চিন, পাকিস্তান ও মোদীর বিদেশনীতি

0
Author Image সুবীর ভৌমিক লেখক- প্রবীণ সাংবাদিক BBC, " Insurgent Crossfire" (1996) বইটির লেখক।

পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ যখন ঘোষণা করেন- হাফিজ সইদ তাঁদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপদ এবং সে কারণে তাকে গৃহবন্দী করা হল, তখন চিন কেন মাসুদ আজহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসাবে ঘোষণা করতে এত তালবাহানা করছে! সপ্তাহখানেক আগে ভারতের বিদেশসচিব এস জয়শঙ্করের সঙ্গে নীতিগত আলাপচারিতার সময় চিনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাসুদ আজহারের প্রতি তাদের কোনও সহানুভূতি নেই। জয়শঙ্কর চিনা প্রতিনিধিদের বলেন- আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স আজহারকে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে রাষ্ট্রসঙ্ঘের ঘোষণা করার প্রয়াসকে সমর্থন করছে, একমাত্র আপনারাই বিরোধিতা করছেন।
আসলে পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের ক্ষেত্রে দ্বিমুখীনীতি নিয়ে চলছে। একদিকে সন্ত্রাসবাদকে মদত জোগাচ্ছে অন্যদিকে দেখাচ্ছে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে। পাকিস্তানের নীতিগত ও কৌশলগত পদ্ধতির সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের সুস্পষ্ট সংযোগ রয়েছে। নীতিগত দিকটি হল, সন্ত্রাসবাদের শিকড়কে আরও গভীরে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাতে মদত দেওয়া, যাতে ভারতকে চাপে রাখা যায়। আর কৌশলগত দিকটি হল, পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ বন্ধ করার চাপকে প্রতিহত করার জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া। যেমন, অতিসম্প্রতি জামাত-উদ-দাওয়া প্রধান হাফিজ সইদকে সন্ত্রাসবাদ বিরোধী আইনে (ATA) আটক করাও একধরনের কৌশল। পাকিস্তান সবসময়ই একই দাবি করে যে, হাফিজ সইদের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকার কোনও প্রমাণ নেই। যদিও হাফিজ সইদকে তার ‘গুরুত্ব’ অনুযায়ী রাষ্ট্রসংঘ আন্তর্জাতিক সান্ত্রাসবাদী হিসাবে দেখছে এবং তার মাথার দাম ধার্য হয়েছে ১০মিলিয়ন মার্কিন ডলার। পাকিস্তান তাকে চারবার গৃহবন্দী করেছে এবং পাক-সরকার তার বিরুদ্ধে আদালতে কোনও প্রমাণ পেশ করতে না পারায় (যখন সরকারিভাবে বলা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ নেই, তখন প্রমাণ পেশ করা কি আদৌ সম্ভব?) বারবার ছাড়া পেয়ে গেছে। আর এই একই নাটক আজও চলছে।

modi

ফলে ভারতকে এই ভাবনার মধ্যেই আটকে থাকতে হচ্ছে যে কিভাবে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের মোকাবিলা করা হবে। এটা এই কারণে নয় যে আমাদের পাকিস্তান নীতিতে কোনও ত্রুটি আছে। আমাদের দেশের ‘শান্তি প্রিয়’ গোষ্ঠী’র মতে দু’দেশের মধ্যে আলাপআলোচনা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প নেই এবং তার জন্য পাকিস্তানকে কেবলমাত্র প্রতিবেশী হিসেবে ভাবলে চলবে না, বন্ধু হিসেবে ভাবতে হবে। কিন্তু এগুলো সব অলীক আশা এবং পররাষ্ট্র নীতির লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্যও এটা কোনও রাজনৈতিক কৌশল হতে পারে না। বিভিন্ন সময় আমরা বোঝানোর চেষ্টা করি কেন পাকিস্তানের সঙ্গে মত বিনিময় প্রয়োজন। পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ সমস্যা, বিশেষ করে পাকিস্তানকে নিজের দেশে যেভাবে সন্ত্রাসবাদী হামলার মোকাবিলা করতে হচ্ছে, কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সেখানে যে বিতর্কগুলো চলছে সেগুলো থেকে যদি আমরা উদার দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তাহলে ভারত-পাক সম্পর্কের উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যাই হোক পাকিস্তান কিন্তু কাশ্মীরেই আটকে আছে। পাকিস্তানের জেহাদি সংগঠনগুলোর লক্ষ্যই হল ভারতকে আক্রমণ করা। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি বাড়িয়ে চলেছে এবং আমাদের উপর পারমাণবিক হামলা চালানোর হুমকি দিয়েই চলেছে। পাকিস্তানের জঙ্গি সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃতি থেকে পরিষ্কার, আজ কিভাবে আমাদের সন্ত্রাসবাদের সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে এবং পাশাপাশি সম্মিলিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান কিভাবে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, এটা কেবল কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে নয়।
মোদী সরকারের পাকিস্তান নীতির নতুন ধারা এই কঠোর বাস্তবের উপরই দাঁড়িয়ে রয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রগুলিকে আরও বাড়ানোই হল নতুন নীতি। মোদী নিজেই বেশ কয়েকবার ইসলামাবাদকে জোড়ে ঝাকুনি দিয়েছেন। ২০১৬ স্বাধীনতা দিবসে নিজের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বালুচিস্তান প্রসঙ্গ টেনে এনে বলেন, পাকিস্তানের উচিত নিজেদের আভ্যন্তরীণ দুর্বলতার দিকে বেশি করে নজর দেওয়া। উরিতে জঙ্গি হামলার পর ভারতীয় জওয়ানরা সবরকম সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করে নিয়ন্ত্রণ রেখার ওপারে গিয়ে যে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক চালিয়েছিল তা প্রকাশ্যে বলা হয়েছে। মনে রাখতে হবে কার্গিল যুদ্ধের সময়ও কিন্তু জওয়ানরা নিয়ন্ত্রণ রেখা অতিক্রম করেনি। আর এখন পাকিস্তানের পরমাণু হামলার হুমকির কথা মাথায় রেখেও ঘটনা ঘটার সাথে সাথে জওয়ানরা যথোপযুক্ত জবাব দিচ্ছে। তবে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানকে চাপে রাখার জন্য নরেন্দ্র মোদী মোক্ষম এবং হিসেবি চাল দিয়েছেন সিন্ধু জল বন্টন চুক্তির (IWT) বিষয়টি উত্থাপন করে। তিনি ঘোষণা করেন চুক্তি অনুযায়ী ভারতের পূর্ণ অধিকার আছে নিজেদের পক্ষের নদীর জল সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার করার। পাকিস্তান যদি সন্ত্রাসবাদে মদত দেওয়া বন্ধ না করে, তাহলে ভারত এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তও নিতে পারে বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা এই বিষয়ে বিশ্ব ব্যাঙ্কের সঙ্গে দৃঢভাবে মোকাবিলা করছি এবং আমেরিকা ‍ও ব্রিটেন IWT-র কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের থেকেও সরে এসেছে।
গত জানুয়ারি মাসে আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স রাষ্ট্রসংঘে মাসুদ আজাহারকে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসাবে ঘোষণা করার যে উদ্যোগ নিয়েছিল, চিন তাতে বিরোধিতা করল। এর ফলে ভারত-চীন সম্পর্কের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন অব্যাহত থাকল এবং ভারতের বিদেশসচিবের চিন সফরের আগে একটা বার্তা দিয়ে রাখল যে মাসুদ আজাহার এবং ভারতের এনএসজি’র সদস্যপদ নিয়ে চিনের অবস্থানে কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। এই দুটো ইস্যুর সঙ্গে তাদের দেশের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক না থাকা সত্ত্বেও চিন এখনও নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছে না।
এমনকি যদি এই দুটি ইস্যুতে ভারত কোনওভাবে সমর্থন প্রাপ্তি ঘটাতে পারে তাহলে কেবলমাত্র ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ছায়াযুদ্ধ চালানোর ক্ষমতাকে দুর্বল করা সম্ভব হবে না, আন্তর্জাতিক স্তরে অসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার বন্ধ দরজাও ভারতের জন্য খুলে যাবে। চিনের উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উদ্ধত্য’র মিশ্রণ ঘটছে, চিন পাকিস্তানকে কাজে লাগিয়ে ভারতকে বাক্স বন্দি করে রেখে নিজেদেরকে এশিয়ার প্রধান শক্তি হিসাবে জাহির করার ইঙ্গিত দিচ্ছে এবং ভারতকে বুঝিয়ে দিচ্ছে আমেরিকার সঙ্গে যতই সুসম্পর্ক রাখো না কেন, চিনের মত ছাড়া আন্তর্জাতিক মঞ্চ থেকে কিছুই হাসিল করতে পারবে না।
চিন যখন মাসুদ আজহার এবং এনএসজি’র ক্ষেত্রে সরাসরি মাথা গলাচ্ছে এবং নিজেদের গুরুত্ব জাহির করতে চাইছে তখন ভারতের উচিত আর বেশি গুরুত্ব না দেওয়া। ভারত বরং চিন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের বিরোধিতা আরও জোরালোভাবে করুক, পাক অধিকৃত কাশ্মীরে চিনের অন্যায়ভাবে উপস্থিতির বিরুদ্ধে বেশি সরব হোক এবং পাকিস্তানের উপর নানা দিক থেকে চাপ বাড়িয়ে তুলুক। এগুলোর পাশাপাশি ওই দুটো ইস্যুতে আন্তর্জাতিক স্তরে উপযুক্ত মঞ্চে চিনকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কৌশল নিতে হবে। বালুচিস্তান, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং সিন্ধু জলচুক্তির মধ্যে দিয়ে নরেন্দ্র মোদী প্রাথমিক সংকেত দিয়ে দিয়েছেন, এখন দরকার সব রাজনৈতিক দলগুলির নিজস্ব হিসেবনিকেসের বাইরে এসে এই বিষয়ে সহমত তৈরি করা। পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এই বিষয়ে দেশের ভেতর ঐক্যমত্য তৈরি করা।