তেলের দাম কেন আজও পিচ্ছিল?

0
Author Image পঙ্কজ কুমার রায় লেখক- অধ্যক্ষ, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী কলেজ।

১৯৮০’র দশকে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে ওপেক-এর ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বর্তমানে পৃথিবীর তেলের চাহিদার ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ওপেক। ২০০৮ সালে বিশ্ব অর্থনীতির বিরাট বিপর্যয় শুরু হয়। তেলের দাম ৪০ ডলার থেকে ১৪৭ ডলারে পৌঁছোয় ও দ্রুত ৪০ ডলারে নেমে আসে।

fuel price hike


বিশ্ব রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে ২০১৪ সালের জুন মাসে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ১১৫ মার্কিন ডলার থেকে নেমে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে দাঁড়ায় ৬০ ডলারে। তেলের দামের এই দোলাচালের পিছনে কয়েকটি কারণ আছে-
প্রথমত-
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাথরের খাঁজে (স্টোন অয়েল) সঞ্চিত বিরাট তেলের ভান্ডারের আবিষ্কার।
দ্বিতীয়ত-
চাহিদা কমা সত্ত্বে‍ও সৌদি আরবের তেল উৎপাদন বাড়িয়ে চলা।
তৃতীয়ত-
পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস সমৃদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতি বিপদে পড়েছে, কেউ কেউ একে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বদলা হিসাবে দেখতে চাইছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার পরেও ভারতে তেলের দাম বাড়ার প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।
কেন্দ্রীয় সরকার তেলের দাম কমার পরেও আমদানি শুল্ক বাড়িয়েছে এবং রাজ্য সরকার ভ্যাট বাড়িয়েছে। ফলে তেলের দাম যতটা কমার কথা ছিল তা না কমে বেড়ে চলেছে। আর তাতেই গেল গেল রব।
ভারতের ব্যবহৃত পেট্রলিয়ামের ৮০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। বিদেশি মুদ্রার ব্যয়ের ২৫ শতাংশের বেশি তেল আমদানিতে ব্যবহৃত হয়। বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারে টান পড়লে টাকা দুর্বল হবে এবং আমদানির অন্য ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে। তেলের দাম কমছে বলে আহ্লাদে আটখানা হয়ে আমরা গাড়ী কিনতে শুরু করেছি। ইতিমধ্যে তেলের চাহিদা ২০১৬-১৭ অর্থবর্ষে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে (পেট্রোল ৮ শতাংশ ও ডিজেল ১.৮ শতাংশ)। দিল্লি, কলকাতা, মুম্বই ও ব্যাঙ্গালোরের দূষণের মাত্রা এমনিতেই সহনসীমা অতিক্রম করেছে। পরিবেশের ভারসাম্য ব্যহত হচ্ছে- অতি সস্তা তেল তাকে আরও বিপদ সঙ্কুল করে তুলবে।
বিভিন্ন রাজ্যে তেলের দামের বৈষম্য ঘটছে ভ্যাটের তারতম্যের কারণে। যেমন- মুম্বইতে পেট্রল ৭৯.৩৯টাকা এবং ডিজেল ৫৮.৭৪টাকা, দিল্লিতে পেট্রল ৭০.৩৯ টাকা প্রতি লিটার এবং ডিজেল ৫৮.৭৪ টাকা প্রতি লিটার।
যদিও টাকা-ডলার বিনিময় দর ধরলে ডিজেল ও পেট্রলের মূল্য দাঁড়ায় ৬৪.০১ টাকা প্রতি লিটার। বলা হচ্ছে, খুচরো দামের অর্ধেক কর হিসাবেই সংগৃহীত হয়ে থাকে। প্রতি লিটার পেট্রলে আমদানি সমতা দর ২৭.৬১ টাকা প্রতি লিটারে, পরিশোধন ও পরিবহণ খরচ ২.৮০টাকা প্রতি লিটার, উৎপাদন শুল্ক ২১.৪৮ টাকা প্রতি লিটারে, যুক্ত মূল্য কর ও সেস ১৪.৯৭ টাকা প্রতি লিটার এবং ডিলার কমিশন ৩.৫৭ টাকা প্রতি লিটারে। অন্যদিকে, প্রতি লিটারে ডিজেলের আমদানি সমতা দর ২৭.৫১ টাকা প্রতি লিটার, পরিশোধন ও পরিবহণ খরচ ২.৮০ টাকা প্রতি লিটার, উৎপাদন শুল্ক ২১.৪৮ টাকা প্রতি লিটারে, যুক্তমূল্য কর ও সেস ১৪.৯৭ টাকা প্রতি লিটার এবং ডিলার কমিশন ৩.৫৭ টাকা প্রতি লিটারে। অন্যদিকে প্রতি লিটার ডিজেলের আমদানি সমতা দর ২৭.৫১ টাকা প্রতি লিটার, পরিশোধন ও পরিবহণ খরচ ২.৭৮টাকা প্রতি লিটার, উৎপাদন শুল্ক ১৭.৩৩ টাকা প্রতি লিটার, যুক্তমূল্য কর ‍ও সেস ৮.৬৯টাকা প্রতি লিটার এবং ডিলার কমিশন ২.৫০ টাকা প্রতি লিটার। সুতরাং পেট্রলের দাম ৭০.৪৩টাকা প্রতি লিটার ধরলে কর উৎপাদন প্রতি লিটারে ৩৬.৪৫ টাকা এবং ডিজেলের ৫৮.৮০ টাকা প্রতি লিটার দামের ক্ষেত্রে কর উৎপাদন ২৬.০২ টাকা। আমাদের দেশের রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে পেট্রলিয়াম থেকে সংগৃহীত কর বিরাট ভূমিকা পালন করে। আবার গত দশ বছরে পেট্রলে সাবসিডি ৮,৫০,০০০টাকা এবং পেট্রল থেকে সংগৃহীত কর ৪,৬৩,৯৮৯ কোটি টাকা। এছাড়াও পেট্রলের সংগৃহিত করের ৪২ শতাংশ রাজ্যগুলি পেয়ে থাকে।
আমাদের দেশে রাজনীতি অর্থনীতির আগে স্থান পায়। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক উন্নয়ণ (Sustainable Economic Development) হিসাবে বিবেচিত হয় না। বিরাট জনসংখ্যার ভোগমুখী অর্থনীতি ভবিষ্যতে বিপর্যয় এনে দিতে পারে-তাই অতিরিক্ত করের মধ্যে দিয়ে ভোগের নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যতের জন্য বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয় বজায় রাখা বিবেচক সরকারের কাজ হিসাবেই বিবেচিত হবে।
আগামী দিনে আন্তর্জাতিক তেলের দাম তলানিতে থাকবে না। সেক্ষেত্রে আমাদের লাগামহীন পেট্রল ও ডিজেলের ব্যবহার ভবিষ্যতে অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতিকে দূষিত করবে। তেল ব্যবহারে সংযম দূষণমুক্ত সমৃদ্ধ ভারতের পথে একধাপ হিসাবেই বিবেচিত হবে। সৌর বা বায়ু বিদ্যুতের মতো শক্তির উৎস সম্পর্কে গবেষণায় কর থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যয় হলে ভবিষ্যতে দূষণহীন অর্থনীতির জন্ম হবে। এই পৃথিবীর শিশুর বাসযোগ্য হোক- এই অঙ্গীকার আমাদেরই করতে হবে, ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করে। শুধু পেট্রল-ডিজেলের দাম কমলেই অর্থনীতি মজবুত হবে, অন্যথা নয়, এই অতিসরলীকরণ ব্যাখ্যার আগে অগ্র-পশ্চাৎ বিবেচনা জরুরি হয়ে পড়েছে। আমাদের সমস্যা হল, আমরা একই সময় ভর্তুকি চাই, তেলের দাম কম চাই, রাজ্যের করভাগ বেশি চাই, বিদেশি পণ্যের ব্যবহার চাই ও স্বাবলম্বী ভারত চাই!  তা কি সত্যিই সম্ভব? আমাদেরই ভেবে দেখতে হবে।