কেন্দ্রে কংগ্রেস বা বিজেপি যেই ক্ষমতায় থাকুক, তসলিমার ভাগ্য বদলায় না

মানস রায়

0
Taslima Nasrin

 

ঔরঙ্গজেবের ভক্তরা আরেকবার প্রমাণ করলেন মুঘল সাম্রাজ্য এখন‍ও সদর্পে বেঁচে আছে ভারতের বিভিন্ন কোণে।
আমি গত ২৯শে জুলাই, ২০১৭ ঔরঙ্গবাদ বিমান বন্দরে মুঘল সৈনিকদের আক্রমণ ও বিজয়ের কথা বলছি। ইসলামী আক্রমণকারীদের সামনে নতজানু বিজেপি-শিবসেনা সরকারের পুলিশ বাহিনী। কোনও প্রতিরোধের কথা চিন্তা না করে আত্মসমর্পণ করল শিবাজীর নামে শপথ নেওয়া সরকারের প্রশাসন। ইসলামী ফতোয়া ও আক্রমণের সামনে মাথা না নত করা বীরাঙ্গনা তসলিমা নাসরিন দেখলেন অজন্তা ও ইলোরা নামক বৌদ্ধ ও হিন্দু সংস্কৃতির অনুপম চিত্রকলা ও স্থাপত্য দেখার অধিকার খর্ব করার স্পর্ধা রাখে ইসলামী গুন্ডারা। বিজেপি-শিবসেনা সরকারের প্রশাসনের ভিতরে বিরাজমান এই ঔরঙ্গজেব ভক্তদের চর। তাই তসলিমা নাসরিন কোন ফ্লাইটে আসছেন, কোন হোটেলে থাকছেন পুলিশকে দেওয়া এই সব তথ্য অনায়াসে পৌঁছে যায় জেহাদিদের হাতে। শুধু বিমান বন্দর নয়, হোটেলও অবরোধ করে মুঘল সৈনিকেরা।
পশ্চিমবঙ্গ অবশ্যই মুঘল সাম্রাজের অংশ বেশ কিছুদিন ধরে। ঔরঙ্গজেবের আমলে যেমন হত অনেকটা সেই ঢঙে হিন্দুদের দেওয়া(জিজিয়া) করের পয়সায় ইমামরা মাস মাইনে পেয়ে দিনে পাঁচ বার লাউড স্পিকারে মূর্তি পূজারীদের সর্বনাশ কামনা করেন। দূর্গা পূজার আবাহন বিসর্জনের দিন তারিখ ও শোভাযাত্রার পথ ঠিক করে দেন ইমাম মোয়াজ্জিনরা। অন্ধকার প্যান্ডালে নির্জনে দেবী সপরিবারে অপেক্ষা করেন কখন ইমামরা অনুমতি দেবেন স্বামী গৃহে প্রত্যাবর্তনের। ঔরঙ্গজেবের অনুগামীরা তাদের প্রিয় বাদশার অনুকরণে প্রকট হন দেগঙ্গা বা বাদুরিয়ায় মূর্তি ও মন্দির ভাঙ্গার ‘নেক’ কার্যকলাপে।
‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির’ এই ঐতিহ্য পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সালে চালু হয় জিজিয়া করের অর্থে মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে। সম্ভবত ভারতে প্রথম মাদ্রাসা মন্ত্রীর পদ তৈরী করেন ‘সেকুলার’ কমরেড জ্যোতি বসু। পশ্চিমবাংলার মুঘলায়ন বা বাংলাদেশীকরণ এখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভারত নামক ভূখন্ডের সঙ্গে আর্থিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক এখনও অক্ষুন্ন থাকার জন্য সম্পূর্ণতা পেতে কিছু সময় আরও লাগবে।
কিন্তু হিন্দু বীর শ্রেষ্ঠ ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের রাজ্যও আজ সেই পথে? আরব সাগরের বুকে কোটি কোটি টাকা খরচা করে পর্বত সমান শিবাজী মূর্তি স্থাপনের ডঙ্কা বাজিয়ে আড়াল করা যাচ্ছে না শিবাজীর নামে শপথ নেওয়া বিজেপি-শিবসেনা সরকারের দুর্বলতা।
‘অ্যাওয়ার্ড-ওয়াপসী’ বা ‘নট ইন মাই নেম’ গ্যাংএর কথা বাদ দিলাম, প্রশাসনের এত বড় ব্যর্থতা (এই লেখার সময় পর্যন্ত) সম্পর্কে শিবসেনা বা বিজেপির কোন‍ও নেতা মুখ খোলেননি।
বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর নৃশংস অত্যাচারের কাহিনী সারা বিশ্বের সামনে প্রকাশ করেন তসলিমা তার ‘লজ্জা’ উপন্যাসের মাধ্যমে। অন্তত পঁচিশটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে এই উপন্যাস। তবুও হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী কোনও ধার্মিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠন এগিয়ে আসেনি তসলিমার সহায়তায়। কারণ, হয়ত একই সঙ্গে তসলিমা একজন নাস্তিক, নারীবাদী এবং কুসংস্কার বিরোধী ব্যক্তিত্ব।
ইসলামী মৌলবাদীরা ও তাদের দোসর বামপন্থীরা তসলিমার শত্রুতা করবে এটা স্বাভাবিক। তাই মমতা, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সমস্ত কার্যকলাপের নিন্দা করলেও মধ্যরাত্রে একবস্ত্রে তসলিমা বিতরণের নিন্দা করেননি। মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কের ওপর নির্ভরশীল কংগ্রেসও কোনওদিন তসলিমাকে খোলাখুলি সমর্থন করেনি। তবে ব্যক্তিগত স্তরে, গোপনে বেসরকারিভাবে প্রণব মুখার্জি-সহ অনেক কংগ্রেসী নেতা তসলিমাকে সাহায্য করেছেন।

protest against taslima nasreen

তসলিমার সঙ্গে বোধ হয় সবচাইতে অসহয়তা ও দ্বিচারিতা করছে বিজেপি।
১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রাণ হাতে নিয়ে ভারতে পালিয়ে আসেন তসলিমা। তেইশ বছর হয়ে গেল। এরমধ্যে ১৯৯৮ থেকে ২০০৩, পাঁচ বছর ছিল অটলবিহারীর সরকার। অটলজী নিজে কবি ও সাহিত্যিক হলেও তাঁর সরকার তসলিমাকে পার্মানেন্ট ভিসা বা সরকারি সহায়তা দেওয়ার ব্যাপারে কোনও আগ্রহ দেখায়নি, বরং তোষণের রাজনীতির ধারা বেয়ে লাহোর বাস যাত্রা করে অটলজী পুরস্কার পেয়েছিলেন কার্গিল।
২০০৪থেকে ২০১৪, দশবছরের ‘সেকুলার’ এনডিএ-র শাসনে তসলিমার পাওয়া মানে বছর বছর ভিসা রিনিউ হওয়া এই পর্যন্ত। উনিও বোধ হয় এর বেশি কিছু আশা করেননি মুসলিম ভোট ব্যাঙ্কের ওপর নির্ভরশীল সরকারের কাছ থেকে।
চাকা ঘুরল ২০১৪ তে। মোদীর নেতৃত্বে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লিতে বিজেপি। তসলিমা দেখা করলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং-এর সাথে। জানালেন বছর বছর ভিসা নবীকরণের ঝামেলা। কলকাতায় বন্ধুদের কাছে রেখে আসা বইপত্র দিল্লিতে আনার ভরসা পাচ্ছেন না, যদি সামনের বছর ভিসা রিনিউ না হয় তাহলে সেগুলো আবার কোথায় পাঠাবেন। রাজনাথ সিং আশ্বাস দিলেন, কোন‍ও চিন্তা করবেন না। নিয়ে আসুন আপনার বইপত্র। আজীবন না হলেও দশ বছরের ভিসা তো দেবই। সেই আশ্বাস আজও কার্যকরী হয়নি। তসলিমা প্রতি বছর বিদেশ দফতরে হাজিরা দিচ্ছেন ভিসা নবীকরণের জন্য। অথচ ‘সেকুলারিজম’ নামক ব্যাধির প্রভাবে এই রাজনাথ এক কথায় ভারতের নাগরিকত্ব প্রদান করছেন আদনান সামি নামক বলিউডের এক পাকিস্তানি গায়ককে। বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ পাকিস্তানিদের দু’হাতে মেডিক্যাল ভিসা দিয়ে সেকুলারিত্ব অর্জন করতে ব্যস্ত অথচ তসলিমার স্থায়ী ভিসার ব্যাপারে নির্বিকার। শোনা কথা, পশ্চিমবাংলার মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব তসলিমাকে তাড়ানোর পর তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তসলিমাকে গুজরাতে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর এখনও তসলিমার জন্য সময় ব্যয় করার সুযোগ হয়ে ওঠেনি! এখানে উল্লেখযোগ্য যে চীনের বন্ধুত্ব ও রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করে জওহরলাল নেহেরু তিব্বতী ধর্মগুরু দলাই লামাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছিলেন। ইসলামী ও সেকুলারদের হুমকি অগ্রাহ্য করে তসলিমাকে স্থায়ী ভিসা দেওয়ার সাহস নরেন্দ্র মোদী দেখাতে পারবেন কি?
তসলিমা নিজে এবং তার বন্ধুরা বিজেপির সাংসদ, নেতা এবং মন্ত্রীদের কাছে গত এক বছর ধরে অনুরোধ করেছেন দিল্লিতে সরকারি উদ্যোগে একটি নিরাপদ বাসস্থানের জন্য। এখনও কেউ কান দেয়নি। অথচ দিল্লিতে তসলিমার জন্য স্বল্প ভাড়ায় একটি সরকারি বাসস্থানের ব্যবস্থা করা শাসক দলের পক্ষে অতি সহজ একটি কাজ।
ফিরে আসি শিবাজীর মহারাষ্ট্রে। ম্যনেজমেন্টের কথায় বলে, every challenge brings an opportunity. বিজেপিও শিব সৈনিকরা এভাবে ভাবুন। ঔরঙ্গজেব ভক্ত মুঘল সৈনিকদের মোকাবিলা করুন। ‘ঔরঙ্গাবাদ’ নামটাই পাল্টে দিন। কাশী মথুরার মন্দির ধ্বংসকারীর নামে ভারতে কেন শহর থাকবে? রাজ্য সরকার এটা করতে পারে। দিল্লির ‘ঔরঙ্গজেবরোড’ এখন ইতিহাস। লেনিনগ্রাদ, স্তালিনগ্রাদের নাম পাল্টে গেছে। আপনারাও পারবেন। মহারাষ্ট্র সরকার তসলিমাকে সরকারি অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ করে অজন্তা ইলোরা ভ্রমণ করান। দেখান, মহারাষ্ট্র মুঘল সাম্রাজ্যের অংশ নয়।