সাম্প্রদায়িকতার ঘটনায় নীরবতা সর্বদা শান্তির হয় না

কাজি মাসুম আখতার

0

সম্প্রতি আমাদের রাজ্যের দীর্ঘদিনের সম্প্রদায় সম্প্রীতির পরিবেশ ভেঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিরোধ তৈরি হচ্ছে, হিংসা ছড়াচ্ছে। বাংলার সংবাদমাধ্যমে ঘটনাগুলি প্রকাশিত বা সম্প্রচারিত হচ্ছে না। কিছু ইংরাজি ও হিন্দি সংবাদমাধ্যম এই ধরনের ঘটনার খবর প্রকাশ করছে। অনেকে বলছেন- এই সংবাদমাধ্যমগুলি উস্কানিমূলক খবর প্রকাশ করছে। আর বাংলা সংবাদমাধ্যম নীরব থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে !  সত্যিই কি তাই?
প্রকৃত সত্যটি সংবাদমাধ্যম চেপে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ ধর্মের নামে যারা সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে তাদের মানুষ চিনতে পারছে না। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প যারা এ’রাজ্যে ছড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কোনও জনমত গড়ে উঠছে না। প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না, সে বিষয়েও আমরা জানতে পারছি না। সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে প্রশাসন তার দায় এড়িয়ে যেতে পারে না। সাম্প্রদায়িকতার ঘটনায় নীরবতা সর্বদা শান্তির হয় না। এতে কখনও কখনও অন্যায় প্রশ্রয় পায়। অপরাধীদের বাড়বাড়ন্ত হয়। সত্যের পরাজয় ঘটে। প্রশাসনও দায় এড়িয়ে যায়। এতে প্রতিহিংসা বরং গুমরে আরও বাড়ে। সুযোগ পেলেই প্রতিশোধস্পৃহা জেগে ওঠে। অত্যাচারিতদের প্রতি এটি আর এক ধরনের অত্যাচারও বটে। সত্য চাপা দিতে গিয়ে অসত্য প্রচারের সম্ভাবনাও থেকে যায়। যা দাঙ্গাকারীদের সুবিধাই করে দেয়। এরা আসলে সব ধর্মের শত্রু। এই ধর্মের নামধারীরা আসলে এদের নিজ নিজ ধৰ্মকেই কলঙ্কিত করতে চায়। কখনও বুঝে আবার কখনও বা না বুঝে। আর বাকিরা আসলে দুষ্কৃতী। তারা লুটেরা, খুনি, ধর্ষক। কেউ কেউ আবার রাজনীতির কারবারি। শুধু সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। তবে গুজব রটনাকারীদের বিরুদ্ধে চাই কঠোরতা। সদিচ্ছা থাকলে সরকার সবই পারে।

news_bitarka

বিগত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন এলাকায় এই একই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে। যেমন-হালিশহর, চুচূড়া, নৈহাটি, ভাটপাড়া, খড়গপুর, কালিয়াচক, কাটোয়া, দক্ষিণ ২৪ পরগনার একাধিক অঞ্চলে। অতি সম্প্রতি ধুলাগড়ে। কলকাতা থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে অবস্থিত ধুলাগড়ে হিংসার আগুনে পুড়েছে একের পর এক বাড়ি, দোকানঘর। আক্রান্ত স্থানীয় মানুষ। প্রাণ হাতে নিয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে বহু মানুষ। অথচ বাংলা সংবাদমাধ্যমে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনও খবর আসেনি। ফলে প্রকৃত সত্য ঘটনা জানার কোনও অবকাশ নেই। বিভিন্ন সূত্র থেকে যা জানতে পেরেছি, তা হল গন্ডগোলের সূত্রপাত নবী দিবসে একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে। মিছিল থেকে কটূক্তি, স্থানীয়দের পাল্টা কটূক্তি থেকে উত্তেজনা ছড়ায়। ফলে কয়েকদিন ধরে নানা ধরনের হিংসাত্মক কাজকর্ম চলতে থাকে, আক্রান্ত উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। স্থানীয় এবং বিভিন্ন সূত্রে জানতে পেরেছি এই অশান্তির আঁচটা অনেকদিন ধরেই ধিকধিক করে জ্বলছিল। মৌলবাদীরা, সুযোগ সন্ধানীরা নানা ছুঁতোয় সেই আগুনে হাওয়া দিত। সম্প্রতি ডিমানিটাইজেশনের ঘটনায় মুসলিম সমাজে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে এক ধরনের রাজনীতিবিদ, ধর্ম ব্যবসায়ীরা। ওই এলাকার মুসলিমরা অনেকেই নোট বাতিলের জেরে বিপদের সম্মুখীন হয়, এলাকার অনেক গরীব মানুষ রাজ্যের বাইরে কাজের জন্য যেতে হয়। তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ এই সময় কাজ হারিয়েছে। ফলে তারা এমনিতেই ক্ষুব্ধ ছিল। সেদিনের মিছিলে তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় ধুলাগড়ের এই ঘটনা আরও একবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল মুসলিম সমাজে কতটা ধর্মীয় অবক্ষয় ঘটেছে। নবী দিবসের মিছিল ঘিরে অশান্তি। যা সত্যিই লজ্জার। নবী দিবসে মিছিল করার কোনও নির্দেশ ইসলাম ধর্মে নেই। তাহলে কেন এই মিছিল করে অশান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা? মানুষের সর্বনাশ করা। সরকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলা। এ রাজ্যে অশান্তির বাতাবরণ তৈরি করা। নিজেদের আরও সর্বনাশ ডেকে আনা। অথচ নবী তো শান্তির কথাই বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন- ‘তোমার ধর্ম তোমার, আমার ধর্ম আমার’, ‘ধর্ম নিয়ে কোনও জোর জবরদস্তি করা চলবে না, যে জাতি ধর্ম নিয়ে জোর জবরদস্তি করছে, তারা ধ্বংস হয়ে যাবে’। বাস্তবে আমরা দেখছি ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, গোঁড়ামির ফল তিল তিল করে ভুগতে হচ্ছে পৃথিবীর মুসলিম প্রধান দেশগুলিকে। নবী দিবসের মিছিল ঘিরে অশান্তি। সত্যিই লজ্জার। এদের কবে শিক্ষা হবে কে জানে! এরা যে নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই করছে সেটা আর কবে বুঝবে? মুসলিম সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরা আর কবে এসবের বিরুদ্ধে সরব হবেন? কবে তারা বলবেন- যারা এই ধরনের কাজ করেছে, যারা প্ররোচনা দিয়েছে তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক, ইসলাম ধর্ম এই সব সমর্থন করে না। পাশাপাশি সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়কেও সতর্ক থাকতে হবে, যাতে কেউ তাদের কোনও রকম প্ররোচনায় পা দিতে বাধ্য করতে না পারে। তা না হলে গুজরাট, মহারাষ্ট্রের মতো ঘটনা পশ্চিমবাংলায় ঘটতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
ভারতবর্ষ ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ। মুসলিমরা সংখ্যালঘু। মাথায় রাখতে হবে সংখ্যাগুরু আর সংখ্যালঘুদের মধ্যে দূরত্ব যদি বাড়তে থাকে তাহলে সংখ্যালঘুদেরই বিপদ। এটা সবাই জানে ধর্মের নামে সমাজে বিভেদ তৈরি হলে সবচাইতে বেশি লাভবান হবে মৌলবাদী শক্তি। তাদের হাতে থাকবে সমাজের নিয়ন্ত্রণ। রাজনৈতিক দলগুলি ভোটের জন্য যেভাবে সংখ্যালঘু তোষণ করছে তাতে মৌলবাদীদের দাপট বাড়ছে।
এগুলি নিয়ে যদি সুশীল সমাজ সরব না হয় তাহলে এক ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের জন্য আমাদের আর খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হবে না। ধুলাগড় এবং সাম্প্রতিক কালে রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক অশান্তি নিয়ে বাংলার সুশীল সমাজ দেখছি মুখে কুলুপ এটেছে। যারা আফগানিস্থান থেকে পাকিস্তান, সিরিয়া থেকে নাইজেরিয়া সব বিষয়ে মুখ খোলেন, প্রতিবাদ করেন, দেশের অন্য কোনও রাজ্যে কিছু ঘটলে ছুটে যান, মোমবাতি মিছিল করেন, তারা ধুলাগড় নিয়ে রা-টুকু করছেন না কেন। তাদের এই নীরবতা আসলে সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। এই নীরবতা ধর্মের নামে দাঙ্গা বাধানো দুষ্কৃতীদের প্রশ্রয় দেবে, আরও বেশি করে উৎসাহিত করবে। গোটা রাজ্য জুড়েই দ্রুত এই অশান্তির আগুন ছড়িয়ে পড়বে। ধর্মের নামে চলবে মৌলবাদী শক্তি আর দুষ্কৃতীদের যৌথ তান্ডব। অবাধে চলবে খুন, ধর্ষণ, লুঠপাট। সমাজের এই পচন রোধে আমরা যদি এখনই সচেষ্ট না হই তাহলে আর কবে হব।
সংবাদমাধ্যমের এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নে‍ওয়া উচিত। কোনও হুমকির কাছে মাথা নত না করে তাদের উচিত সত্য ঘটনা মানুষের কাছে তুলে ধরা। প্রাথমিকভাবে সকলের নজর এড়িয়ে যাওয়া কামদুনির ঘটনাকে তারাই তো রাজ্যের মানুষের সামনে তুলে ধরেছিল। মানুষ প্রতিবাদে সরব হয়েছিল। আমরা শ্মশানের শান্তি চাই না। সংখ্যালঘু ইস্যু তুলে কান্না গাওয়া স্বঘোষিত নেতারা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটু আওয়াজ তুলেই দেখুন না। সকলেই খুশি হবে। ইসলাম মর্যাদা পাবে। আর সংখ্যালঘুদের নিয়ে যারা নোংরা রাজনীতি করছেন তাদের মুখোশ খশে পড়বে। আমরা যদি এখনও সতর্ক না হই তাহলে আমরা নিজেদের ধ্বংস নিজেরাই করব। মনে রাখতে হবে ‘গ্রেট কলকাতা কিলিং’ কিন্তু এই বাংলাতেই ঘটেছিল।
লেখক- বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মী।