চিন সীমান্তের কাছে সুদীর্ঘ সেতু উদ্বোধন, সামরিক-অর্থনৈতিক ভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ

সুবীর ভৌমিক

0
Dhola Sadiya bridge
ধলা-শদিয়া সেতুতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ছবি সৌজন্যে পিএমও।

লোহিত নদীর উপর নির্মিত দীর্ঘতম সেতুটি (৯.১৫কিমি./ ৫.৬৮ মাইল) উদ্বোধন করল ভারত সরকার। বিরোধপূর্ণ অরুণাচল প্রদেশ এবং অসমের মধ্যে এই সেতুটি সহজেই এবার সংযোগ রক্ষা করবে।
চিন অরুণাচল প্রদেশকে নিজের বলে দাবি করে এবং এটিকে “দক্ষিণ তিব্বত” হিসাবে উল্লেখ করে।
সম্প্রতি তিব্বতীয় ধর্মগুরু দালাইলামার অরুণাচল সফরের তীব্র বিরোধিতা করে বেজিং এবং ওই রাজ্যে সামরিক পরিকাঠামো তৈরির কাজে জোর দেওয়ার বিরুদ্ধেও তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
আরও পড়ুন: দালাই লামা, অরুনাচল ও ভারত-চিন সম্পর্ক
কিন্তু ভারতের এগুলি করার সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে।
অরুণাচলের ভূমিপুত্র ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘চিন যখন আরও বেশি করে আগ্রাসী মনোভাব দেখাচ্ছে, তখন আমাদেরও দেশকে রক্ষা করার জন্য পরিকাঠামোগত উন্নয়ন জোরদার করতে হবে’’।
এর আগে রিজিজু বলেছিলেন, ‘‘অরুনাচল ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। এর কোনও পরিবর্তন হবে না। এই সত্যটা কেউ পছন্দ করুক বা না করুক’’।
সদ্য উদ্বোধন হওয়া এই ‘ধলা-শদিয়া সেতু’টির কাজ শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে।
‘‘এই সেতু নির্মাণের কাজটি বেশ কঠিন ছিল, কারিগরী দিক থেকে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, ফলে কাজের গতি কিছুটা বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল’’- ‘নবযুগ ইঞ্জিনিয়ারিং’ সংস্থার (এই সংস্থাই সেতুটি তৈরি করেছে) এক আধিকারিক এই কথা জানিয়েছেন।

Dhola Sadiya bridge

যাই হোক নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজটি শেষ হয়েছে।
এর সঙ্গে সঙ্গে ভারী বিমান অবতরণের আরেকটি প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এই প্রকল্পটি ভারতের বিমান পরিবহনের ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অবসরপ্রাপ্ত সেনা আধিকারিক জেনারেল গগনজিৎ সিং বলেন- ‘‘চিনের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে আমাদের সেনাবাহিনীর দ্রুত যাতায়াতের জন্য এবং সেনাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার জন্য সঠিক পরিকাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন। ফলে এই সেতুটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ’’।
তিনি আরও বলেন, ‘‘১৯৬২র যুদ্ধের পর গত দু’দশক ধরে অরুণাচল প্রদেশে কোনও পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ হয়নি। কিছু নির্বোধ মনে করত, এখানে কোনও ভাল রাস্তা তৈরি হলে, চিন যদি ফের আক্রমণ করে তাহলে তাদের সেনা জওয়ানরা সেটাকে কাজে লাগাবে! কিন্তু এবার আমরা সঠিক পথে এগোচ্ছি’’।
দীর্ঘ চিন সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির বাহ্যিক পরিকাঠামোগত উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং।
রাজনাথ সিং সম্প্রতি ‘ইন্দো-তিবেটিয়ান বর্ডার পুলিশ’-এর(যারা চিন সীমান্ত পাহারার দায়িত্বে রয়েছে) এক অনুষ্ঠানে বলেন- ‘‘আমরা শান্তি চাই, কিন্তু সেটা সম্মানের সঙ্গে। আমরা দুর্বল, এরকম ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে যেন কেউ না থাকে’’।
আরও পড়ুন: চিন, পাকিস্তান ও মোদীর বিদেশনীতি
ইতিমধ্যেই ভারত দুটি পার্বত্য শাখা তৈরি করেছে, যারা সীমান্তে চিনা হামলা প্রতিহত করছে।
জেনারেল গগনজিৎ সিং বলেন, ‘‘কিন্তু ভাল রাস্তা বা সেতু না থাকলে সেনাবাহিনী দুর্বল হয়ে পড়বে, তাদের কাছে দ্রুত সামরিক সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় রসদ পৌঁছে না দেওয়া গেলে যুদ্ধক্ষেত্রে কখনওই সাফল্য আসবে না’’।
সেনাবাহিনীর একজন ইঞ্জিনিয়ার একান্ত আলাপচারিতায় বলেন, সদ্য উদ্বোধন হওয়া ঢোলা-সাদিয়া সেতুর উপর দিয়ে যুদ্ধে ব্যবহৃত ৬০টন ওজনের ট্যাঙ্ক সহজেই যাতায়াত করতে পারবে।
ফলে উত্তরপূর্ব ভারতের এই অঞ্চলের মানুষ সেতুটি চালু হওয়ায় খুব খুশি।
যেমন, স্থানীয় বাসিন্দা গুঞ্জন সাহারিয়া বলেন, ‘‘এটা একটি অকল্পনীয় বিষয় যে এই সেতুটি ছটি নদীর সংযোগস্থলের উপর দিয়ে গেছে, সব নদীগুলিই ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে’’।
অসমের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনওয়াল বলেন, ‘‘আমি কথা দিচ্ছি, এই সেতুটি কেবলমাত্র সামরিক কাজেই ব্যবহৃত হবে না, এটি অসম এবং অরুণাচলের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলির আর্থিক বিকাশেও সহায়ক হবে এবং বড় সংখ্যক পর্যটকদের আকর্ষিত করবে’’।
এই সেতুটি তৈরির ফলে নদীর দু’প্রান্তের মানুষদের যাতায়াতের সময় আট ঘণ্টা কমে যাবে।
আর সে কারণেই শদিয়ার বাসিন্দা ডিম্বেশ্বর গগৈ আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন- ‘‘এই সেতু সেনাবাহিনীর জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের কাছেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ’’।
লেখক- প্রবীণ সাংবাদিক BBC, ” Insurgent Crossfire” (1996) বইটির লেখক।