কলকাতার পরিবেশ রক্ষা করতে পুকুরগুলিকে বাঁচান

মোহিত রায়

0
kolkata waterbody

যদি আমি সতী হই ধর্মে থাকে মন
দিঘি ভইরা উঠুক পানি দেখুক সর্বজন।
(পূর্ববঙ্গ গীতিকা)
কচ্চিদ্রাষ্টে তরাগানি
পূর্ণানি চ বৃহন্তি চ।
ভাগশো বিনিষ্টানি-
ন কৃষির্দেবমাতৃকা।
(মহাভারত/সভাপর্ব)
(আপনার রাজ্যে স্থানে স্থানে জলপূর্ণ বৃহৎ বৃহৎ জলাশয় আছে তো? এবং কৃষিকার্য বৃষ্টির উপর নির্ভর করে না তো?)
পুকুরে জল তো থাকবেই। এই রুক্ষ কঠোর শহরের মাঝে এই সব পুকুরেরা শুধু জল নয়, আরও অনেক কিছু আগলে রেখেছে। আমাদের দেশের শহরগুলির রোজকার জলের চাহিদার অনেকটাই মেটায় এই পুকুরগুলি। শহরের মানুষ এতে স্নান করেন, কাপড় কাচেন, বাসন মাজেন, আরও অনেক কাজ করেন। এঁদের অনেকেই গরিব মানুষ বা শহরে কাজ করতে আসা শ্রমিক, যাঁদের এই পুকুর ছাড়া কোনও গতি নেই। কলের জলের নাগরিক সুবিধা এঁরা কোনও দিনই পান না। শহরের অনেক মানুষের সংসার চলে এই সব পুকুরের মাছ ধরে বা বিক্রি করে। পুকুরের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বৃষ্টির জল ধরে রাখা। শহরের পুকুরগুলি তাই বৃষ্টির জলের ভাঁড়ার। এই জল কোথাও পুষ্ট করে ভূগর্ভের জলের স্তর।
ঘিঞ্জি শহরের অনেক জায়গাতে এই সব পুকুরের ধারই একটু খোলা জায়গা, যেখানে কিছুটা মুক্ত বাতাস বয়। এই খোলা জায়গাতেই বড় হয় কিছু গাছপালা, এখানেই কিছু পাখি বাসা বাঁধে, কাঠবিড়ালি দৌড়াদৌড়ি করে। জলের মাছ, স্থলের কাঠবিড়ালি আর আকাশের পাখি নিয়ে এরাই শহরের জীবজগৎ তৈরি করে। এই একটু খোলা পুকুরপাড়ের বেঞ্চিতে বসে সকাল-সন্ধের আড্ডা, কখনও পাশে ক্লাবঘর, কোথাও মন্দির। কোথাও এই পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন হয়, মন্দিরের পাশের মাঠে বসে চড়ক বা শ্রাবণের মেলা। শহরের নাগরিক সাংস্কৃতিক জগতের অংশ হয়ে ওঠে পুকুরেরা। হঠাৎ কোথাও আগুন লাগলে তা নেভানোর জন্য এই পুকুরের জলই অনেক সাহায্য করতে পারে। শহর আর পুকুরের এই আন্তঃসম্পর্কে জড়িয়ে যায় শহরের পরিবেশ, অর্থনীতি আর সমাজ।

Kolkata Wetlands

এটা কলকাতাবাসীর জানা দরকার যে কলকাতার প্রায় ৫০০০ পুকুরের সরাসরি ব্যবহারকারীরা মূলত গরিব মানুষ। এই গরিব মানুষদের বাড়িতে জলের যোগান নেই, ফলে পুকুরের স্নান, কাপড় কাচা তাদের পক্ষে অত্যন্ত জরুরি। উত্তর ও মধ্য কলকাতায় সব পুকুর বুজিয়ে ফেলার জন্য সেখানে গরিব মানুষদের লজ্জাজনক ভাবে (বিশেষত মহিলাদের) জনসমক্ষে প্রায়শই ঝগড়াঝাটি করে রাস্তার কলের জলে স্নান করতে হয়। দু’দশক ধরে কলকাতা শহরের পুকুর বাঁচানোর আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণ করার অভিজ্ঞতায় এটা মনে হয়েছে যে পুকুরের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ‘ভদ্রলোকে’দের কাছে একেবারেই আমল পায় না। ফলে শহরের পুকুর বাঁচানোর আন্দোলনে অনেক সময়ই জড়িয়ে থাকেন অবস্থাপন্ন মধ্যবিত্ত মানুষেরা, যাঁরা নিজেদের পাড়ার বা হাউসিং কমপ্লেক্সের পরিবেশ উন্নয়নের কথার বাইরে আর কিছু ভাবেন না। তাঁরা এটিকে আলো দিয়ে সাজিয়ে সৌন্দর্যায়নে ব্যস্ত থাকেন, সামাজিক পুকুরকে ব্যক্তিগত কয়েকজনের উন্নত জীবনযাত্রার জন্য ব্যবহারের বন্দোবস্ত করেন পরিবেশ-উন্নয়নের দোহাই দিয়ে। এমনকী এই উন্নয়নের টাকাটাও তারা কখনওই নিজেরা দিতে চান না, সেটার জন্য তদ্বির করে পুরসভার টাকার ব্যবস্থা করেন। বিকল্প জলের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত পরিবেশ-উন্নয়নের নামে পুকুরের সামাজিক ব্যবহারে সাধারণ মানুষের অধিকারকে ক্ষুন্ন করা অনুচিত।
কলকাতা পুরসভার কাছে দীর্ঘদিন পুকুরের কোনও গুরুত্ব ছিল না। সে জন্য কলকাতা পুরসভার কাছে শহরে কত পুকর রয়েছে, তারও কোনও সঠিক হিসাব ছিল না। ২০০৬ সালে পুরসভা পুরনো তালিকা সংশোধন করে। পুকুরের সংখ্যা মোট ৩৮৪৭টি।
পুরসভার ২০০৬ সালের ৩৮৪৭টি পুকুর সম্পর্কে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য তথ্য- ৪৩টি ওয়ার্ডে কোনও পুকুর নেই। এই পুকুরহীন ওয়ার্ডগুলি সব কটিই প্রথম ১০০টি ওয়ার্ডের মধ্যে।
১০১ থেকে ১৪১ নম্বর ওয়ার্ডে রয়েছে ২১৯৮টি (৫৭%) পুকুর। সবচেয়ে বেশি পুকুর রয়েছে ৬৭ ও ৬৯ ওয়ার্ডে, যথাক্রমে ৩৬৯ ও ২৭২টি। ভারত সরকারের সংস্থা ন্যাশনাল অ্যাটলাস অ্যান্ড স্কিমাটিক ম্যাপিং অর্গানাইজেশন (ন্যাটমো) ২০০৬ সালে কলকাতা শহরের একটি বিশদ মানচিত্র প্রকাশ করেছে। এই বইটিতে ২৮৪টি মানচিত্রে কলকাতা পুরসভার ১৪১টি ওয়ার্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই মানচিত্রগুলিতে পুকুরগুলিকে পরিষ্কার করে নীল রঙে দেখানো হয়েছে। মানচিত্রের পুকুরগুলিকে গুনলে  ১৪১টি ওয়ার্ডে ৮৭৩১টি পুকুর পাওয়া যায়। কলকাতা পুরসভার ২০০৬ সালের ওয়ার্ড-ভিত্তিক পুকুরের সংখ্যা আর ন্যাটমোর ওয়ার্ড-ভিত্তিক পুকুরের সংখ্যা তুলনা করলে বেশ কিছু ভ্রান্তি চোখে পড়ে আর কলকাতার কোন অঞ্চলগুলিতে বেশি পুকুর বোজানো হচ্ছে তাও অনেকটাই বোঝা যায়। গুগুল উপগ্রহ চিত্র থেকে গুণে কলকাতা পুরসভা অঞ্চলে এখন পুকুরের সংখ্যা পাওয়া যায় প্রায় ৫০০০ এর কাছাকাছি।
এবার প্রশ্ন কলকাতার পুকুর নিয়ে কী করা যায়? বেশিরভাগ পুকুরের অপরিচ্ছন্ন অবস্থা, পুকুর মালিকদের অর্থনৈতিক সমস্যা, পুরসভা থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের পুকুরের ব্যাপারে অনীহা, আইনি অপ্রতুলতা, মাছ চাষের সমস্যা, গবেষণার একান্ত অভাব- সব মিলিয়ে এক কথায় কলকাতার পুকুরেরা এখন মহা সংকটে। এসবের সমাধানের কি কোনও পরিবেশসম্মত পথ আছে- যাকে বলা যায় সবুজ সমাধান।
সমাধানের খোঁজে নামতে হলে প্রথম লক্ষ্য ঠিক করে নেওয়াই ভাল। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ শহরের পুকুরকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবহার করে। এই অতিব্যবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনা করতে গেলে ব্যবহারকারী বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিকবর্গের বিভিন্ন মতামতকে গণ্য করতে হবে, তার সঙ্গে শহরের জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা, পরিবেশসম্মত সহনশীল ব্যবস্থাপনার জন্য পাঁচটি লক্ষ্য স্থির করা যেতে পারে। এগুলি হল-
১. পুকুরে উন্নত জলের মান সুনিশ্চিত করা- কয়েক লক্ষ গরিব ব্যবহারকারীদের জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
২. সাধারণ মানুষের জন্য পুকুরের বিভিন্ন উপযুক্ত ব্যবহার পরিকল্পনা করা।
৩. পুকুরের সহনশীল বাণিজ্যিক ব্যবহার (যেমন মাছ চাষ, বিসর্জন ইত্যাদি) যা পুকুরের অন্য ব্যবহারকে ক্ষতি করবে না।
৪. পুকুরকে শহরের পরিবেশ উন্নয়ন ও জীববৈচিত্র বৃদ্ধির পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা।
৫. এই লক্ষ্যগুলি অর্জন করবার জন্য প্রতিষ্ঠান গঠন।
রবিবার (৪জুন ২০১৭) সকালে দক্ষিণ কলকাতার ৯২ নং ওয়ার্ডে সুইট ল্যান্ডে একটি পুকুরের পাশে ছিল পরিবেশ দিবসের অনুষ্ঠান। একদিন আগেই। গত পাঁচ বছর ধরে সত্তোরর্ধ কয়েকজন নাগরিকের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় জমির কারবারীরা স্থানীয় পুকুরটিকে বোজাতে পারেনি। প্রথম থেকে এর সাথে জড়িত থাকায় আশা হয় এভাবেই কলকাতার পুকুরগুলি বাঁচবে, নাগরিকেরা বাঁচাবেন। রবিবার সকালে সেই কথাই সবাই মিলে সোচ্চারে বলে এলাম।