ছিটমহল মমতা করে দিয়েছেন, এই দাবি তিনি করেন কি করে?

দীপ্তিমান সেনগুপ্ত 

0
India Bangladesh Land Boundary Agreement
ছিটমহল জমি বিনিময় চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার দিন নরেন্দ্র মোদী ও শেখ হাসিনা।

পশ্চিমবঙ্গের মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতিসম্প্রতি কোচবিহার সফরে এসে একাধিক মঞ্চে উপস্থিত থেকে ভাষণ দিয়েছেন। ভাষণে তিনি স্বভাবসিদ্ধভাবে কেন্দ্রের বঞ্চনা সত্ত্বেও রাজ্য সরকার কিভাবে উন্নয়নের জোয়ারে উত্তরবঙ্গের মানুষকে ভাষিয়ে দিয়েছে তার ফিরিস্তি দিয়েছেন। কোনও ভাল কাজকে নিজের বলে চালিয়ে দিতে আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর জুরি মেলা যে ভার সে বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। আবার সুযোগ বুঝে তিনি ৯০ ডিগ্রি পাল্টি খেয়ে যান, সেটাতেও তেমন কোনও নতুনত্ব নেই। যেমন তিনি এবার সভা মঞ্চে দাঁড়িয়ে সটান বলে দিলেন, তিনি না কি ছিটমহলের সমস্যা সমাধান করে দিয়েছেন! ছিটমহলের আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে ওতপ্রতোভাবে জড়িত থাকার সুবাদে বলতে বাধ্য হচ্ছি, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলে গেলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথমদিন থেকেই ছিটমহলের জমি বিনিময় চুক্তির বিরোধিতা করে গিয়েছিলেন। ইতিহাস তার সাক্ষী। ১৯৯২ সালে কমল গুহ’দের সঙ্গে সুর মিলিয়ে তীব্রভাবে তিন বিঘা আন্দোলনের বিরোধিতা করে গিয়েছিলেন মমতা। তিনি তখন যুব কংগ্রেসের নেত্রী এবং সাংসদ।
২০১১ সালে কেন্দ্রে মনমোহন সিং-এর সরকার এবং পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ছিটমহল সমস্যা সমাধানের জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যার তার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
২০১৩ সালে এপ্রিল মাসে পঞ্চায়েত নির্বাচন উপলক্ষে মাথাভাঙায় একটি নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মমতা বলেছিলেন- ছিটমহলের জন্য এক ছটাকও জমি দেব না।
ততদিনে ছিটমহল আন্দোলন বহু বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ এবং ভারত সরকার চাইছিল ছিটমহল সমস্যার একটা সমাধান করে ফেলতে। বছরের পর বছর ধরে দেশহীন আবস্থায় থাকা মানুষগুলিকে এই বিড়ম্বনার হাত থেকে মুক্তি দিতে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুঝে গিয়েছিলেন, ছিটমহলের জমি বিনিময় কেবল সময়ের অপেক্ষা। আর তা বুঝেই ৯০ ডিগ্রি পাল্টি খেয়ে ২০১৪-র এপ্রিলে কোচবিহার জেলার সকল তৃণমূল নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন- ছিটমহলের মানুষ যা চাইবে তাই হবে।
বিজেপি’‍ও বিরোধিতা করেছিল। সেটি অন্য কারণে, সংসদে ১০৬তম সংশোধন না কি ১১৯তম সংশোধন আনা হবে তা নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল। আর তৎকালিন ইউপিএ সরকার রাজ্যসভায় সংশোধনিটি এনেছিল, বিজেপি’র দাবি ছিল সেটি লোকসভায় পাশ করাতে হবে তারপর রাজ্যসভায়।
২০১৩ সালে সংসদের বাজেট অধিবেশন চলাকালীন দিল্লিতে বিজেপির এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে আমরা সাক্ষাৎ করেছিলাম। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছিলেন- একটু ধৈর্য ধরুন, আগামী বছর লোকসভা নির্বাচনে আমরা ক্ষমতায় আসছি। ক্ষমতায় এসেই ছিটমহলের জমি বিনিময় চুক্তি সম্পন্ন করা হবে। এই সময় আপনারা বরং রাজ্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন, যাতে তারা বিরোধিতা না করে।
সেইমতো আমরা কোচবিহার জেলার তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতা রবীন্দ্রনাথ ঘোষের সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু বুঝতে পারি ছিটমহল নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলার সাহস বা ক্ষমতা তাঁর ছিল না। আমরা তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা এবং দেখা করার চেষ্টা করি। কিন্তু তিনি আমাদের সময় দিতে রাজি হননি।
যাই হোক ২০১৫ সালে ছিট মহলের জমি বিনিময় চুক্তি সম্পন্ন হয়। তার আগে থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলতে থাকেন ছিটমহলের কোনও দায়িত্ব (খরচ) রাজ্য সরকার বহন করতে পারবেন না, সব দায়িত্ব কেন্দ্রকে নিতে হবে। কেন্দ্র সরকার তাতে আপত্তিও করেনি। মনমোহন সিং সরকারও বলেছিল ছিটমহলের দায়িত্ব কেন্দ্র নেবে। নরেন্দ্র মোদী সরকার ক্ষমতায় এসে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে ছিটমহলে কত খরচ হতে পারে তার একটা হিসাব পাঠাতে বলে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠান্ডা ঘরে বসে একটা হিসাব পাঠিয়েছিলেন, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল ছিটমহল হস্তান্তরের পর পশ্চিমবঙ্গের অংশে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ আসবেন। উনি সেদিন কিসের ভত্তিতে এই তথ্য দিয়েছিলেন, সেটা এখনও রহস্য। বাস্তবে  কাঁটাতারের ওপার থেকে পশ্চিমবঙ্গে এসেছেন ৯২১ জন মানুষ।
কেন্দ্র ছিটমহলের জন্য এতটুকুও কার্পন্য করেনি। ছিটমহল এবং ছিটমহলের মানুষের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করছে। কোচবিহারে নতুন দুটো থানা হয়েছে, নতুন রাস্তা হয়েছে, বড় বড় জলের প্রকল্প হয়েছে, সোলার পাম্প বসেছে। সবই কিন্তু ছিটমহলের টাকায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সে কথা ভুলেও উল্লেখ করেন না। এখন দাবি করছেন ছিটমহল তিনি করে দিয়েছেন। একথা বলার কারণ, ছিটমহলের ১৫,৮৫৬ জন নাগরিকের মধ্যে ৬০শতাংশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং ১০,৫০০ জন ভোটার। একটা তথ্য এই ক্ষেত্রে দেওয়া দরকার। যাতে বোঝা যায় রাজ্য সরকার ছিটমহলে কতটা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে!  ইতিমধ্যে ছিটমহলে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন তিন জন এবং চিকিৎসায় অভাবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন বেশ কয়েক জন। ছিটমহলের অধিকাংশ মানুষই ১০০ দিনের কাজ পাননি। ২০১৬-১৭ আর্থিক বছরে ছিটমহলের জন্য ২৭২ কোটি টাকা কেন্দ্র দিয়েছে। কিন্তু রাজ্য সরকার তার খরচের হিসেব এখনও জামা দিতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গ সরকার চমক দেওয়ার জন্য আরেকটি কাজ করছে, সেটি হল-ছিটমহলের প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি করছে!  কোচবিহারের একাধিক এলাকায় নাকি এই ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হচ্ছে। ছিটমহলের ২০০ পরিবারকে এই ফ্ল্যাট দেওয়া হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের দাম ধরা হয়েছে ১১ লক্ষ টাকা। গ্রাম বাংলায় এই একটি ফ্ল্যাটের টাকায় তিন বিঘে জমি কেনা যায়। যা এই মানুষগুলোর কাছে অত্যন্ত জরুরি। স্বাভাবিকভাবে ছিটমহলের মানুষ নিজের এলাকা ছেড়ে ওই একচিলতে ফ্ল্যাটে জেতে রাজি নয়।
সব শেষে একথা স্পষ্টভাবে বলছি যে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিটমহল নিয়ে কিছুই করেননি। বরং বিরোধিতাই করে গেছেন। এবং এখন আবার নতুন করে তার দল একটা গন্ডগোল পাকাতে চাইছে। তারা দাবি করছে বাংলাদেশে বেশি জমি চলে গেছে, সেই জমি ফেরত দিতে হবে।
আন্তর্জাতিক সব শর্ত মেনে দু’দশের মধ্যে দীর্ঘ অপেক্ষার পর ছিটমহল জমিবিনিময় চুক্তি সমন্ন হয়েছে। এখন নতুন করে এই ভাবে গন্ডোগোল পাকানোর চেষ্টার কী যুক্তি আছে?

#ChitMahal #India #Bangladesh #Modi#Hasina #Mamata