আমেরিকার কলেজ ক্যাম্পাসে নতুন সংযোজন, আন্দোলন কর নম্বর পাবে

মানস রায়, ক্যালিফোর্নিয়া

0
Carry the Weight
আমেরিকার কলেজ ক্যাম্পাসে ছাত্র-ছাত্রীদের 'Carry the Weight' বিক্ষোভ।

 

নেতাজি বলেছিলেন ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও- আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব’. আমেরিকার অনেক কলেজ ক্যাম্পাসে অধ্যাপকরা বলছেন, ”তোমরা আন্দোলন কর আমি তোমাদের নম্বর দেব।” ট্রাম্প নামক মত্ত হস্তীর কমলবনে প্রবেশ শুধু ওয়াশিংটন ডিসির পেশাদার রাজনীতিবিদদের (ডেমোক্রাট এবং রিপাবলিকান) মাথা খারাপ করে দেননি সারা দেশের ‘প্রগতিশীলরাও’ কি করবেন ভেবে উঠতে পারছেন না। সংবাদমাধ্যম পাগলের মতন রোজই কিছু নতুন আবিস্কার করছে কিন্তু ঠিক সুবিধা করে উঠতে পারছে না। এদিকে স্টক মার্কেট চাঙ্গা, এমনকি ট্রাম্প বিরোধী ফরাসী রাষ্ট্রপতি শেষমেষ বাস্তিল দিবসে ট্রাম্পকে নেমন্তন্ন করে রাজকীয় জাঁকজমকের সঙ্গে বরণ করেছেন। অনেকে ভেবেছিলেন এই তোষামোদে গলে গিয়ে প্যারিস (ক্লাইমেটচেন্জ) চুক্তিতে সই করে দেবেন ‘মুর্খ জোকার’ ট্রাম্প। চিড়ে ভেজেনি– ‘আরেকবার ভাবব’ জাতীয় গোলগোল উত্তর দিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন তিনি।
তবু হাল না ছেড়ে কন্ঠ ছাড়ার প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছেন লিবারেল বা প্রগতিশীলরা। সুতরাং লিবারেলদের বড় ঘাটি কলেজ ক্যাম্পাস পিছিয়ে থাকে কি করে! ধনতন্ত্রের অর্থে লালিত কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলির অধ্যাপকরা, বিশেষ করে লিবারেল আর্টস (এর মধ্যে বিজ্ঞান ছাড়া যা কিছু হাবিজাবি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে) ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষকরা সবাই আগমার্কা প্রগতিশীল। তা না হলে চাকরিই জুটবে না। সম্প্রতি পরিবেশ বিজ্ঞানের অনেক শিক্ষক এদের দলে জুটেছেন গ্রান্ট পাওয়া নিশ্চিত করতে।
এনারা ইন্টেলেকচুয়াল বলে কথা, নতুন কিছু করার ইচ্ছে সর্বদাই প্রবল। তাই অনেক কলেজেই ট্রাম্প জেতার পরপরই মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পরা ছাত্রদের ক্লাসে না এলেও পরীক্ষায় বসা আটকাননি তাঁরা। বরং মন-বিশেষজ্ঞদের ডেকে ছাত্রদের কাউন্সেলিং করিয়েছেন। ছাত্রদের মানসিক ভাবে চাঙ্গা করে ট্রাম্প বিরোধী আন্দোলন বজায় রাখার জন্য ‘ইনসেনটিভ’ বা পুরস্কারের ব্যবস্থা করছেন।
সম্প্রতি ডেমোক্রাট প্রধান ওয়াশিংটন রাজ্যের এভারগ্রীন কলেজের কথা ধরা যাক। এই কলেজের বায়োলজি প্রফেসর ব্রেট ওয়াইনস্টাইন কলেজের ‘Day Of Absence’ নামক এক অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেন। এই অনুষ্ঠানের দিন শ্বেতকায় সব ছাত্র শিক্ষককে কলেজের বাইরে থাকতে হয়। ‘প্রগতিশীল’ ছাত্ররা সেই শিক্ষককে ঘেরাও করে, অপমান করে, এমন কি বাথরুমেও যেতে দেয়নি। এভারগ্রিনের প্রভোস্ট কেনেথ তেবাতের কাছে ছাত্রদের নামে অভিযোগ করা হলে তিনি উল্টে ছাত্রদের কার্যকলাপের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, প্রতিবাদী ছাত্ররা তাদের সময় ও শক্তি (energy) সামাজিক ন্যায় ও পরিবর্তনের ব্যয় করেছে। তিনি অন্যান্য শিক্ষকদের এই ছাত্রদের উত্তরপত্র মূল্যায়নের সময় এক মহান কাজে তাদের এই সময় ও শক্তি (energy)ব্যয়ের কথা মনে রাখেন। এই প্রতিবাদী কার্যকলাপ শিক্ষারই অঙ্গ এবং মূল্যায়নে তার প্রতিফলন হওয়া জরুরি। সাদা বাংলায়, গুন্ডামির পুরস্কার অতিরিক্ত নম্বর।

student protest

এটি কোনও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার আগেই ওহায়ো রাজ্যের অবারলীন কলেজের কালো ছাত্ররা F গ্রেড(অর্থাথ ফেল) উঠিয়ে দেওয়ার জন্য আন্দোলন করেছে এবং আন্দোলনকারী ছাত্রদের ঘণ্টা প্রতি মজুরি (৮.২০ ডলার) দেওয়ার দাবি করেছে। ট্রাম্পের আগমনে এই জাতীয় আবদারের মাত্রা বেড়েছে মাত্র। একদা বাক স্বাধীনতার পীঠস্থান বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্রাম্প বা রিপাবলিকান সমর্থকদের সভা সেমিনার বন্ধ করা হয়েছে, পুলিশের সামনে কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে তথাকথিত ছাত্ররা সেমিনার হলে ভাঙচুর করেছে, আগুন লাগিয়েছে। পুলিশ কাউকে ধরেনি বা বাধা দেয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রগতিশীল’ প্রশাসন ঘটনার জন্য দায়ী করেছেন দক্ষিনপন্থী উস্কানিদাতাদের (বাদুরিয়া বসিরহাটে হিন্দু মন্দির ও সম্পত্তি ভাঙ্গার জন্য তৃণমূল যেমন হিন্দু উগ্রবাদীদের ওপর দোষ চাপিয়েছে)।
শ্লীলতাহানির প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল কর্তৃপক্ষ মেধাবী ছাত্রকে বছর ভর হেনস্থা করেছে, ক্যাম্পাসে প্রগতিশীলরা প্রমাণ ছাড়াই মিছিল মিটিং করে ছাত্রটির সামাজিক সম্মান নষ্ট করেছে এবং শেষমেষ আদালতের ধাক্কায় মার্কশিট (প্রথমস্থান অধিকারী) দিতে বাধ্য হয়েছে, প্রায় একই ঘটনা ঘটছে আমেরিকার ক্যাম্পাসেও।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এমাসালকুইজ তার সহপাঠী পলের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনে। কলেজ প্রশাসন তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায় না এবং ছেলেটিকে নির্দোষ ঘোষণা করে। ‘স্বাভাবিক’ভাবে এতে নির্দোষ পলের বিরুদ্ধে ক্যাম্পাসে মিছিল মিটিংএ ছেদ পরেনা। ঘটনা এখানে শেষ হয় না বরং নাটকীয় মোড় নেয় যখন মেয়েটি একটি তোষক কাঁধে নিয়ে ক্যাম্পাসে ঘোরা শুরু করে। এই তোষকের ওপরই নাকি সে ধর্ষিতা হয়েছিল। ব্যাপারটা জমে যায়– যেন অনেকটা খ্রিস্টানদের কাঁধে ক্রস বয়ে নিয়ে যিশুর কষ্টকে মনে করানোর মত। “Carry the Weight” নাম দিয়ে আর্ট প্রজেক্ট হয়ে যায় এই তোষক কাঁধে ঘোরাফেরা। নিউইয়র্ক টাইমস থেকে শুরু করে তাবর তাবর প্রগতিশীল পত্রিকায় এই প্রজেক্টের জয়গাথা ছাপা হয়। এমনকি এটিকে এমা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রজেক্ট হিসেবে দাখিল করে অধ্যপকদের কাছ থেকে উচ্চ প্রশংসা লাভ করে। কলেজের সমাবর্তনে ডিগ্রী নিতে এমা হাজির হয় তোষক কাঁধে।
সহ্যের ও সীমা থাকে। ক্যাম্পাসে তার চরিত্র হনন, তার বিরুদ্ধে পোস্টার এসব পর্যন্ত সহ্য করেছিল পল। কিন্তু একটি মিথ্যা অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে তৈরী এমার প্রজেক্ট কে গ্রহণ করে ডিগ্রী দেওয়ার প্রতিবাদ করে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে পল। মামলায় হারা নিশ্চিত বোধ করে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ নিজেদের ভুল স্বীকার করে ‘রফা’ করে। কি শর্তে ও কি ধরনের ক্ষতিপুরণে রফা হয়েছে তা কোনও পক্ষই খোলসা করেনি। যাদবপুরের মেধাবী ছাত্রটিকে তার উকিল ক্ষতিপূরণের মামলা করতে কেন উৎসাহিত করেননি জানি না।
ওবামা জমানায় এ’জাতীয় ঘটনার বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে এগিয়ে আসছেন অপ্রমাণিত অভিযোগে অপমানিত হওয়া ছাত্রদের অভিভাবকরা। নতুন কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিব বেষ্টি ডিভোস তাই সম্প্রতি ক্যাম্পাসে যৌন হেনস্থা সংক্রান্ত আলোচনায় যেমন অভিযোগকারী ছাত্রী ও তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তেমনি কথা বলেছেন  অভিযুক্ত ছাত্র ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গেও। ডেমোক্রাট ও নারীবাদীদের অনেকেই এটা ভালো চোখে দেখছেন না, এতে হেনস্থাকারীরা লাই পাবে বলে মনে করছেন।