পূর্ববাংলার বাস্তুহারাদের জন্য এই রাজ্যে কেউ পনেরো মিনিটের বনধ্ও ডাকেনি

তথাগত রায়ের ‘যা ছিল আমার দেশ’ গ্রন্থের একটি অংশ

0
East Bengali Refugees

আমাদের এই ভারতভূমিতে ব্রিটিশের অত্যাচার এবং তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনী আমরা লেখায়, রেখায়, ছবিতে অমর করে রেখেছি। জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের নাইট উপাধি ত্যাগ, বাংলার বিপ্লবীদের, পাঞ্জাবের ভগৎ সিং, শুকদেব, রাজগুরু’দের আত্মত্যাগ আমরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। মহাত্মা গান্ধী থেকে আরম্ভ করে নেতাজী সুভাষচন্দ্র, সূর্য সেন, ক্ষুদিরাম, কানাইলাল, ভগৎ সিং সকলের নামে আমরা মাথা নোয়াই, কারণ এঁরা ঔপনিবেশিক শক্তি ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ভারতীয় জনগণের হয়ে লড়াই করেছেন।
মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, বিশেষত জাতি বা ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যাঁরা লড়াই করেছেন এবং যাঁদের মধ্যে অনেকে জীবন বলি দিয়েছেন তাঁদের অনেকেই আজ বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত- যার নাম নোবেল পুরস্কার। এঁদের তালিকাটি ছোট নয়। এঁদের মধ্যে আছেন পূর্বোক্ত মার্টিন লুথার কিং এবং নেলসন ম্যান্ডেলা। আরও আছেন অ্যালবার্ট লুথুলি, বিশপ ডেসমন্ড টুটু, বরিস পাস্তেরনাক, আলেকজান্দার সলঝেনিৎসিন, আদ্রেই শাখারভ, লেষ ভালেসা এবং আউং সান সু চি।
কেউ কখনও বলে না এই সব কথা প্রকাশ্যে আলাচনা করা উচিত নয়। কেউ বলে না এই সব নিয়ে চর্চা করলে জার্মান ও ইহুদীর মধ্যে, তুর্কি ও আর্মেনিয়ানের মধ্যে, চেক ও জার্মানের মধ্যে, শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গের মধ্যে, ভারতীয় ও ব্রিটিশের মধ্যে দাঙ্গা লেগে যেতে পারে।
কেউ বলে না, এসব প্রাচীন কথা ভুলে যান, কেউ বলে না Forgive and forget, let’s bury the hatchet ইত্যাদি। বলে না কারণ এসব কথা ইতিহাস। ইতিহাস ভুলে যাবার বা ভুলিয়ে দেবার অপচেষ্টা ঘৃণ্য, ন্যাক্কারজনক, দূরভিসন্ধি-প্রণোদিত। ইতিহাস লেখা এবং চর্চার সঙ্গে ভুলে যাবার কোনও সম্পর্ক নেই, ইতিহাস লিখলে দাঙ্গা হবে এটি একটি অত্যন্ত মূঢ এবং হাস্যকর কথা। অথবা চরম মতলববাজির কথা। এই বিষয়ে স্পেনীয় দার্শনিক জর্জ সান্তাইয়ানার উক্তি আগেই বলা হয়েছে, আবার পুনরুক্তি : ‘‘যারা ইতিহাস ভুলে যায় তাদের কপালে আছে আবার সেই ইতিহাসের কবলে পড়ে যন্ত্রণা পাওয়া’’।
এবার দেখা যেতে পারে উপরিউক্ত পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববাংলায় হিন্দুর উপর অত্যাচার ও নির্যাতন আমরা কি দৃষ্টিতে দেখি।
পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে যাঁরা কলা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সঙ্গীত, চিকিৎসাবিদ্যা, আইন, খেলাধূলা, রাজনীতি, প্রশাসন বা আরও অনেক ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছেন তাঁদের অন্ততঃ পঞ্চাশ শতাংশ এবং বহু ক্ষেত্রে আরও বেশি মানুষের আদিনিবাস ছিল পূর্ববাংলায়। অনেকের জন্মই পূর্ববাংলায়- ব্রিটিশ, পাকিস্তানী বা বাংলাদেশী আমলে অত্যাচারের কবলে পড়ে বা অত্যাচারিত হবার আশঙ্কায় ভারতে চলে এসেছেন। শুধু একটা উদাহরণ দিলেই যথেষ্ট হবে। আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে আটজন মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন- তাঁদের মধ্যে পাঁচজন পূর্ববঙ্গীয় অর্থাৎ প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, সিদ্ধার্থশংকর রায়, জ্যোতি বসু এবং বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। বাকি তিনজনের মধ্যে বিধানচন্দ্র রায় প্রবাসী বাঙালি, অজয় মুখোপাধ্যায় ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গীয়। এরা ছাড়াও বেশ কিছু প্রথম শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতারা, যাঁদের পূর্ববাংলায় জন্ম, যেমন প্রমোদ দাশগুপ্ত, শৈলেন দাশগুপ্ত, প্রশান্তকুমার শূর প্রভৃতি পূর্ববঙ্গীয় ভাষায় বা পূর্ববঙ্গীয় টানে কথা বলতেন। কিন্তু পূর্ববাংলা থেকে আগত অত্যাচারিত হিন্দুদের, তা তাঁরা সমাজের অগ্রগণ্য মানুষই হোন বা নাম-না-জানা অগণিত মানুষের একজন হোন, ইতিহাসবোধ গিয়ে জমা হয়েছিল শুধু একটি বিন্দুতে : ইস্টবেঙ্গল নামের একটি ফুটবল দলের সমর্থনে। একথা পর্যন্ত কারুকে বিচলিত করেনি যে ওয়েস্ট বেঙ্গলে থেকে কেন তাঁরা ইস্টবেঙ্গলকে সমর্থন করছেন!
এই সব মানুষ, তা তাঁরা সরাসরি মুসলমানের অত্যাচারে বা অত্যাচারের ভয়ে বিতাড়িতই হোন বা এই লেখকের মতো হোন যাদের পরিবার দেশভাগের আগেই পশ্চিমবঙ্গে ছিলেন এবং কখনও ফিরে যাননি, বা অত্যাচারিত পরিবারের পশ্চিমবঙ্গে জাত সন্তান-সন্ততিই হোন, তাঁদের ইতিহাসটা পুরোপুরি ভুলে মেরে দিয়েছেন। এ জিনিস বাকি পৃথিবীর কাছে সম্পূর্ণ অজানা, অবোধ্য, অচিন্তনীয়। ন্যূনপক্ষে আশা করা যেত যে এই বাস্তুচ্যুতি নিয়ে আলোচনা হবে, বই প্রবন্ধ লেখা হবে, গবেষণা হবে, বিতর্ক হবে, হিন্দুরা যে সম্পত্তি সীমান্তের ওপারে ফেলে আসতে বাধ্য হয়েছে তাকে ফিরিয়ে দেবার বা তার জন্য ক্ষতিপূরণ দেবার দাবি উঠবে। সেই দাবি ভারত-পাকিস্তান বা ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনার একটা মুখ্য বিষয় হবে।
আশ্চর্যের বিষয়, এর কিছুই হয়নি।
তার পরিবর্তে এই প্রসঙ্গে একটা অদ্ভূত থমথমে নীরবতা বিরাজ করছে। এই নিয়ে কোনও ড্রইংরুমে আলোচনা হয় না, বিতর্ক হয় না, লেখালেখি হয় না। বিষয়টা যদি কোনওভাবে কথায় কথায় উঠে পড়ে তবে লোকে অস্বস্তিতে ছটফট করতে থাকেন, বিষয়ান্তরে যাবার জন্য ব্যগ্র হন, চলেও যান। এই বিষয়ে বইপত্র ডাইনোসরের ডিমের মতোই বিরল- যে কটি ছিল সে কটি বহুকাল ‘আউট অফ প্রিন্ট’।

JA CHILO AAMAR DESH

এই বিচিত্র আচরণ দেখে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো আদৌ অন্যায় হবে না, যে এই ইতিহাস ভুলিয়ে দেবার জন্য এবং ভুলে যাবার সপক্ষে যুক্তি খাড়া করার জন্য একটা সংঘবদ্ধ, সম্মিলিত, দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা বিদ্যমান থেকেছে। বাঙালি হিন্দুর আর যাই দোষ থাক, তারা যে অত্যাচারের বিপক্ষে সোচ্চার হয় তা সবাই জানে। ব্রিটিশ আমলে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে যেমনি হয়েছিল তেমনি স্বাধীনতা-উত্তরকালে ভিয়েতনাম, ইরাক ইত্যাদিতে মার্কিন হানার বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছে (যদিও হাঙ্গেরি (১৯৫৬) এবং চেকোস্লোভাকিয়া (১৯৬৮)তে সোভিয়েত হানার বিরুদ্ধে হয়নি)। কলকাতার হো চি মিনের মূর্তি আছে, মার্কিন দূতাবাসের রাস্তার নাম জেনে বুঝে হো চি মিনের নামে রাখা হয়েছে, চে গুয়েভারার ছবি আঁকা গেঞ্জি পরে ছেলেমেয়েরা ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু ব্যতিক্রম নিজেদের উপর অত্যাচার- পূর্ব পাকিস্তানে ও বাংলাদেশে হিন্দুর উপর মুসলিমের অত্যাচার। মিশর, ভিয়েতনাম, ইরাক, প্যালেস্টাইন ইত্যাদি নিয়ে কত সভাসমিতি, কত নাটক, কত মিছিল হয়েছে। কিন্তু পূর্ববাংলা থেকে এক কোটির উপর স্বজাতীয়ের বাস্তুচ্যুতি, হত্যা, ধর্ষণের প্রতিবাদে কেউ পনেরো মিনিটের বনধ্ও ডাকেনি।
কেন এই বিচিত্র, অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ?

#EastBengali #Refugees