ঢাকেশ্বরী মন্দির বাংলাদেশের বহু বিবর্তনের নীরব সাক্ষী

সুমন গুপ্ত

0
dhakeshwari temple

শস্যশ্যামলা বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার জগদ্বিখ্যাত শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মন্দির।
সূর্য তখন অস্তাচলে। প্রশস্ত মন্দির প্রাঙ্গণে প্রবেশের মুখেই বড় একটি শিবমন্দির। এই শিবমন্দিরের একপাশে দু’বিঘা পুষ্করণীর এক কোণে প্রায় একশো বছরের পূর্ণবয়স্ক এক অশ্বথ্থগাছের ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি দেয় বিদায়ী সূর্য। বিদায়বেলায় দিনমণির রাঙা নরম আলোয় প্রাচীন জাগ্রত এই দুর্গামন্দিরের গোলাপি রঙের মূল গর্ভদেউল অবর্ণনীয় এক মায়াবী আলোয় উদ্ভাসিত। লতাপাতা ও নানা কারুকার্যে সজ্জিত গর্ভদেউলের লাগোয়া বড়সড় নাটমন্দিরের কোথাও ওই মায়াবী আলোয় খানিকটা তখন চুঁইয়ে পড়ছে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সূর্যাস্তের ঢাকেশ্বরী মন্দির দেখে দু’চোখ ভরে ওঠে। ঢাকার ঈশ্বরী এই দুর্গা মাতা। শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী নামে তিনি পূজিতা।
সেই মুহূর্তে নাটমন্দিরে তেমন ভিড় ছিল না। ভিড় বাড়বে সন্ধ্যার পর। সন্ধ্যারতির সময়। নাটমন্দিরে মহিলা ভক্তের ভিড় তখন চোখে পড়ার মতো। হঠাৎ গোধূলিবেলায় শ্রীমতী অঞ্জলি রানি দত্তের সঙ্গে পরিচয়। যিনি গর্ভদেউলের ছিমছাম বারান্দায় বসে দু’চোখ বুজে অস্ফুটে দুর্গানাম জপ করছিলেন। শীর্ণকায়া ভদ্রমহিলার দুটো হাত কোলের কাছে জড়ো করা। সেই মুহূর্তে শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মা’কে দর্শনের জন্য আমিও এসেছিলাম।
গর্ভগৃহের সেগুন কাঠের কারুকার্য করা দুটো বড় কাঠের দরজা খোলা। ভেতরে কয়েক হাত দূরে রুপোর সুবৃহৎ সিংহাসনে একচালা অষ্টধাতুর অনিন্দসুন্দর অসুরদলনী মা দুর্গা। সঙ্গে লক্ষী, সরস্বতী, কার্তিক ও সিদ্ধিদাতা গনেশ। পদ্মফুল ও বিচিত্র কারুকার্যে সমৃদ্ধ পিতলের চকচকে চালচিত্রটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
চালচিত্রের একদম উপরিভাগে ঠিক মাঝখানে ধ্যানমগ্ন মহাদেবের একটি ছোট বিগ্রহ। চালচিত্রের পিছনদিকে দামি ভেলভেটের কাপড় টাঙানো।
সিংহাসনের পাশে বসে রয়েছেন এই মন্দিরেরই এক পূজারি। যাঁরা পুজো দিতে আসছেন, নাম-গোত্র জেনে তাঁদের পুজো করিয়ে দিচ্ছেন তিনি। মাতৃদর্শনের পর কোনও ভক্ত সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করছেন।
নানা অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিতা দক্ষিণমুখী দুর্গামূর্তির উচ্চতা বেশি নয়, প্রায় আড়াই ফুট। পরনে লালা রেশম বস্ত্র। নানা রত্নালংকারে সশোভিতা। আলুলায়িত কেশরাশি। মাথায় বহুমূল্য স্বর্ণমুকুট। স্বর্ণমুকুটের ওপরে রুপোর ছত্র। অসুরদলনী হলেও মায়ের মুখমন্ডলে ক্রোধের প্রকাশ নেই। বরং জগজ্জননীরূপে তিনি পরম করুণাময়ী।

dhakeshwari devi

গর্ভগৃহের সামনে দু’দণ্ড করজোড়ে দাঁড়ালেই ত্রিনয়নী শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরী মাতার করুণার স্পর্শ বুঝি অনুভব করা যায়। ভক্তমন অজান্তেই গুনগুনিয়ে ওঠে- ‘ত্রিনয়নী দুর্গা, তোর রূপের সীমা পাই না খুঁজে…।’
মায়ের ডানদিকের ত্রিশূলধরা হাতে একজোড়া শাঁখা পরানো। লক্ষী, সরস্বতী, কার্তিক এবং গনেশের মাথায় স্বর্ণমুকুট। প্রচুর পদ্মফুল, জবাফুল ও গাঁদাফুলে ঢাকা রয়েছে শ্রীশ্রী ঢাকেশ্বরীর বেদিতল। সিংহাসনের ভেতরেই দু’পাশে ভাঁজ করা অনেকগুলো তাঁতের শাড়ি। সিল্কের শাড়িও কয়েকটা। মাকে পুজো দিতে এসে অনেক ভক্তই সঙ্গে করে শাড়িগুলো আনেন। আলতা-সিঁদুরও দেন। পরে শাড়ি ও আলতা-সিঁদুর ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করে দেওয়া হয়। অবশ্য ঢাকেশ্বরী মা’কে নিবেদন করা কোনও শাড়ি পেতে হলে মোটামুটি একটা দাম দিয়ে ভক্তকে তা কিনে নিতে হয়।
গর্ভগৃহে ঢাকেশ্বরী দেবীর ডানদিকে সেগুন কাঠের সুদৃশ্য সিংহাসনে আসীন ভোলা মহেশ্বর। মাথার ওপর সেগুন কাঠের ছত্র। অষ্টধাতুর মূর্তিটি এককথায় চমৎকার। ২০০৫ সালে শিবমূর্তিটি স্থাপিত হয়। আগে মায়ের পাশে সুউচ্চ শিবলিঙ্গ ছিল। ঢাকেশ্বরী দেবীর বাঁদিকে একইরকম কাঠের সিংহাসনে কাঠের ছত্রের নীচে শোভা পাচ্ছে শ্রীবাসুদেবের মূর্তি। এই মুর্তিটিও অষ্টধাতুর। আগে শালগ্রাম শিলা পূজিত হত। শিব ও বাসুদেবের পাশে অন্য দুটো প্রকষ্ঠে শিবলিঙ্গ রয়েছে। একটি প্রকষ্ঠে শিবলিঙ্গের পাশেই শ্রীশ্রীসন্তোষী মাতার পুজো হয়।
গর্ভদেউলের বারান্দার ডানদিকে লম্বা কাচের বাক্সে ধনুর্ধারী শ্রীরামচন্দ্রের পূর্ণায়ব মূর্তি। বাঁদিকে আরেকটি সম-আকৃতির কাচের বাক্সে পবনপুত্র শ্রীহনুমানজি।
এই মন্দিরে পুজোর পর পুজারির দক্ষিণার টাকা গর্ভগৃহের দরজায় রাখা প্রণামীর বাক্সে দেওয়ার নিয়ম। এখানকার কোনও পুজারিই ভক্তদের কাছ থেকে সরাসরি দক্ষিণা নিতে পারেন না। কারণ, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রধান হলেন এক সেবাইত। তিনিই মন্দিরের সমস্ত আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করেন। পূজারিরা সেবাইতের বেতনভুক কর্মী। প্রণামীর বাক্সের সামনে মায়ের চরণামৃত রয়েছে একটি তামার পাত্রে। তাতে একটি ছোট তামার চামচ। যে কেউ ইচ্ছামতো নিতে পারেন এই চরণামৃত।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পাণ্ডাপ্রথা বলে কিছু নেই। তার ফলে পুজো দিতে গিয়ে পাণ্ডাদের জন্য অযথা হয়রানির শিকার হতে হয় না দর্শনার্থীদের। শুধু ঢাকেশ্বরী নয়, প্রায় একমাস ধরে কয়েকটি ৫১ পীঠসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা যেসব মন্দির দর্শন করেছিলাম, কোথাও পাণ্ডাদের উপস্থিতি বা উপদ্রব আমার চোখে পড়েনি।
হঠাৎ লক্ষ করলাম, দুর্গানাম যিনি জপ করেছিলেন তিনি চোখ খুলে পাশে রাখা একটা থলে থেকে একটুকরো লাল কাপড়ে জড়ানো কিছু একটা বার করলেন। বেশ যত্ন করে জড়ানো কাপড়টা খুলতেই দেখলাম, একটা বই। বইটা খুলে এবার অস্ফুটে নয়, বরং একটু জোরেই দুর্গাস্তব পাঠ করতে লাগলেন-
‘নমস্তে শরণ্যে শিবে সানুকল্পে, নমস্তে জগদ্ব্যাপিকে বিশ্বরূপে।
নমস্তে জগদ্বন্দ্যপাদারবিন্দে, নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দূর্গে।।
নমস্তে জগচ্চিন্ত্যমানস্বরূপে, নমস্তে মহাযোগিনী জ্ঞানরূপে।
নমস্তে সদানন্দনন্দস্বরূপে, নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।।’
একসময় তাঁর পাঠ শেষ হতেই ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘মাসিমা আপনি বোধহয় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মাঝেমাঝেই আসেন? কী সুন্দর দুর্গাস্তব পাঠ করলেন!’
তিনি স্মিতহেসে বললেন, ‘না বাছা, এ আইর এমন কী। এ নিয়ে তৃতীয় দফা ‍আইলাম এহানে।’
বরিশাল জেলায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি। বাড়ি বরিশালে হলেও ভদ্রমহিলার উচ্চারণে বরিশালের তেমন টান নেই। আমার কথাবার্তা শুনে সম্ভবত বাংলাদেশি নই তা আন্দাজ করতে পেরেই বইটা বন্ধ করে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোথা হইতে আসছ বাছা?’ বললাম ‘কলকাতা। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাগ্রত মন্দির নিয়ে বিস্তারিত লেখালেখির জন্য এসেছি। আপনাদের দেশের অনেকগুলো জায়গায় ঘুরে দনকয়েক হল ঢাকায় এসেছি। এখান থেকে কলকাতায় ফিরব।’
এবার ভদ্রমহিলা খুব খুশি হয়ে বললেন,’লিখো বাছা, আমাদের সব মন্দির নিয়া হাত খুইল্যা লিখো। এ’দেশের হিন্দুরা কেমন আছে নিজের চক্ষে সব দেইখ্যা যাও। আমাগো দুঃখকষ্টের কথা লিখতে কিন্তু ভুইল্যো না। ঢাকেশ্বরী মায়ের আশীর্বাদে ঠেকবা না কিছুতে।’
সন্ধ্যা সাতটায় ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সন্ধ্যারতি শুরু হল। নাটমন্দিরে সুমধুর ঢাকের বোল, কাঁসর-ঘণ্টার পবিত্র ধ্বনি মন্দির প্রাঙ্গণ ছড়িয়ে ক্রমশ চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। মাথার ঘোমটা, কপালে সিঁদুর, হাতে শাঁখা-পলা পরা ধর্মপ্রাণ হিন্দু মহিলাদের শঙ্খ ও উলুধ্বনিতে চারপাশে তখন এক ভক্তিময় পরিবেশ রচিত হয়ছে।
গর্ভদেউলের বারান্দায় ঝাড়বাতির গায়ে নিয়ন আলো এসে ঠিকরে পড়ায় চিকচিক করছে। ঝাড়বাতির খানিকটা তফাতে সাঁইসাঁই করে একটা সিলিং ফ্যান ঘুরছে। একটা দেওয়াল ঘড়িও আছে। ১২টি গোলাকৃতি স্তম্ভের ওপর লম্বা-চওড়া নাটমন্দিরের সিলিং-এর উচ্চতা যথেষ্টই। অনেকগুলো সিলিং ফ্যান ঝুলছে।
নাটমন্দিরের প্রবেশদ্বারে সিলিং থেকে একটা বড় পিতলের ঘণ্টা ঝুলছে। গর্ভদেউলে আসা-যাওয়ার পথে অনেক দর্শনার্থীই ঘণ্টাটি বাজান। বড় বড় সবুজ দামি টাইলসে ঢাকা নাটমন্দিরের মেঝে, এক জায়গায় সামান্য উুঁচু হয়ে দক্ষিণ বরাবর চলে গিয়েছে।
নাটমন্দিরের এক কোনে বসেছিলাম। গর্ভদেউলে ঢোকার মুখেই যে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা লাগানো রয়েছে, সেটা এপাশ-ওপাশ ঘুরছিল। নাটমন্দির থেকে সরাসরি প্রাচীর দেওয়া প্রাঙ্গণের অনেকখানি দৃশ্যমান। দেখলাম, বোরখা পরা চারজন মুসলমান মহিলা নাটমন্দিরের দিকে হেঁটে আসছেন। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের একমাত্র সেবাইত প্রবীণ ভদ্রলোক প্রদীপ কুমার চক্রবর্তীর মুখে আগেই শুনেছিলাম এই মন্দিরে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে জাতপাত বলে কিছু নেই। যে কোনও ধর্মের মানুষ এখানে আসতে পারেন।
সময় ও বাংলাদেশের অস্থির সামাজিক প্রেক্ষাপট সম্যক বিবেচনা করে নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, ঢাকেশ্বরী সমগ্র বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্বপ্রধান মন্দির হিসেবে আজ এক অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত। যদিও এখন‍ও পর্যন্ত সরকারি গেজেটে উল্লেখ নেই, তবু‍ও বেসরকারিভাবে ঢাকেশ্বরী বাংলাদেশের ‘জাতীয় মন্দির’ হিসেবে স্বীকৃত।
মন্দিরের সিংহদ্বারটি নওবতখানা তোরণ নামে প্রসিদ্ধ। এখানে গ্লো-সাইন বোর্ডে ‘জাতীয় মন্দির’ লেখা শব্দদুটো জ্বলজ্বল করছে। মন্দিরটি সমাজের বহু বিবর্তনের নীরব সাক্ষী। হিন্দু সম্প্রদায়ের ঐক্যবোধের চেতনা এই মন্দিরকে ঘিরেই আরও শক্তিশালী হয়েছে।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের অন্যান্য মন্দিরের সঙ্গে ঢাকেশ্বরীর তফাত হচ্ছে, স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে প্রায় চার দশক ধরে ঢাকেশ্বরীকে ঘিরে সমানাধিকার ও সমমর্যাদার দাবিতে বারবার সোচ্চার হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়। দুঃখের কথা যা আজও অধরা।

লেখক- প্রবীণ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।