দালাই লামা, অরুনাচল ও ভারত-চিন সম্পর্ক

0
Author Image সুবীর ভৌমিক লেখক- প্রবীণ সাংবাদিক BBC, " Insurgent Crossfire" (1996) বইটির লেখক।

সম্প্রতি দালাই লামার অরুনাচলপ্রদেশ সফর ঘিরে ভারত-চিন সম্পর্কের অবনতি উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দালাই লামা ১৯৮৩ সাল থেকে ২০০৯-এর মধ্যে ছ’বার অরুনাচলপ্রদেশ সফরে এসেছিলেন, তাহলে বেজিং এখন কেন এত হতাশ!
Dalai Lama
India-China relations and Dalai Lama.
বেজিং দালাই লামার এবারের এই সফর নিয়ে যতটা হতাশ, তার থেকে বেশি হতাশ দালাই লামার সফর সঙ্গী ভারতের স্বরাষ্ট্র দফতরের প্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু’কে নিয়ে, যিনি বেজিংয়ের উদ্দেশ্যে বলেন-‘‘ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে চিন বরং নিজেদের বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুক।’’
রিজিজু’র উস্কানিমূলক টুইট মাঝেমধ্যেই তাঁর ‘বস’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অস্বস্তিতে ফেলে।
কিন্তু রিজিজু দালাই লামার সফর নিয়ে চিনের উদ্দেশ্যে যা বলেছেন (ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে চিন বরং নিজেদের বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করুক।) তাতে নরেন্দ্র মোদীর সম্পূর্ণ অনুমোদন রয়েছে।
তা না হলে তিনি এতটা আক্রমণাত্মক হতেন না, তিনি এবং অন্য ছোট নেতারা দালাই লামার এই সফরকালে নীরবতা অবলম্বন করতেন। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
অরুনাচলের মুখ্যমন্ত্রী পেমা খান্ডু, যিনি এখন কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপি’তে যোগ দিয়েছেন (রিজিজু’র মতোই), তিনি তো আরও এক কদম এগিয়ে মন্তব্য করেছেন।
তিনি বলেন, ১৪তম দালাই লামা’র আন্দোলন নিয়ে দিল্লিকে হুমকি দেওয়ার কোনও অধিকারই চিনের নেই, ভারত তিব্বতের সঙ্গে সীমান্ত বিনিময় করে কিন্তু চিনের সঙ্গে নয়।
পেমা খান্ডু সংবাদমাধ্যমে বলেন, ‘‘আমার সোজা বক্তব্য, চিনের কোনও অধিকার নেই আমরা কি করব আর না করব তার নির্দেশ দেওয়ার, কারণ তারা আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী নয়।’’
এই ধরনের বক্তব্য যথেষ্ট উষ্কানিমূলক। খান্ডু মনে করেন তিব্বতেরও তাইওয়ানের মতো স্বাধীন সত্ত্বা আছে।
আরও পড়ুন : চিন, পাকিস্তান ও মোদীর বিদেশনীতি
তাই ভারত দালাইলামার এই সফরকে কাজে লাগিয়ে চিনকে খোঁচা দিতে চেয়েছে তিব্বতের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে টেনে এনে।
চিনের বিদেশ দফতরের মুখপাত্র পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, যে বিষয়গুলিকে তারা সবচাইতে বেশি প্রাধান্য দেয় তার মধ্যে তিব্বত এবং তাইওয়ান অন্যতম।
দালাই লামা দীর্ঘ সময় ধরেই ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন, কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর আগে কোনও সরকারই তিব্বতের উপর চিনের কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি।
নেহেরু চিনের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তিব্বতের গেরিলাদের ভারতের মাটি থেকে লড়াই চালানোর অনুমতি দিয়েছিলেন, এমন কি ১৯৫০-এ বিদ্রোহের সমর্থনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাকে সমন্বয় রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিব্বত চিনের অংশ কি না তা নিয়ে তিনি কখনও প্রশ্ন তোলেননি।
অবশ্যই পেমা খান্ডু দেশের প্রধানমন্ত্রী নন, কিন্তু তিনি অরুনাচলপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এবং ভারতের শাসক দল বিজেপি’র প্রতিনিধিত্ব করেন।
পরমাণু সরবরাহকারী দলে ভারতের নথিভুক্ত হওয়াকে আটকানো এবং জইশ-ই-মহম্মদের প্রধান মাসুদ আজাহারকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে জাতিসঙ্ঘের ঘোষণা আটকে দিয়ে চিন ভারতকে হতাশ করেছে।
গত বছর গরমে হিমাচলপ্রদেশের মেকলিয়ডগঞ্জে কেবলমাত্র তিবেতীয়ানদের নয়, UIghurs, Falungongs-এর মতো একাধিক বেজিং বিরোধী সংগঠনকেও একটা মঞ্চ করে দিয়েছিল ভারত, যা চিনকে হতাশ করেছে।
আর এই দু’দেশের মধ্যে একে অপরকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বেজিং সবরকম ভাবেই দালাই লামার এই সফরের বিরোধিতা করেছে, বিগত সময়েও তারা একই ভাবে বিরোধিতা করেছে এবং সবসময়ই এই বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের কাছে একটি লোভনীয় বিষয়।
এই সফর ঘিরে ব্যাপক প্রচার চিনের কাছে অস্বস্তিকর এবং একইসঙ্গে দালাই লামাকে নতুন করে অক্সিজেন যোগায়।
এবং যখন অসমের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা দালাই লামার সফরের বিরোধিতা করে তখন কেবলমাত্র চিনের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য নয়, তারা দিল্লির উদ্দেশ্যেও একটা সংকেত দেয় যে ভারত যদি তিব্বতের দিকে আঙ্গুল তোলে তাহলে সংবেদনশীল উত্তরপূর্বাঞ্চলে আঘাত হানতে চিন দ্বিধা করবে না।
আরও পড়ুন : সার্জিক্যাল স্ট্রাইক, না কি সিন্ধ-বালোচিস্তানে ছায়াযুদ্ধ?
উত্তর কোরিয়ার স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে আমেরিকা চিনের সাহায্য চাইতে পারে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা চিনের পক্ষেও জরুরি।
ভারতের জন্যও চিনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। তার কারণ, এখন বোঝা যাচ্ছে কাশ্মীর, H1B ভিসা’র মতো গুরুত্বপূর্ন বিষয়ে ট্রাম্পের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নরেন্দ্র মোদীর খুব একটা উপকারে আসবে না।
যতদূর বুঝতে পারি এই মুহূর্তে ভারত-চিন সুসম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে খুব একটা পরিশ্রম করতে হবে না। যেমনটা ২০১৩ সালে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিব শঙ্কর মেননের ম্যান্ডারিনের উপর নিয়ন্ত্রন ছিল, চিনে তাঁর ভাল যোগাযোগ ছিল, যে কোনও চিন বিশষজ্ঞর সঙ্গে আলাপ করতে আগ্রহী ছিলেন। চুমার সিমান্ত নিয়ে দ্বন্দ্বের অবশান ঘটাতে পেরেছিলেন বেজিংয়ের সঙ্গে বিডিসিএ চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে।
ভারত ও চিন দু’দেশের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের জন্য একটা জায়গা থাকা প্রয়োজন, রাজীব গান্ধী এবং নরসীমা রাও যে কারণে দেং জিয়াও পিং’য়ের মতো চিনের মহান নেতাদের সঙ্গে বেশ কিছু বড় পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
১৯৯৩ সালের ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তি সীমান্তের উত্তেজনা কমিয়েছিল।
কিন্তু এখন সেই সম্পর্ক’র চূড়ান্ত অবনতি হয়েছে, সামরিক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি থেকে দু’দেশই এখন সরে এসেছে। এখন নতুন করে এই দুই প্রতিবেশী দেশ সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা গোটা হিমালয়ে ভয়ঙ্কর বিপদের বাতাবরণ তৈরি করেছে।
বিশ্ব রাজনীতি এবং অর্থনীতি সম্পর্কে সচেতন মানুষ মাত্রই জানেন কিভাবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে। চিনের সঙ্গে বিরোধের জেরে অস্ত্রশস্ত্রের জন্য ভারতকে আমেরিকা ছুটতে হচ্ছে।
ভারতের সামরিক অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ হিসাবে ইতিমধ্যেই রাশিয়ার জায়গাটি নিয়েছে আমেরিকা। এবং এটি ঘটেছে ২০০৪ সালে ভারত ও আমেরিকার মধ্যে পারমানবিক চুক্তি পর থেকে, যখন থেকে দুই প্রতিবেশী দেশ ১৯৯০-এর শান্তিচুক্তি লঙ্ঘন করতে শুরু করল এবং হিমালয়ে নিজেদের সামরিক পেশী শক্তির আস্ফালন ঘটাতে আরম্ভ করল।
ফলে এটাই সময় ভারত ও চিনের মধ্যেকার সম্পর্কের আরও অবনতি হওয়ার আগে নিজেদের মধ্যেকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে মেরামত করার।

#DalaiLama #ArunachalPradesh #India #China