মোদীর বিদেশ সফর ও প্রতিবেশীর ঈর্ষা

মানস রায়, ক্যালিফোর্নিয়া

0
India, USA, China, Pakistan relations

আশির দশকে ভারতে একটি টেলিভিশন ব্র্যান্ড খুব জনপ্রিয় ছিল। আর সেই ব্রান্ডের বিজ্ঞাপনী স্লোগানটি ছিল আরও জনপ্রিয়। Neighbor’s Envy, Owner’s Pride। পড়শীর ঈর্ষা, আমার গর্ব। কথাটার মধ্যে একটা নেতিবাচক ছাপ থাকলেও কথাটা মিথ্যে নয়। কোনও বস্তু বা ঘটনার মূল্য সবসময়ই আপেক্ষিক। পড়শীর নতুন স্কুটারের পাশে আপনার সেকেন্ড হ্যান্ড মারুতি বেশি মূল্যবান, আবার আপনার নতুন মারুতি ম্যাড়মেড়ে লাগে সেকেন্ড হ্যান্ড মার্সিডিজের পাশে। সুতরাং মোদীর আমেরিকা সফরে ভারত কি পেল তার হিসেব নিকেশের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি এই সফরকে কোন চোখে দেখছে।
প্রতিবেশী বলতে পাকিস্তান ও চিন। জনসংখ্যায় বাংলাদেশ পাকিস্তানের চাইতে বড় হলেও তিনদিক ভারত দিয়ে ঘেরা এই দেশের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব আপাতত: কম। বাংলাদেশেরও ভারত আমেরিকা সম্পর্কের ব্যাপারে মাথাব্যথা নেই বললেই চলে, তাদের নজর সর্বদা ভারত চিন সম্পর্ক নিয়ে কারণ, ভারতের সাথে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক দর কষাকষির সময় তাদের অস্ত্র ‘চায়না-কার্ড’, এবং সেই কার্ডের ওজন নির্ভর করে ভারত চিন সম্পর্কের ওপর।
প্রথমে নজর দেওয়া যাক পাকিস্তানের ওপর। এই রাষ্ট্রটি গত সত্তর বছর ধরে একই সঙ্গে দুধ ও তামাক একই সঙ্গে খেয়ে আসছে। আমেরিকা ও চিন সর্বদা তার বন্ধু। সরাসরি মার্কিন সামরিক জোটের অঙ্গ হওয়া সত্তেও আগমার্কা কমিউনিস্ট দেশ চিন পাকিস্তান নামক মৌলবাদী দেশকে আগলে রাখার দায়িত্ব পালন করে চলেছে। চিন ১৯৭০ সালের পাকিস্তানী সৈন্যবাহিনীর গণহত্যা সমর্থন করেছে। ১৯৭২ সালের মধ্যে আমেরিকা সহ সমস্ত অমুসলিম দেশগুলি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলেও চিন দেয়নি। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করে ভারত বিরোধী ইসলামী শক্তি বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসার পর মুসলিম দেশগুলির সঙ্গে স্বীকৃতি দেয় চিন। চিনের পদলেহনকারী ভারতের কমিউনিস্টরা এই সত্যটি সবর্দা এড়িয়ে যান।

আরও পড়ুন: চিন, পাকিস্তান ও মোদীর বিদেশনীতি

কি চোখে দেখছে পাকিস্তান মোদী ট্রাম্পের আলিঙ্গনকে? (এখানে বলে রাখা ভাল যে, মোদী ট্রাম্পের আলিঙ্গন নিয়ে আমেরিকা ফেক নিউজ পরিবেশনকারীরা অনেক মজা করলেও দু’বছর আগের ওবামা মোদীর আলিঙ্গনে কোনও দোষ দেখেন নি). গত এক সপ্তাহ ধরে পাকিস্তানী মিডিয়ায় প্রধান খবর মোদীর সফর। সফর শুরু হওয়ার  আগেই আশংকা ছিল, কি হয়, কি হয়। বরাক ওবামাও গত কয়েক বছরে ভারত আমেরিকা সম্পর্কের অনেক উন্নতি করেছেন। “আমেরিকায় অবাঞ্ছিত” নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন যে ভারত আমেরিকার সম্পর্কে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু ‘গান্ধী পরিবার’ ও তাদের লেজুরদের অপপ্রচার ধোপে টেঁকেনি, ওবামা মোদীর সম্পর্ক ভারত আমেরিকাকে আরও কাছে নিয়ে এসেছে, প্রজাতন্ত্র দিবসে ওবামা হয়েছেন প্রধান অতিথি যা আগে কখনও হয়নি।

আরও পড়ুন: দালাই লামা, অরুনাচল ও ভারত-চিন সম্পর্ক

তাহলেও, ট্রাম্প আর ওবামার ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ আলাদা। ট্রাম্প সোজা কথার মানুষ, পলিটিক্যাল কারেক্টনেসের ধার ধরেন না। ট্রাম্প কোনওদিন কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেননি, কোনও রাজনৈতিক পদের (গভর্নর, সেনেটর ইত্যাদি) দায়িত্ব নেননি। ছিলেন নিছক ব্যবসায়ী ও রিয়েলিটি শো’র অভিনেতা। হয়ে গেলেন পৃথিবীর সর্বশক্তিমান দেশের রাষ্ট্রপতি। মোদীও অনেকটা তাই। বিজেপি না করে (আর এস এস করতেন), বিধানসভার মুখ না দেখে সোজাসুজি মুখ্যমন্ত্রী, তারপর পরপর তিনবার পুনর্নির্বাচিত। লোকসভা, রাজ্যসভার মুখ না দেখে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায়।
পৃথিবীর দুটি গণতান্ত্রিক দেশ, একটি সংখ্যায় বৃহত্তম এবং অন্যটি শক্তিতে। এমন দুটি দেশের সর্বোচ্চ পদ দুটি অবাক করা মানুষ দখল করবে সেটা পলিটিক্যালি কারেক্ট পেশাদার রাজনীতিবিদ ও তাদের লেজুররা একদম হজম করে উঠতে পারছেন না। ভারতের কোনও গন্ডগ্রামের বিবাদকে জাতীয় রূপ দিতে ‘এওয়ার্ড ওয়াপসি’র নাটক তৈরী করা হচ্ছে আর ট্রাম্প সাহেব দৈনিক খুন হচ্ছেন নাটকের মঞ্চে, কখনও বা আইসিস স্টাইলে টেলিভিশনের পর্দায় ‘লিবারেল’ সাংবাদিক সগর্বে হাজির হচ্ছেন ট্রাম্পের নকল কাটামুন্ডু নিয়ে। তাই অনেক দেশের, বিশেষত: পাকিস্তানের দুর্ভাবনা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

Pakistan and terrorism

পাকিস্তানের দুর্ভাবনা হওয়ার আরেকটি কারণ সারা দুনিয়ায় এই দুই নেতাই কোদাল কে কোদাল বলতে দ্বিধা করেন না। সারা দুনিয়ার নেতারা যখন ইসলামী সন্ত্রাসবাদ কে ইসলামী সন্ত্রাসবাদ বলতে ভয় পান তখন এই দুই নেতা বারবার বলেন শত্রুকে তার নাম ধরে সনাক্ত না করে তার সংহার সম্ভব নয়। সুতরাং মোদী ট্রাম্প যৌথ বিবৃতির পর পাকিস্তানের স্বরাস্ট্র মন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলীর গলায় ঝরে পরে হতাশার সুর। তিনি বলেন, ট্রাম্প সাহেব ‘ভারতের ভাষায়’ কথা বলছেন, এতে দুই দেশের (ভারত-পাকিস্তান) সম্পকের উন্নতি হওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই বরং এটা সমস্ত দক্ষিণ এশিয়ার (বা ভারতীয় উপমহাদেশের) দেশগুলির মধ্যে স্থায়ী শান্তি ও সমানতাকে বিপন্ন করবে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ থেকে ‘আজাদ’ কাশ্মীরের প্রেসিডেন্ট সবাই ভেঙ্গে পড়েছেন কাশ্মীর ইস্যুকে পাত্তা না দেওয়ায়। কাশ্মীরের সাম্প্রতিক গন্ডগোলকে প্যালেস্তানি টাইপ ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ছাপ দেওয়ার স্বপ্ন যে বহু বছর পিছিয়ে গেল সেটা বুঝতে পারছেন পাকিস্তানী নেতারা। উল্টে চাপ এসেছে পাকিস্তানের ভিতরে আশ্রয় পাওয়া সন্ত্রাসী ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনগুলিকে লাগাম দেওয়ার। কাশ্মীরী সন্ত্রাসী, হিজবুল মুজাহিদিনের নেতা সৈয়দ সালাহুদ্দিনকে ‘আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়া নিয়ে মুখে পাকিস্তানী নেতারা যতই বিরোধিতা করুন না কেন। ট্রাম্প যে শুধু প্রতীকী কাজকর্মে বিশ্বাস করেন না সেটা  তারা বুঝেছেন এবং অবস্থা সামাল দিতে পরদিনই মুম্বাই হত্যাকান্ডের কুচক্রী, বর্তমানে বন্দী, হাফিজ সৈয়দের নতুন সংগঠন তেহরিক-এ-আজাদীকে (সন্ত্রাসী সংগঠনজামাত-উদ-দাওয়ার নতুন রূপ) নিষিদ্ধ করেছেন। দেখা যাক মোদী ট্রাম্প যৌথ বিবৃতির প্রভাব সীমান্তের গোলাগুলি ও কাশ্মীরে সন্ত্রাস পাচারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে।
এই সফর নিয়ে তির্যক মন্তব্য করেছে চিন। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প সাহেব চিনের বিরুদ্ধে যতই তর্জন গর্জন করুন না কেন নির্বাচনের পরে ব্যাপারটা নিয়ে আর খুব একটা ঘাটাননি। উল্টে চিন প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং এর আমেরিকা সফরের পর ট্রাম্প সাহেব আরও চিনের প্রতি নরম ভাবাপন্ন হয়ে পড়েন। সম্প্রতি সেই অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে দুটি কারণে। প্রধানত: উত্তর কোরিয়া। জিংপিং সাহেব আশ্বাস দিয়েছিলেন যে চিন উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ ও পরীক্ষা বন্ধ করার চেষ্টা চালাবেন। চিনের পক্ষে সেটা সম্ভব কারণ, উত্তর কোরিয়ার ব্যবসা বাণিজ্য, খাদ্য সরবরাহ সবই প্রধানত চিনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ইচ্ছায় বা অন্য বাধ্যবাধকতায় চিন এ’ব্যাপারে এখনও কিছু করে উঠে পারেনি। এটা ট্রাম্প সাহেবের একদম ভালো লাগেনি। তিনি আশা করছিলেন বিরাট কোনও পদক্ষেপ না নিলেও অন্তত: অল্প সল্প কিছু করে দেখাবে চিন। তারপর দক্ষিণ চিন সাগরে চীনা নৌবহরের সাম্প্রতিক দাপাদাপিও আমেরিকা সুনজরে দেখছে না।
চিনের তির্যক মন্তব্যের কারণ আমেরিকার ভারতকে অত্যাধুনিক ড্রোন বিক্রয়। এর আগে আমেরিকা ন্যাটো চুক্তির দেশ ও ইজরায়েল ছাড়া কাউকে এই অনুসন্ধানী স্বচালিতবিমান বিক্রি করেনি। চিনের ভয় এই বিমানের সাহায্যে ভারত ভারত মহাসাগর অঞ্চলে চিনা সামরিক কার্যকলাপের ওপর করা নজর রাখতে সক্ষম হবে এবং ভারতের মাধ্যমে এইসব খবর আমেরিকা এটি সহজে ও সস্তায় পেয়ে যাবে। চিনের মাথা ব্যথার কারণ যথেস্ট।
দেশে ফেরা যাক। প্রশ্ন উঠছে ভারত কি পেল? এই প্রশ্নটাই গোলমেলে। এতে কেমন একটা ভিক্ষাবৃত্তির গন্ধ আছে। ভারত এখন আর সেই স্তরে নেই যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকা বা ইউরোপের কোনও দেশ সফরের সাফল্যর মানদণ্ড ছিল ভিক্ষার ঝুলিতে কত অনুদান পাওয়া গেল তার ওপর। এখন ভারত আমেরিকা সম্পর্ক দুটি বৃহৎ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির দেওয়া নেওয়ার, দর কষাকষির  সম্পর্ক। এখন শুধু আমেরিকান শিল্পপতিরাই ভারতে পুঁজি নিবেশ করেন না ভারতীয় শিল্পপতিরাও আমেরিকায় পুঁজি খাটিয়ে থাকেন। Confederation of Indian Industry (CII)র ২০১৫ সালের এক প্রতিবদনে জানান হয়েছে যে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থাগুলি আমেরিকায় একলক্ষ কোটি টাকার বেশি বিনিযোগ করছে যাতে ৯১ হাজার আমেরিকানের কর্মসংস্থান হয়েছে। আমেরিকা যখন বিভিন্ন দেশের মানুষের প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি করছে তখন ভারতীয় নাগরিকদের ‘গ্লোবাল এন্ট্রি পারমিট’ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন কাজে ভারতীয়দের আমেরিকায় প্রবেশের ঝামেলা অনেক কমবে।
শেষ পর্বে আসা যাক H1B ভিসার কথায়. আমেরিকার সাথে সম্পর্ক মানে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়র একটিই প্রশ্ন-H1B ভিসার ওপর হাত পরেনি তো? পড়েছে এবং পড়েনি। H1B ভিসা সংক্রান্ত আইনে কোনও পরিবর্তন এখনও করা হয়নি। যেটা হয়েছে সেটা হল আইনটি যথাযতভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কিনা সেটা খুটিয়ে দেখা হচ্ছে। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলি এই আইনটির যথেচ্ছ অপপ্রয়োগ করেছে এমন অভিযোগ বহুদিনের। এখন আমেরিকান সরকার সেটা আর সহ্য করবে না জানিয়ে দিয়েছে এবং H1B ভিসায় ভারতীয়দের (এবং অন্যান্য দেশের) নিয়োগের ওপর কড়া নজর রাখছে। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানিগুলিও এ ব্যাপারে যথাযত পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে এবং আমেরিকায় বসবাসকারী মানুষদের নিয়োগ বাড়াচ্ছে। এতেও লাভ হবে আমেরিকায় পড়াশোনা করা ভারতীয় ছাত্রদের।
তবে একটি সফরে সব চাওয়া পাওয়ার সমাধান হয় না। ভারত আমেরিকার সম্পর্ক এক চলমান সম্পর্ক, দুনিয়ার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলির সাথে সাথে এরও চড়াই উতরাই থাকবে।