পাহাড়ে অশান্তির দায় মমতা এড়িয়ে যেতে পারেন না

জয় গুপ্ত

1
Darjeeling violence

পাহাড় এখন হাসছে না, জ্বলছে। গত কয়েক দিন ধরে সেই ছবিটাই গোটা দুনিয়া দেখছে। আর তার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে আলাদা করে কোনও বিজ্ঞাপন দিতে হয়নি!
পাহাড় তথা দার্জিলিং এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে ‘শাঁকের করাত’। প্রশাসন নরম মনোভাব নিলেও বিপদ, আবার ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ মনোভাব দেখাতে গিয়েও সমস্যা বাড়ছে।
মমতা বলছেন, ‘‘আমি বেঁচে থাকতে বাংলা ভাগ হতে দেব না’’। প্রায় ৩১ বছর আগেও রাজ্যের শাসক দল এই একই কথাই বলেছিল।
অথচ মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শপথ নেওয়ার পর গত ক’বছর ধরে পাহাড় স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। গোর্খাল্যান্ডের দাবি যেন চাপা পড়ে গেছিল, পর্যটকদের ঢল নেমেছিল পাহাড়ে। বিভিন্ন মাধ্যমে বিজ্ঞাপনে জানান দেওয়া হচ্ছিল ‘পাহাড় হাসছে’। তাহলে হঠাৎ করে কি হল যাতে পাহাড়ের এই চিত্রটা পাল্টে গেল?
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর প্রশাসন ও দলের তরফে বলা হচ্ছে- জিটিএ-তে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি হয়েছে, কোটি কোটি টাকা নয়ছয় হয়েছে। সরকার জিটিএ’র অডিট করার কথা ভাবনাচিন্তা করতেই বিমল গুরুং বেঁকে বসেছে এবং এই হিংসাত্মক আন্দোলন শুরু করেছে।
শুধু কি তাই! এই ব্যাখ্যাটা অতি সরলীকরণ হয়ে গেল না?
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় আসার পর থেকে পাহাড়ে কি কি পরিবর্তন হয়েছে সেটা একবার দেখে নেওয়া যাক-
মমতা নির্বাচনের আগে বলেছিলেন ক্ষমতায় এলে তিনি গোর্খাদের দাবিদাওয়া নিয়ে কথা বলবেন। সেই মতো ক্ষমতায় আসার পর বিমল গুরুংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সঙ্গে কথাবলা শুরু করেন। নানা আলাপ আলোচনার পর ১৮জুলাই ২০১১ পিনটেল ভিলেজে তৎকালীন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পি চিদম্বরম, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিমল গুরুংয়ের উপস্থিতিতে জিটিএ (Gorkhaland Territorial Administration) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৪ মার্চ, ২০১২ জিটিএ গঠিত হয়। অনেকের হয়তো মনে থাকবে সে সময় এই জিটিএ নামটি নিয়ে প্রথম দিকে সমস্যা হচ্ছিল, পরে বিমল গুরুংদের চাপে ‘জি’(গোর্খাল্যান্ড)শব্দটি রাখতে হয় ।
১৯৮৮ সালে সুভাষ ঘিসিংয়ের চাপে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারকে ‘দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল’ তৈরি করতে হয়েছিল। তাহলে সেটাকে ভেঙে নতুন করে জিটিএ গঠন করার উদ্দেশ্য কি ছিল? যখন দুটোরই কার্যকারিতা প্রায় একই রকম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছিলেন, বিমল গুরুং খুব ভাল করেই জানতেন, সেসময় গোর্খাল্যান্ডের দাবি পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। ফলে পাহড়ে কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য তাঁর কিছু একটা প্রয়োজন, যাতে তিনি বলতে পারেন- পাহাড়ের জন্য কিছু আদায় করতে পেরেছেন। পাশাপাশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দেখলেন জিটিএ দিয়ে আপাতত গুরুংদের শান্ত করা যাবে। ফলে গঠিত হল জিটিএ। এরপর মমতা বারেবারে পাহাড়ে এসেছেন, উন্নয়নমূলক নানান কর্মসূচির কথা ঘোষণা করেছেন। আমরা সংবাদমাধ্যমে‍ মুখ্যমন্ত্রীর হাসিমুখের ছবি দেখেছি- কখনও খাদা গলায়, কখনও পাহাড়ের মহিলা, শিশুদের জড়িয়ে ধরে। পাশাপাশি মমতা পাহাড়ে নিজের এবং তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাব বাড়ানোর কাজটিও শুরু করে দেন। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিক্ষুব্ধদের ও গুরুং বিরোধীদের দলে টানতে শুরু করেন। সুভাষ ঘিসিং মারা যাওয়ার পর জিএনএলএফ-এর নেতাদের দলে নিতে শুরু করলেন। একই সঙ্গে বিমল গুরুং-সহ মোর্চার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা নাড়াচাড়া দিতে শুরু করলেন। পাহাড়ের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের জন্য আলাদা বোর্ড গঠন করে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি গ্রহণ করলেন। বলতে গেলে, নরমে-গরমে বিমল গুরুংদের কোনঠাসা করে পাহাড় নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলেন মমতা।
সত্যিই এই ক’বছরে বিমল গুরুং পাহাড়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা অস্তিস্ত সংকটে পড়তে শুরু করেছিল। গুরুংরা স্বমহিমায় ফিরে আসার জন্য একটা সুযোগ খুঁজছিল। আর সেই সুযোগ সুন্দরভাবে তাদের করে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্বয়ং। পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, রাজ্যের সব স্কুলে প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত তিনটি ভাষা পড়তে হবে। তার মধ্যে বাংলা আবশ্যিক। আর এই ঘোষণাতেই গুরুং দীর্ঘ অপেক্ষার পর হাতে অস্ত্র পেয়ে যান। ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তিনি এর বিরোধিতা শুরু করেন ‍ও পাহাড় জুড়ে আন্দোলনের কর্মসূচির কথা ঘোষণা করে দেন এবং গোর্খাল্যান্ড ইস্যুটিকে ফের সামনে এনে আন্দোলনের মাধ্যমে পাহাড়ে হারানো জমি পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেয়ে যান। সম্প্রতি মিরিক পুরসভা জয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পাহাড় নিয়ে নিঃসন্দেহে দ্বিগুণ আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল। মমতা মিরিকে বিজয় সমাবেশে গিয়ে বুঝতে পারেন ভুল হয়ে গেছে। তাই তিনি সেখানে বলেন, পাহাড়ের স্কুলগুলিতে বাংলা বাধ্যতামূলক হচ্ছে না, চতুর্থ বিষয় হিসাবে থাকবে। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে।
দার্জিলিংয়ে দীর্ঘ কয়েক দশক পর মুখ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে রাজ্য সরকারের প্রশাসনিক বৈঠক বসে। সেই বৈঠকস্থল রাজভবনের বাইরে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিক্ষোভ, পাথর ছোড়া, পুলিশের লাঠি চার্জ, কাদানে গ্যাস, আগুন, সেনাবাহিনী, কার্ফিউ, গুলি, মৃত্যু, অনির্দিষ্ট কালের জন্য বনধ্ সব মিলিয়ে পাহাড় নিয়ে এখন চাপে মমতা আর গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনকে জাগিয়ে তুলে স্বমহিমায় ফিরছেন গুরুং।

Demand for Gorkhaland

জন আন্দোলন পার্টির নেতা হরকা বাহাদুর ছেত্রী (সুভাষ ঘিসিং, বিমল গুরুং, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই তিন জনের দলেরই সদস্য ছিলেন) ফের পাহাড় উত্তপ্ত হওয়া প্রসঙ্গে এক একান্ত আলাপচারিতায় বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভুল সিদ্ধান্তের জন্য পাহাড়ে ফের অশান্তি শুরু হয়েছে। দার্জিলিংয়ের মানুষ কি বাংলায় কথা বলে না? বলে তো। বাংলা পাহাড়ের স্কুলগুলিতে ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে আগে থেকেই ছিল। তাহলে জোর করে বাংলা চাপিয়ে দেওয়ার কথা বলার কি দরকার ছিল? আমরা নিজেদের প্রয়োজনে ইংরেজী বা হিন্দি কি শিখি না, তেমনি প্রয়োজনে পাহাড়ের মানুষ নিজে থেকেই বাংলা শিখে নেয়। পাহাড়ের মানুষ ভীষণ আবেগ প্রবণ, তাদের আবেগকে বোঝা অত সহজ নয়, তার জন্য সময় দিতে হয়। আমার মনে হয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাহাড় নিয়ে যাদের উপর ভরসা করেছিলেন তাঁরা তাঁকে ভুলভাবে ‘গাইড’ করেছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাহাড়ের বিষয়ে আরও বেশি বিচক্ষনতার পরিচয় দেখানো উচিত ছিল।’’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাহাড়ের এক পোড় খাওয়া রাজনীতিবিদ বলেন, জিটিএ-তে দুর্নীতি হয়েছে সেটা সকলেরই জানা, বিমল গুরুংদের দুর্নীতি নিয়ে আমাদের কাছে পাতার পর পাতা তথ্য আছে। তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার ধীরে ধীরে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করতে পারত। গুরুং তো এমনিতেই চাপে ছিলেন। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে বিমল গুরুংয়ের বিরুদ্ধে কোনও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলে গুরুং পাহাড়ে শহিদের মর্যাদা পেয়ে যাবেন। মনে রাখতে হবে গুরুং কিন্তু গোর্খাদের জাতিসত্ত্বার ভাবাবেগের উপর ভর করে রাজনীতি করছেন। এক সময় যেটা সুভাষ ঘিসিং নেতৃত্ব দিয়েছেন, পরবর্তীকালে সেই ব্যাটন চলে আসে গুরুংয়ের হাতে। আর এখন ফের গোর্খাল্যান্ড ইস্যুতে পাহাড়ের সব রাজনৈতিক দলগুলি জোট বাঁধতে আরম্ভ করেছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে মাঝে মধ্যেই আরেকটা কথা বলা হচ্ছে, বিমল গুরুংদের পিছনে কেন্দ্রের মদত রয়েছে। আমার মনে হয় বিষয়টা সেরকম নয়। কেন্দ্রের বর্তমান বিজেপি সরকার ছোটো রাজ্যের পক্ষে হলেও এই মুহূর্তে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে পৃথক গোর্খাল্যান্ডের দাবি পূরণ করা সম্ভব নয়। পশ্চিমবঙ্গের এই অংশটি জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কেন্দ্র যদি গোর্খাদের দাবিদাওয়াগুলোকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে তাহলে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই অঞ্চলের আন্দোলনের রাশ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের হাতে চলে যাবে। এবং বহিঃরাষ্ট্রের গোয়েন্দাসংস্থাগুলিও আগুনে ঘি ঢালতে শুরু করবে। তাই গোর্খাদের ভাবাবেগকে কেন্দ্র সরাসরি অস্বীকার করতে পারবে না আবার অধিক গুরুত্বও দেওয়াও সম্ভব হবে না- এরকম একটা কৌশল অবলম্বন করছে।
সব শেষে, পাহাড়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে ত্রিপাক্ষিক আলোচনা ছাড়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কোনও এক পক্ষ অনড় মনোভাব দেখালে অবস্থা আরও জটিল থেকে জটিলতর হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে আরও উদারতা দেখাতে হবে, কেবলমাত্র ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’ মনোভাব নিয়ে পাহাড়ের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।
  • রাজ মিশ্র বাংগালী

    জয় বংগমাতা
    জয় বাংগালী
    জয় বাংলা