মধ্যে তাকে উপুড় করে দিলেন। বায়ুর চাপকে কাজে লাগিয়ে সেই পারদের স্তম্ভ দিব্যি দাঁড়িয়ে রইল। এবার বোঝা গেল যে বায়ুর কেবল চাপ নেই, সেই চাপ পরিমাপ করাও সম্ভব। অনেক বেশী ঘনত্ব বিশিষ্ট ভারী পারদের মাত্র প্রায় তিরিশ ইঞ্চি লম্বা কলাম বা স্তম্ভ যে তাপ প্রয়োগ করে তা যে বায়ুমন্ডলের চাপের সমান টরিসেল্লি তা হাতে কলমে দেখিয়েছিলেন। কারণ, বাতাসের চাপই তো ওই পারদ স্তম্ভকে খাড়া করে রেখেছে। উল্টে দেওয়া পারদ স্তম্ভ নেমে এসে কাঁচনলের ওপরের দিকে যে বায়ুশূণ্য অঞ্চল সৃষ্টি করল তার নাম আজ ও টরিসেল্লির নামে পরিচিত। তার এই কাজের ওপর ভিত্তি করেই বায়ুচাপ পরিমাপের জন্য তৈরি করা হয়েছে পারদ ব্যারোমিটার।
প্রমাণ বায়ুমন্ডলীয় চাপ প্রায় ৭৬ সেন্টিমিটার বা ৭৬০ মিলিমিটার পারদ স্তম্ভের চাপের সমান। মিলিলিটার এককে পারদ স্তম্ভের এই চাপের অন্য নাম টরিসেল্লির নামানুসারে, টর। অর্থাৎ এক বায়ুমন্ডলীয় চাপ পরিমাপের কাজে তার অবদানের জন্য বিজ্ঞানের ছাত্ররা সকলেই তাঁকে মনে রেখেছে। এমনকি যে সব ছাত্র মাধ্যমিক স্তরের পর বিজ্ঞান পড়েননি সম্ভবত মনে রেখেছেন তারাও।