আমরা কেন ছোটদের জন্য ছবি বানাতে পারছি না?

সমর্পিতা ঘটক

0

গুন্ডামি, প্রতিহিংসা, প্রতিশোধ অর্থাৎ অরাজক পরিস্থিতিকে অনেকেই জঙ্গল রাজের সঙ্গে তুলনা করেন। আসলে সেটা কেমন? জঙ্গলরাজ মানে জঙ্গলের রাজত্ব নিয়ে আমাদের কৌতূহল সেই কবে থেকে। রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর জঙ্গল কাহিনি ক’জন পড়েছেন জানিনা, কিন্তু মোগলিকে আমরা সবাই দেখেছি আর “জঙ্গল জঙ্গল বাত চলি হ্যায়/পাতা চলা হ্যায়/ আরে, চাড্ডি পহেনকে ফুল খিলা হ্যায়” গাইতে গাইতে বড় হয়েছি। সৌজন্যে গুলজার সাব আর বিশাল ভরদ্বাজ। অমন সুন্দর সৃষ্টি আমাদের ছোটবেলাকে আমোদিত করে রাখত, তারপরে তো সেই এক চর্বিত চর্বন থুড়ি অ্যানিমেশন- বাল গণেশ, ছোটা ভীম, ঘটোৎকচ, হনুমানের সব গাঁজাখুড়ি গল্প। আর তাদেরকে সুপারহিরো বানানোর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার চক্করে এই শিশুরা সেসব অমৃতের স্বাদ চরণামৃতে মেটায়।
কিপলিং-এর জঙ্গল বুক তো ভারতের জঙ্গলেরই গল্প। আমাদেরই বাঘেরা, বালু, রক্ষা, কা, শের খান আর মোগলি, তৈরি হল বিদেশে! আর আমরা এইসব ছোটদের কাহিনি কল্পলোক থেকে সেলুলয়েডে রূপান্তরিত করার স্বপ্নও দেখে উঠতে পারলাম না। ছোটবেলায় টিভিতে জঙ্গল বুকের অ্যানিমেশন (আমরা যেটা দেখেছি সম্ভবত জাপানে নির্মিত হয়েছিল) ঘিরে কল্পনাগুলো ডানা মেলেছিল মনের আকাশে। আমরা সবাই নিজেকে মোগলি হিসেবে কল্পনা করে বড় হয়েছি। নিজেদের জীবনে চলার পথের প্রতিবন্ধকতাগুলি যেন মোগলির জঙ্গলে টিকে থাকার লড়াই! প্রতিদিন নতুন কিছু শেখা আর তা প্রয়োগ করে বিপত্তি’র মোকাবিলা করা। একটা মুক্ত জগতের গল্প বলে জঙ্গলবুক। যেখানে সবাই টিকে আছে সবার মত করে, সজারু, ব্যাং, ইঁদুর আবার হাতি, গন্ডার আর বিশালাকৃতির শিম্পাঞ্জি লুই।  ছোট ছোট খোপে থাকা, একা একা বাঁচা, নিজের সঙ্গে খেলা করা এখনকার একাকী শিশুদের চোখের সামনে খুলে যায় প্রকৃতির বিরাট ক্যানভাস।
নতুন ছবিটা দেখে আরও কতকগুলো চরম সত্য মাথার মধ্যে এল, জঙ্গলের রাজত্ব মানুষের দুনিয়াদারির থেকে নিষ্ঠুর, নির্মম নয়। হোক না গল্প, গল্পের মানুষ যদি বাস্তব থেকে আসে তাহলে ধরে নেওয়াই যায় যে গল্পের জংলি প্রাণীরাও বাস্তবজীবন থেকে অনুপ্রাণিত। তারা তো তাদের মানুষ সঙ্গীকে বাঁচাতে সবাই এককাট্টা হল। তারা তো সবাই হাতিদের তৈরি জল-চুক্তি মেনেই চলে! মানুষের মত একটি নিয়ম গড়ে সে নিয়ম ভাঙার খেলায় জন্তুরা মাতে না। তারা নিজেদের বাসভূমিকে ভালবাসার আর রক্ষা করার মন্ত্র শেখায় মোগলিকে। তারা মানুষ নামক বিশ্বাসঘাতককে ঘেন্না করে কিন্তু নেকড়ে দ্বারা পালিত মোগলিকে নয়। একমাত্র শের খান ব্যতীত। তার অতীত তাকে শিখিয়েছে মানুষ আর বাঘের সম্পর্ক হল খাদ্য ও খাদকের- সে মোগলিকে খেতেই চায়-বাঘিরা, বালু, রক্ষার স্নেহ ভালবাসা বন্ধুত্বের তত্ত্ব সে মানেনা আর তাই বাকিদের সাথে শের খানের তাত্ত্বিক, কায়িক, নৈতিক লড়াই। মানুষ সবথেকে বুদ্ধিমান- এ তত্ত্ব কিপলিং জাহির করেছেন বটে, কিন্তু সবথেকে বেশি সভ্য, হৃদয়বান আর কৃতজ্ঞ প্রাণী যে একমাত্র মানুষ নয়, এ কথা জন ফ্যাভরুর জঙ্গলবুক দেখলে বারবার মনে হবে দর্শকদের। তাই যত অপকীর্তির দায় মানুষ জঙ্গলের উপর চাপিয়ে ‘জঙ্গলরাজ’এর সঙ্গে তুলনা করে নিজের দায় এড়াতে পারে না কৌশল করে, বুদ্ধির আস্ফালন ঘটিয়ে।
এই ধরণের ছবির মাত্রা, স্পেশাল এফেক্টস ইত্যাদি কেমন হয় এসব নিয়ে কথা খরচ করে কোনও লাভ নেই। সবাই জানেন আর মানেনও যে- এমনটাই হওয়ার কথা ছিল। মাল্টিপ্লেক্সের হেলানো চেয়ারের এক্সিকিউটিভ ক্লাসে বসে, চোখে থ্রিডি গ্লাস লাগিয়ে, ক্যারামেল ফ্লেভারড পপকর্ণ আর পেপসি খেতে খেতে যতই গদ গদ হয়ে নিজেকে বলি না কেন- এ সবই তো পরিবর্তন। (ফাটা সিট, ছারপোকা, পাখার ব্লেডের শব্দ এসব আর হয়তো নেই। টাকা ফেললেই আপনি আমোদ সাগরে ভাসতে পারবেন) কিন্তু এ দেশে শিশু চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কোনও পরিবর্তন নেই। কুংফু পান্ডা, মোগলি, রিও, নিমোরা এদেশে সাদরে আমন্ত্রিত কিন্তু দেশীয় শিশু চলচ্চিত্র যা আদপে আমরা বড়রাও দেখতে খুব ভালবাসি। তার অবস্থা করুণ, ম্যাড়মেড়ে আর অবর্ণনীয়। ব্যবসা নেই নাকি সেসব ছবির, এই ছেঁদো যুক্তি অনেক দিন ধরে শুনে আসছি, অথচ জঙ্গলবুকের ব্যবসার খতিয়ান কেমন তা টিকিটের লাইনে দাঁড়ালেই সাধারণ মানুষও বুঝতে পারবেন। তাই আমাদের অফুরান হীরে-মাণিক্য (শিশু সাহিত্য) থাকা সত্ত্বেও আদপে ভাঁড়ার শূন্য। যে দু-একটি ছবি ছোটদের জন্য নির্মিত হয়, তার প্রচার হয় না, প্রদর্শন হয় না চলচ্চিত্র উৎসবের বাইরে। তাই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গুপিগাইন বাঘাবাইন, হীরক রাজার দেশে, সফেদ হাতি, সোনার কেল্লা, বাড়ি থেকে পালিয়ে ইত্যাদি মাণিক্য আমাদের সিন্দুক থেকে বের করি, এদের ঔজ্জ্বল্য আমাদের ড্রয়িং রুম আলো করে… তারপর আবার অন্ধকারে বসে শৈশব হারানো শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হা-হুতাশ করি।