পশ্চিমবঙ্গ ও শ্যামাপ্রসাদ

পঙ্কজ কুমার রায়, অধ্যক্ষ, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজ

1
Syama Prasad Mookerjee

বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠে বর্ণিত ভারতমাতাই তাঁর আরাধ্য দেবতা। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বঙ্গমাতা (১৯০২), যা ভারতমাতায় (১৯০৫) রূপান্তরিত হয়।
১৯২৬ সালে পথের দাবী প্রকাশের আগে উপন্যাসের অপমৃত্যু ঘটেছিল। শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সেই পত্রিকায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নিয়মিত লেখা দিতেন। একদিন শ্যামাপ্রসাদ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে লেখার জন্য গেলে তিনি বলেন, ‘‘এই মুহূর্তে তাঁর হাতে কোনও লেখা পত্রিকায় দেওয়ার জন্য নেই।’’
যুবক শ্যামাপ্রসাদের শরৎবাবুর লেখার ঘরের পরিত্যক্ত বাক্সের ওপর চোখ পড়ে। তিনি দেখেন, একগুচ্ছ কাগজ মোড়ানো অবস্থায় পড়ে আছে। তিনি পড়ে বলেন, ‘‘এই লেখা আমার চলবে।’’ শরৎচন্দ্র হেঁয়ালি করে বলেছিলেন, ‘‘তোমার বাড়িতে জজ ব্যারিস্টার আছে, তোমরা এ লেখা ছাপাতে পারো, আমি পারি না।’’ একটি হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক উপন্যাসের জন্ম হল- সেই উপন্যাস শরৎচন্দ্রের বহু বিতর্কিত ‘পথের দাবী’।
ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী মাত্র ২৯ বছর বয়সে ১৯৩০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য নির্বাচিত হন। সেখানে তিনি শিক্ষাচিন্তার স্বাক্ষর রেখেছেন। মাত্র ৩২ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মনোনীত হন। ১১টি সমাবর্তন ভাষণের মধ্যে দিয়ে তাঁর সারস্বত সাধনার প্রকাশ প্রতিভাত হয়। তাঁর সভাপতিত্বে ১৯৩২ সালের ২৩ জুলাই সিন্ডিকেট মিটিংয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পদ অলঙ্কৃত করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু সেই সময় বঙ্গসমাজ সেই নিয়োগ নিয়ে সমালোচনা শুরু করে। রবীন্দ্রনাথ ব্যথিত হয়ে শ্যামাপ্রসাদকে চিঠি লেখেন। তার উত্তরে ২৪ জুলাই ১৯৩২, শ্যামাপ্রসাদ লেখেন,
শ্রীচরণকমলেষু,
৭৭, আশুতোষ মুখার্জী রোড, কলকাতা
২৪ জুলাই, ১৯৩২
যে কাজের জন্য আপনার সাহায্য ভিক্ষা করেছি, সে কাজ যথার্থ দেশের মঙ্গলকারক, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকট হতে এইরূপ সংস্কারের দাবি আপনি বহুকাল করে এসেছেন। আজ যখন বিশ্ববিদ্যালয় আপনাকে বৃহৎ কাজে যোগ দেবার জন্য অনুরোধ করেছে, আপনি দ্বিধাশূণ্য মনে এই আহ্বান গ্রহণ করুন, এই আমার প্রার্থনা।
ইতি,
প্রণতঃ
শ্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
(দীনেশচন্দ্র সিংহের লেখা শ্যামাপ্রসাদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, শতবর্ষের আলোয় শ্যামাপ্রসাদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, শতবর্ষের আলোয় শ্যামাপ্রসাদ, পৃঃ ৪২)।
১৯৩০-এর ১২ নভেম্বর প্রথম গোলটেবিল বৈঠকে ভারতে নয়া সংবিধানের কথা ভাবা হল। ফলশ্রুতি হিসাবে গান্ধী-আরউইন চুক্তি। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আর.ম্যাকডোনাল্ড ঘোষণা করলেন, কেন্দ্রীয় স্তরে যুক্তরাষ্ট্রীয় ধাঁচে আইন সভা গঠিত হলে সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরে প্রস্তুত। দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকের দ্বিতীয় অধিবেশনে গান্ধী একমাত্র মুসলিম ছাড়া অন্য কারও জন্য পৃথক নির্বাচনমন্ডলীর বিরোধিতা করেছিলেন এবং হরিজনদের জন্য আসন সংরক্ষনের বিষয়েও যথেষ্ট কড়া মনোভাব নিয়েছিলেন। দেশে ফেরার পর সাম্প্রদায়িক আসন সংরক্ষণের তিক্ত দিকটির একটি সর্বজন গ্রাহ্য উত্তর খোঁজা জরুরি হয়ে পড়ল।
১৯৩৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সমাবর্তনে ভাষণ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। তথাকথিত এলিট সোসাইটি সেই সমাবর্তন অনুষ্ঠান বয়কট করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সভায় বাংলায় ভাষণ দেন এবং ভাষণের ইংরেজি তর্জমা ডঃ মুখার্জীর অনুরোধে সমাবর্তনে বিলির জন্য রবীন্দ্রনাথ করেছেন। সেই সভায় কবিকন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়-
‘দুর করো চিত্তের দাসত্ব বন্ধন, ভাগ্যের নিয়ত অক্ষমতা, দূর করো মূঢতায় অযোগ্যের পদে, মানব-মর্যাদা বিসর্জন, চূর্ণ করো যুগে যুগে স্তূপীকৃত লজ্জারাশি, নিষ্ঠুর আঘাত, নিঃসঙ্কোচে, মস্তক তুলিতে দাও, অনন্ত আকাশে, উদাত্ত আলোকে, মুক্তির বাতাসে’।
(কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারভাঙা হলের দ্বারপ্রান্তে ফলক আকারে যা শোভিত।)
১৯৩২ সালের সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন বাংলার পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ করে তোলে। তিনি শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে রাজনীতিতে না আসতে চাইলেও শিক্ষাব্যবস্থার উপর সাম্প্রদায়িক উদ্যত ছোবল তাঁকে ব্যথিত করে। ১৯৩৬ সালের ১৫ জুলাই টাউন হলে Calcutta Municipal Bill ও Secondary Education Bill-এর প্রতিবাদ সভায় নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেন। ডঃ মুখার্জী Leaves from a Diary-তে লিখেছেন, ‘Then Came two…The Calcutta Municipal Bill and the Secondary Education Bill. It was the letter which forced me out of my academic restriction where education was made the play thing of party and communal politics, I felt it my duty to rouse public opinion.’
(Leaves from a diary- Dr. Syama Prasad Mookerjee, Oxford, 2000, P-28)
১৯৩৫ সালের সংবিধান ও পরবর্তী নির্বাচনে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য নষ্ট করতে ব্রিটিশরা সচেষ্ট হয়। তৃতীয় গোলটেবিল বৈঠকে ভারতের সংবিধানের খসড়া তৈরি করা হয়। ১৯৩২ সালের শরৎকালে সেই বৈঠকে কংগ্রেস অনুপস্থিত ছিল। হিন্দুদের ৭০ শতাংশ ভোট থাকলেও আসন ছিল ৫৫ শতাংশ। দেশীয় রাজাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় আইনসভায় এক তৃতীয়াংশ ও প্রাদেশিক আইনসভায় দুই পঞ্চমাংশ।
১৯৩৭ নির্বাচনে হিন্দু সমর্থিত কংগ্রেস (নেতা শরৎচন্দ্র বসু), মুসলিম লিগ (নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন) ও কৃষক প্রজা পার্টি (নেতা ফজলুল হক) কেউই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। কৃষক প্রজা পার্টিকে সমর্থন দিতে কংগ্রেস অস্বীকার করলে কৃষক প্রজা পার্টির সঙ্গে মুসলিম লিগের সরকার গঠিত হয়।
১৯৩৯ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে হিন্দু মহাসভার নেতা বিনায়ক দামোদর সাভারকার কলকাতায় আসেন এবং ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী বীর সাভারকারের অনুপ্রেরণায় হিন্দু মহাসভার কার্যকরী সভাপতি ও বাংলার সভাপতি নির্বাচিত হন। তৎকালীন সাম্প্রদায়িকতার দোষে দুষ্ট ও পুষ্ট রাজনৈতিক আবর্তেই যে তাঁকে রাজনীতিতে টেনে এনেছিলেন, তা তিনি নিজের ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেছেন, ‘1939 continued to be a year of Hindu oppression at the hands of communal ministry Fazlul Haq at its head, Legislative and administrative measures were either adopted or advocated which aimed at a deliberate curtailment of Hindu rights. So long as such activities related to departments other than education, I have my protests recorded in the Assembly but did not find it possible to mobilize public opinion outside.’’
(Leaves from a Diary- Dr. Syama Prasad Mookerjee, Oxford, 2000, P-27)।
১৯৪০ সালের ২৪ মার্চ মুসলিম লিগ পাকিস্তান প্রস্তাব পাস করে। লিগের ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ প্রতিহত করতে হিন্দু মহাসভা, কৃষান প্রজা পার্টির সঙ্গে দ্বিতীয় প্রগতিশীল শ্যামা-হক মন্ত্রিসভায় যোগদান করে। জিন্না’র সচিব এম আর বেগ স্মৃতি কথায় লেখেন, ১৯৪০-এর মাঝামাঝি জিন্না লাহৌরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। যাওয়ার আগের দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল। কিন্তু কথাবার্তায়, হাবেভাবে ঘুণাক্ষরেও বুঝতে দেননি, এবারেই উনি পাকিস্তানের প্রস্তাব আনতে যাচ্ছেন। (জিন্না ভারত দেশভাগ স্বাধীনতা-যশোবন্ত সিংহ, আনন্দ)।
এই যুগ সন্ধিক্ষণে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শ্যামাপ্রসাদের প্রবেশ ঘটে। ১৯৪১ সালের নভেম্বরে হক সাহেব মুসলিম লিগ ছেড়ে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বাঁধতে অগ্রসর হন এবং ঘোষণা করেন সঙ্গে থাকবেন হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ। ডঃ মুখার্জী অবিভক্ত বাংলার অর্থমন্ত্রী রূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং ১১ ডিসেম্বর, ১৯৪১ থেকে ২০ নভেম্বর, ১৯৪২ পর্যন্ত কাজ করে যান। এই সময় কাজী নজরুল ইসলাম আর্থিক অনটনের কারণে ফজলুল হক সাহেবের কাছ থেকে সাড়া না পেয়ে ডঃ মুখার্জীর শরণাপন্ন হন এবং সহযোগিতা পান। ডঃ মুখার্জী’র পৈত্রিক বাড়ি মধুপুরে সস্ত্রীক থাকার ব্যবস্থা করেছেন স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য। কাজী নজরুল ইসলাম মধুপুর থেকে ১৭ জুলাই, ১৯৪২-এ ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীকে একটা চিঠি লেখেন।
শ্রী চরণেষু,
…এই coalition ministry-র একমাত্র আপনাকে আমি অন্তর থেকে শ্রদ্ধা করি ও ভালবাসি, আর কাউকে নয়। আমি জানি আমরাই এই ভারতবর্ষকে পূর্ণ স্বাধীন করব। সেদিন বাঙালীর আপনাকে ও সুভাষবাবুকেই সকলের আগে মনে পড়বে-আপনারাই হবেন এদেশের পতাকার নায়ক।
-কাজী নজরুল ইসলাম
(চিঠির প্রতিলিপি উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরি ও মৃত্যু প্রসঙ্গ, মিত্র ও ঘোষ পাবলিসার্স, ১৯৯১, পৃঃ IX ও পৃঃ X)
ড: শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর পিতা স্যার আশুতোষ মুখার্জী সুভাষ বসুকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ও সুভাষ বসুর মধ্যে সখ্যতা ছিল সুবিদিত। সেই সুবাদে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী সুভাষ বসুকে কংগ্রেসের বিকল্প পৃথক দল গঠনের আহ্বান জানান। এই প্রসঙ্গে তিনি সুভাষ বসুর প্রতিক্রিয়া দূরদৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতার মতো লিপিবদ্ধ করেন, ‘Subhas once warned me in a friendly spirit, adding significantly, that, if we proceeded to create rival political today in Bengal he would see to it (by force if need be) that it was broken before it was really born.’
(Leaves from a Diary- Dr. Syama Prasad Mookerjee, Oxford, 2000, p- 32)
যদিও শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ও সুভাষ বসু দু’জনেই নেহেরুর ষড়যন্ত্রের শিকার। ডঃ মুখার্জীকে ২৩ জুন ১৯৫৩ কাশ্মীরে শেখ আবদুল্লার কারাগারে ‘Medical Murder’-এর শিকার হতে হয়। আর অন্যদিকে তাইহকু বিমান দুর্ঘটনায় নেতাজির মৃত্যু হয়েছে বলে বিশ্বজোড়া প্রচার করে দেওয়া হয়। দুটি ক্ষেত্রেই সত্য আজও অনুদঘাটিত।
১৯৪২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলনের দমন নীতির প্রতিবাদে (১৬ নভেম্বর, ১৯৪২) রাজ্যপাল জন হার্বার্ট ও মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হকের কাছে পদত্যাগ পত্র পেশ করেন। মুসলিমলিগ নেতা খাজা নাজিমুদ্দিন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে কার্যভার গ্রহণ করেন ২৪ এপ্রিল, ১৯৪৩। ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভা বাতিলের প্রতিবাদ এবং গভর্নর জন হার্বাটের আচরণের নিন্দায় কলকাতার টাউন হলের সভায় এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেন। ১৯৪৩ সালে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় নাজিমুদ্দিন মন্ত্রীসভার অসামরিক সরবরাহ মন্ত্রী সোহরাওয়ার্দির নগ্ন ভূমিকা উঠে আসে। খাদ্যের ঘাটতির বদলে উদ্বৃত্তের কথা প্রকাশ করেন। এরপর আসে কলকাতা দাঙ্গা ও নোয়াখালি দাঙ্গা। কলকাতার দাঙ্গা হয়েছিল ১৬ই আগস্ট, ১৯৪৬ জিন্নার ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম’ (Direct Action) নামক নরমেধ যজ্ঞের ফলে।
১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলার বিধানসভায় (আইনসভায়) হিন্দু অধ্যুষিত অঞ্চল নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ গঠনের প্রস্তাব পাকা হয়। ডঃ মুখার্জী সেদিন প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘If 25 percent Muslims could not agree to live in India, how could 44 percent Hindu live in Bengal under 54 percent Muslims.
(The Indian Express 29th August)। সুরাবদ্দীরা সেদিন পৃথক বাংলা চেয়েছিলেন। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কংগ্রেস নেতা শরৎ বসু ও মুসলিম লিগ নেতা আবুল হাফিস ১৬ জন মুসলিম সদস্য ও ১৪ জন হিন্দু সদস্য নিয়ে সার্বভৌম অবিভক্ত বাংলা গঠনের পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনা না হলে বাংলার হিন্দুদের শেষ আশ্রয় চলে যেত। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাঙালী হিন্দুর অবস্থা ইহুদিদের মতো ১০০০ বছর যাযাবর হিসাবে কাটাতে হত। বর্তমান পূর্ববঙ্গে ১২ শতাংশ সংখ্যালঘু হিন্দু আর পশ্চিমবঙ্গে ৩৬ শতাংশ সংখ্যালঘু মুসলিম। পরিসংখ্যান বলবে ডঃ মুখার্জীর রাজনৈতিক বিচক্ষণতার ইতিবৃত্ত। এ যেন চলিয়াছে অমোঘ নিয়তির টানে দুনির্বার আকর্ষণে। ১৯৪৩ সালে বম্বেতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম সম্মেলনে পূর্ণচন্দ্র যোশীর নেতৃত্বে ভারত বিভাগ ও পাকিস্তানের দাবির সমর্থনে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। যে সম্মেলনের তোরণে একদিকে জিন্না ও অন্য দিকে নেহেরুর ছবি টাঙানো হয়।
(সুনীল কুমার ঘোষ, লিবারেশনের প্রথম সম্পাদক দ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকারে একথা বলেন, ২ জানুয়ারি, ১৯৯৩)
কংগ্রেসের ভারতভাগের প্রস্তাব পাসের বর্ণনা মৌলনা আবুল কালাম আজাদের ‘ভারত স্বাধীন হল’ বই-এর ‘একটি স্বপ্নের সমাধি’ অধ্যায় চমৎকার বর্ণনা করা হয়েছে।
‘ভারত স্বাধীন হল’ পুস্তকের ‘একটি স্বপ্নের সমাধি’ অধ্যায় লেখা হল। ১৯৪৭-এর ১৪ জুন এআইসিসি-র অধিবেশন বসে। আমি এআইসিসি-র ঢের ঢের মিটিং দেখেছি। কিন্তু এমন উদ্ভট একটি বৈঠকে থাকার দুর্ভাগ্য আমার কমই হয়েছে। যে কংগ্রেস বারবার ভারতে ঐক্য আর স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করে এসেছে, এখন সেই কিনা দেশকে ভাগ করার সরকারি প্রস্তাব নিয়ে মাথা ঘামাতে বসেছে।’
(ভারত স্বাধীন হল, একটি স্বপ্নের সমাধি অধ্যায়, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, অনুবাদ- সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ওরিয়েন্টাল লংম্যান পৃঃ১৯৬) প্রস্তাবটি ভোটে গেলে পক্ষে ২৯ জন, বিপক্ষে ১৫ জন ভোট দেন। এমনকি গান্ধীজির আবেদন সত্ত্বেও এর চেয়ে বেশি সদস্যকে দিয়ে পক্ষে ভোট দেওয়ানো যায়নি।
(ঐ গ্রন্থে, পৃঃ ১৯৮) মনে রাখতে হবে ‘একটি স্বপ্নের সমাধি অধ্যায়’ ৫০ বছর পর জনসমক্ষে আনা হয়। যাতে স্বাধীনতা সত্যি বা বলা যায় স্বাধীনতা লাভের থেকে গদি লাভ বড় প্রাধান্য পেয়েছিল। মৌলানা আবুল কালাম আজাদের কথাতে বলি, ‘আমরা আজই স্বাধীনতা নগদ হাতে পেতে চাই, তাহলে ভারত বিভাগের দাবির কাছে মাথা নোয়াতে হবে। (ঐ গ্রন্থে, পৃঃ ১৯৭)
দেশ স্বাধীন হল দেশ ভাগের মধ্যে দিয়ে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট নেহেরুর মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জী শিল্পমন্ত্রী রূপে শপথ গ্রহণ করেন শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে নয়। দেশ স্বাধীনের পর হিন্দু মহাসভাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে আত্মনিয়োগের পরামর্শ দেন তিনি। স্বাধীনতার পর গান্ধীজি যেমন বলেছিলেন, ‘‘Let  Congress be dissolved’’। ভারতের শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন শিল্প উন্নয়ন নিগম, প্রথম শিল্পনীতি প্রণয়ন, চিত্তরঞ্জন লোকমটিভ স্থাপন, সিন্ধ্রি সার কারখানা-সহ বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন শ্যামাপ্রসাদ। খড়গপুরে ভারতের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স স্থাপনা, কলকাতার প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সোশাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট স্থাপনার ভাবনা তাঁরই মস্তিষ্ক প্রসূত।
The first Cabinet of India
স্বাধীন ভারতের প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্যরা।
১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের ওপর অত্যাচার বেড়ে চলে। হত্যা, লুন্ঠন, নারীর সম্ভ্রমহানি নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। এর প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল, ১৯৫০ নেহেরু মন্ত্রিসভার মন্ত্রী হয়েও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা (পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা) ও নেহেরু-লিয়াকত চুক্তির প্রতিবাদে লোকসভায় প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন ডঃ মুখার্জী। অবশেষে নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। ১৯৫০ সালে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মৃত্যু হয়। কংগ্রেসের মধ্যে জাতীয়তাবাদী শক্তির ভর কেন্দ্রে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়। ১৯৫১ সালের অক্টোবরে অনেক চিন্তন ও মন্থন শেষে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গুরুজী গোলওয়ালকারের সঙ্গে পরামর্শ ক্রমে নতুন রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫২ সালের মে মাসে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। ভরতীয় জনসংঘ প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তিনটি আসন লাভ করে।
ডঃ মুখার্জী লোকসভায় ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নামে বিরোধী দলের প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্ব দান করেন। লোকসভায় বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নিজেকে উদাহরণ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন।
জনসংঘ ঐ সময় বাংলা প্রদেশে ৮টি আসন ও রাজস্থানে ৮টি আসন লাভ করে। রাজস্থানে জমিদার প্রথা বিলোপ আইনের প্রশ্নে বিধায়করা দ্বিধাবিভক্ত ছিল। ডঃ মুখার্জী রাজস্থান পরিষদীয় দলের জরুরি বৈঠক ডেকে নির্বাচনী ইস্তেহারের প্রতিশ্রুতি পালনের দায়বদ্ধতার কথা বলেন। ওই সভায় আটজন বিধায়কের মধ্যে মাত্র দু’জন ভৈরব সিং শেখা‍ওয়াত ও জগৎ সিং জালান উপস্থিত ছিলেন। ডঃ মুখার্জী তৎক্ষনাৎ বাকি ছ’জন বিধায়ককে বহিষ্কার করেন। রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অঙ্গীকার করে কর্মে ও কথায় সত্য আত্মীয়তা অর্জন করে মাটির কাছাকাছি নেমে আসেন।
কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা চালু রাখলে অদূর ভবিষ্যতে সমস্যা বাড়তে পারে তা তিনি বারবার লোকসভার ভিতরে ও বাইরে ব্যক্ত করেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য সংবিধানের ৩৭০ ধারায় লেখা হয়। ‘Temporary, Transitional and Special Provision of Article 370’। সংবিধান প্রণেতা সাময়িক, পরিবর্তনমুখী ও বিশেষ কথাগুলির মধ্যে দিয়ে দূরদৃষ্টি প্রতিভাত হয়। সংবিধান বিশেষজ্ঞ দুর্গাদাস বসু কাশ্মীর প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘‘The State of Jammu and Kashmir holds a peculiar position under the constitution of India.’’
ভারতের অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে সংবিধানের বিশেষ অনুচ্ছেদ ৩৭০ ধারা বিলোপ ও পারমিটরাজ বাতিলের দাবিতে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী কাশ্মীর অভিযান করেন। ১৯৫৩ সালের ১১ই মে পাঞ্জাবের উধমপুরে শেষ সভা করে কাশ্মীরে প্রবেশের পথে গ্রেফতারি বরণ করেন। বন্দি অবস্থায় শেখ আব্দুল্লার কারাগারে ২৩শে জুন ১৯৫৩ সালে ডঃ মুখার্জীকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়। ডঃ মুখার্জীর সেবায় নিয়োজিত নার্স যথার্থই বলেছিলেন, ‘‘One lion has been killed by Abdullah.’’। ডঃ মুখার্জী স্বাধীন ভারতে বলিদানের মধ্যে দিয়ে ভারতের অখন্ডতার পক্ষে সওয়াল করে গেছেন।
ডঃ মুখার্জীর মরদেহ নিয়ে কলকাতার মিছিলে মানুষের ঢল নামে। শিয়রে অটলবিহারী বাজপেয়ী। ডঃ মুখার্জীর সুযোগ্য শিষ্য ও সচিব। কলকাতার সঙ্গে সারা ভারতবর্ষের মানুষ সেদিন নেহেরুর চক্রান্তের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। ধিক্কারে ফেটে পড়েছিল সারা দেশ। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী ও শ্যামাপ্রসাদের মা যোগমায়াদেবী, মুখ্যমন্ত্রী ও চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায় পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তোলেন। রাজনীতির অঙ্গনে এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের জীবন অকালে কেড়ে নেওয়া হল, অন্যের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খার কাছে একনীতি পরায়ণ, আদর্শবান, উচ্চশিক্ষিত রাজনীতিবিদের বিদায় ঘটল স্বাধীন ভারতবর্ষের গণতন্ত্রের পরিসরের মধ্যেই। এক দেশ, এক বিধান, এক নিশানার প্রবক্তা নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করলেন। তিনি জীবিত থাকলে ভারতীয় রাজনীতি অন্যখাতে প্রবাহিত হত। লোকসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়বার সময় ডঃ মুখার্জীর মৃত্যুসংবাদ পান। ব্রিটেনের কাগজে ‘Hindu Leader Dead’ শিরোনাম লেখা হয়। পরবর্তীকালে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় এই অনন্য ব্যক্তিত্বের বহুমুখী প্রতিভা প্রসঙ্গে লেখেন, ‘‘He was a great Indian, great patriot, great educationist, great orator and a great human being.’’ (Dr. Syama Prasad Mookerjee- A contemporary study, NOIDA NEWS PVT.LTD, Delhi, 2000, P-286) ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী ভারতীয় রাজনীতিতে যে বহ্নিশিখা প্রজ্বলন করেছিলেন তার আলোকবর্তিকা আজও রাজনীতির জটিল আবর্তে সমানভাবে দেদীপ্যমান। আর এখানেই ভারত কেশরী ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর বলিদানের সার্থকতা। বলিদানের সময় ২০,০০০ টাকা ব্যক্তিগত দেনা আর বিমা কোম্পানির কাছ থেকে ২০,০০০ টাকা প্রাপ্তি জীবনের স্থিতিপত্র (Balance Sheet) মিলিয়ে হাতে কয়েকটি পেন উদ্বৃত্ত রেখে গিয়েছিলেন। আজকের অধিকাংশ রাজনীতিবিদ এই বহ্নিশিখার কাছে সত্যই ম্লান।
  • Debdas Mukherjee

    অনেক ইতিহাসের অজানা অধ্যায় আলোকিত হল। লেখককে ধন্যবাদ।