ধর্মীয় নেতাদের তুষ্ট করা ছাড়া মমতা মুসলিমদের জন্যে কিছুই করেননি

গিয়াসুদ্দিন

0

ক্ষমতায় আসার তিন মাস পরই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমি আপনাদের ৯০% কাজ করে দিয়েছি।’  আর কুড়ি মাসের মাথায় বলেছিলেন, ”৯৯% কাজই আমি আপনাদের করে দিয়েছি।” হ্যাঁ, এমনটাই দাবি তিনি করেছিলেন। যে কাজ কংগ্রেস এবং সিপিএম ৬৪ বছরে করতে পারেনি তা শেষ করতে তিনি দু’বছরও সময় নেন নি।  তাঁর এ দাবিকে পাগলের প্রলাপ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। কারণ, ইমাম-মাওলানা-মুফতিগণও বলছেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে মুসলিমদের উন্নয়নের কর্মযজ্ঞ চলছে। হেঁজি-পেঁজি ইমাম বা মাওলানারা শুধু বলছেন না, বলছেন ঐতিহ্যবাহী ‘টিপু সুলতান মসজিদ’ ও ‘নাখোদা মসজিদ’-এর ইমামগণ এবং সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীর মতো বিখ্যাত মাওলানারাও। মমতার সমর্থনে ব্যাট করছেন  নিষিদ্ধ সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ‘সিমি’র  পশ্চিমবঙ্গের  প্রতিষ্ঠাতা, সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরানও।ইমরানের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মুসলিম সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জামাত-উল-মুজাহিদিন (জেএমবি) ও জামাতি ইসলামের সঙ্গে যোগ এবং তাদেরকে সারদার টাকা পাচার করার অভিযোগও রয়েছে । অর্থাৎ তিনি যে সে মুসলিম নেতা নন, একেবারে হাই প্রোফাইল নেতা।এই ইমরানের সারদা ধন্য সংবাদপত্র ‘কলম’ ১৬ই মার্চ ২০১৬ প্রথম পাতায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রশংসা করে একটি প্রতিবেদন ছেপেছে। যার শিরোনাম হলো ‘সংখ্যালঘু উন্নয়নে কথা রেখেছে তৃণমূল সরকার’। বহিষ্কৃত সিপিএম নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী আব্দুর রেজ্জাক মোল্লাও বলছেন, মুসলমানদের জন্যে উন্নয়নের যে কর্মযজ্ঞ পশ্চিমবঙ্গে  চলছে তাতে সামিল হতেই তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেছেন।
মুখ্যমন্ত্রী যা দাবি করছেন তা যদি সত্যি হয় তাহলে বুঝতে হবে মুসলিমরা এ রাজ্যে তাদের পশ্চাদপদতা কাটিয়ে উঠেছে এবং তাদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে গত পাঁচ বছরে । কিন্তু মুসলমানদের অবস্থা কি সত্যি সে রকম হয়েছে ?
দেশে এবং এ রাজ্যে মুসলিমদের অবস্থা শুধু করুণ নয়, তপশীলি জাতি-উপজাতিদের চেয়েও তাদের অবস্থা শোচনীয় সেটা প্রথম জানায়  সাচার কমিটি, ২০০৬ সালে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের জামানায় মুসলিমদের ব্যপক উন্নয়ন হয়েছে, সাচার কমিটি এই মিথটা প্রথম ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। যা সিপিএম প্রথমে মানতেই চায় নি। কিন্তু অক্সফোর্ড থেকে ২০০৪ ও ২০০৬  সালে যে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল মুসলিমদের অবস্থা নিয়ে তাতেও সেই ছবি ধরা পড়েছিল যা সাচার কমিটি বলেছিল। রিপোর্ট দুটি তৈরী করেছিল ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ  আ্যাপ্লায়েড রিসার্চ’ এবং ‘কাউন্সিল অফ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’। ৭৮টি গ্রাম সমীক্ষা করে তারা যে দুটি রিপোর্ট  তৈরী করেছিল তাতে একদিকে  ছিল গ্রাম বাংলার অভ্যন্তরে হিন্দুদের সঙ্গে  মুসলমানদের তুলনামূলক অবস্থার চিত্র এবং আরেক দিকে ছিল গ্রামীন ভারতের মুসলমান ও গ্রাম বাংলার মুসলমানদের তুলনামূলক অবস্থার ছবি। এই নিবন্ধে সেই সমীক্ষার কিছু অংশ তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
সারণী – ১

1

সারণী – ২
2গ্রামীণ ভারতের মুসলিমদের তুলনায় গ্রাম বাংলার মুসলমানরা যে পিছিয়ে পড়েছিল, বাম জামানায় তা জানা গিয়েছিল ভারত সরকারের পরিসংখ্যা ও পরিকল্পনা রূপায়ণ দপ্তরের একটি সংস্থার ১৯৯৯-২০০০ সালের একটি প্রতিবেদন থেকে। সেটা হলো এটি –
সারণী – ৩
3মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেহেতু মুসলমানদের জন্যে যা যা করবার দরকার ছিলো তার ১০০% বা তার বেশীই সম্পন্ন করে দিয়েছেন সেহেতু মুসলমানরা নিশ্চয় আর পশ্চাদপদ নেই। আর্থ-সামাজিক ও অন্যান্য সব দিক থেকেই তাদের ব্যপক উন্নতি ঘটেছে এবং তারা হিন্দু, খ্রীষ্টান, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ ইত্যাদি  কোনও সম্প্রদায়ের  থেকে পিছিয়ে নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্রটা সম্পূর্ণই আলাদা। মুসলমানরা যে তিমিরে ছিল তার চেয়েও বেশী তিমিরে নেমে গিয়েছে। মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার কোন উন্নতিই হয়নি। সেটা ফাঁস হয়ে গেছে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের ‘প্রতীচি’ সংগঠনের রিপোর্টে। সে রিপোর্টটি বলছে, ‘৫৫ শতাংশ মুসলিম উল্লেখযোগ্য পেশার সঙ্গে যুক্ত নয়। ৮০ শতাংশ মুসলিম পরিবারের মাসিক আয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা বা তার কম। ৪৭ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত বা দিন মজুরের কাজ করে। মুসলিম পরিবার ঋণ পান না ব্যাঙ্ক থেকে, ৪৩ শতাংশ মুসলিম ঋণ নেন বন্ধু বা মহাজনের কাছ থেকে। সরকারি চাকরি করে মাত্র ১.৫৪ শতাংশ।’
শিক্ষা হলো উন্নতির মূল চাবিকাঠি। শিক্ষার উন্নতি ছাড়া কোনো দেশ, কোনো জাতি এবং কোনো সম্প্রদায় উন্নতি সাধন করতে পারে না। মুসলিমরা সবার চেয়ে পশ্চাদপদ তার প্রধান কারণ হলো তারা শিক্ষায় সব থেকে বেশী পিছিয়ে। শিক্ষায় পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা কীভাবে বাম জামানাতেও অন্য সবার চেয়ে ধীরে ধীরে  পিছিয়ে পড়েছে তার চিত্রটি তুলে ধরেছিল সাচার কমিটি। সেটা এইরূপ:
সারণী
প্রাথমিক স্তর4উচ্চ প্রাথমিক স্তর

5

মাধ্যমিক স্তর

6

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাঁচ বছরে মুসলিমদের শিক্ষার এই করুণ চেহারার কোনও উন্নতি হয়েছে? না, বরং আরও অবনতি হয়েছে। ‘প্রতীচি’র প্রতিবেদন বলছে- মুসলিমদের মধ্যে কেবল ২.৭ শতাংশের স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আছে। ২০১৪ সালের একটি তথ্যে দেখা যাচ্ছে- ‘আইআইএম’ এবং ‘আইআইটি’-তে অবস্থাটা মমতার শাসনকালে আরও করুণ। এই দুটি এলিট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম ছাত্র যথাক্রমে ১.৩% ও ১.৭%। (সূত্রঃ – নতুন গতি, ১৫-২১ ২০১৪)
মুসলমানদের উন্নতির জন্যে সবার আগে দরকার ছিল তাদের শিক্ষার অগ্রগতি ঘটানোর প্রতি মনোনিবেশ করা যা ৩৪ বছর বামপন্থীরা ক্ষমতায় থেকেও করেনি।  বিশেষ মনোনিবেশ করা তো দূরের কথা, এ ক্ষেত্রে বামফ্রন্ট সরকার তাদের প্রতি বৈষম্যই করেছে। এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। স্থানাভাবে শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে কীরকম  বৈষম্য ছিলো তার একটু নমুনা তুলে দিচ্ছি ।  সাচার কমিটি বলেছিলো, ভারতের সবচেয়ে বেশী পিছিয়ে পড়া জেলার সংখ্যা ৯০টি, যার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গেই ছিল ১২টি। আবার এই ১২টি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশী পশ্চাদপদ জেলা মুর্শিদাবাদ, যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ২০০৭ সালের সরকারি তথ্যানুসারে (জনসংখ্যা – ৫৮৬৬৫৬৯ জন, মোট জনসংখ্যার ৬৩.৫% ) মুর্শিদাবাদে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩১৭০টি, এবং পুরুলিয়া জেলায় (জনসংখ্যা – ২৫৩৬১১৬ জন, মুসলিম জনসংখ্যা ৭.১২%)  প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ২৯৭৬টি। সে সময়ের জনসংখ্যার অনুপাতে মুর্শিদাবাদে প্রাথমিক বিদ্যালয় ছিল ১৮৫০ জন মানুষ পিছু একটি এবং পুরুলিয়ায় ছিল ৮৫২ জন মানুষ প্রতি একটি। এই ছিলো বৈষম্যের নগ্নরূপ !  হাই স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিক্যাল কলেজ, আইন কলেজ প্রভৃতি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল আরও প্রকট। উল্টোদিকে বাম সরকার জোর দিয়েছিল মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি যা মুসলিম সমাজের পথে সব চেয়ে বড় অন্তরায়। বামফ্রন্ট যখন ক্ষমতায় আসে তখন সরকার অনুমোদিত হাই মাদ্রাসা এবং সিনিয়র মাদ্রাসার সংখ্যা ছিলো ২৩৮টি, ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেটা বেড়ে হয় ৫০৬টি।
মমতার বন্দ্যোপাধ্যায়র শাসনে কি শিক্ষাক্ষেত্রে মুসলিমদের প্রতি বৈষম্যের অবসান ঘটেছে? না, ঘটেনি। বরং বৈষম্য আরও বেড়েছে। মাটি উৎসব করে, ক্লাবগুলিকে অনুদান দিয়ে ও আরও নানাভাবে হাজার হাজার কোটি কোটি উড়ানো হচ্ছে অথচ মুসলিম অধ্যুষিত পিছিয়ে পড়া জেলা ও অঞ্চলগুলিতে মমতার সরকার স্কুল, কলেজ,  ইউনিভার্সিটি স্থাপন করার কোনও পরিকল্পনা নেয় নি। বরং এসব অঞ্চলে যে স্কুল-কলেজগুলি আছে সেগুলি তুলনামুলকভাবে অধিক রক্তশূন্যতায় ভুগছে অথচ শিক্ষক নিয়োগ করা হচ্ছে না। দুটি দৃষ্টান্ত দেওয়া যাক। এক) ২০১৩ সালের ঘটনা, মেটিয়াবুরুজ কলেজ। স্থায়ী শিক্ষক মাত্র একজন। দুই) দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার ‘ঢোলাহাট মহাবিদ্যালয়’। শুধু  ১৩ জন আংশিক সময়ের শিক্ষক। উল্লেখ্য, এই দুই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা মূলত মুসলিম সমাজের। (সূত্রঃ দৈনিক স্টেটসম্যান, ২রা জুন ২০১৩)
বামফ্রন্ট সরকারের তবু শিক্ষাক্ষেত্রে  মুসলিমদের পশ্চাদপদতার অবসান করার  কিছুটা সদিচ্ছা ছিল। তারা হাই মাদ্রাসার পশ্চাদপদ সিলেবাসের আধুনিকিকরণ করেছে। সিনিয়র মাদ্রাসারও আধুনিকিকরণ  করার জন্যে কিদোয়াই কমিটি গঠন করেছিল। সেই কমিটি ‘আলিম’ (মাধ্যমিকের সমতুল্য), ‘ফাজিল’ (উচ্চ মাধ্যমিকের সমতুল্য), ‘কামিল’ (স্নাতক স্তরের সমতুল্য)  এবং ‘এমএম’ (মাস্টার্সের সমতুল্য) – এর সিলেবাসের আধুনিকিকরণের সুপারিশও করেছিল। বামফ্রন্ট সরকার সে সুপারিশ গ্রহণও করেছিল কিন্তু মুসলিম মৌলবাদীদের প্রবল চাপে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে গিয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকার মুসলিমদের উন্নয়নে যেটুকু সদিচ্ছা দেখিয়েছিল তার ছিঁটেফোঁটাও পরিলক্ষিত হচ্ছে না তৃণমূল কংগ্রেসের সরকারের মধ্যে। তিনি মুসলিম সমাজের ধর্মগুরু মাওলানা, ইমাম, মুফতিদের খুশি করতেই সর্বদা ব্যস্ত। তাঁদের খুশি করতে তিনি ইমাম ও মোয়াজ্জিন ভাতা দিচ্ছেন, হজ হাউসের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন, খারিজি মাদ্রাসার অনুমোদন দিচ্ছেন, হজ যাত্রীদের ভর্তুকি দিচ্ছেন, মুসলিম সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত খারিজি মাদ্রাসা ও মাওলানাদের আড়াল করছেন  এবং মাথায় আঁচল দিয়ে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে গিয়ে মোনাজাত করছেন, সালেমালেকুম দিচ্ছেন, ইনশাল্লাহ ও খোদা হাফেজ বলছেন। এসবই করছেন মুসলমানদের উন্নতির নামে যা মুসলমান সমাজের কোনও উপকারে লাগেনি। ফলে সচেতন মুসলিমদের মধ্যে এ ধারণা প্রকট হয়ে উঠেছে যে মমতা মুসলিমদের  সঙ্গে যতটা ভণ্ডামি ও প্রতারণা করেছেন তেমনটা আর কেউ করেনি।
পরিশেষে একটা কথা বলি, সরকারি বঞ্চনা ও বৈষম্য কিন্তু প্রধান কারণ নয় মুসলিমদের পশ্চাদপদতার। সংখ্যালঘুদের প্রতি বঞ্চনা শুধু এ দেশেই হয় না, এ রোগ ছড়িয়ে রয়েছে  সমগ্র বিশ্বেই। সেই বঞ্চনা সত্ত্বেও এ দেশে খ্রীষ্টান, বৌদ্ধ ও জৈনদের উন্নতি থমকে যায় নি। তারা উন্নতি করতে পারে, মুসলমানরা পারে না কেন? মুসলিমদের আত্মজিজ্ঞাসা ও আত্মসমীক্ষা করে পশ্চাদপদতার আসল কারণ জানতে হবে এবং তা নিরসন করতে তাদের নিজেদেরই প্রধান ভূমিকা নিতে হবে ।