বাঙালির ব্যোমকেশ বাসনা

সমর্পিতা ঘটক

0

মনে একটা প্রশ্ন কিছুকাল ধরেই খচখচ করছিল, আমরা হঠাৎ করে এইরকম আদ্যপান্ত ব্যোমকেশ ভক্ত হয়ে পড়লাম ঠিক কবে থেকে? তরুণ ব্যোমকেশ, বৃদ্ধ ব্যোমকেশ, বম্বেওয়ালা পাগলাটে ব্যোমকেশ। এমন করুণ অবস্থা আমাদের যে অভিনেতা এইবছর নতুন ফেলুদা হিসেবে দর্শকদের সামনে এলেন তিনিই কিছু বছর আগে প্রথমবার ব্যোমকেশ (চিড়িয়াখানার উত্তমকুমারের পরে) হিসেবে এসেছিলেন, তাই বলা যেতেই পারে হাঁসজারুর মত ফেলু-ব্যোম। এই উন্মাদনা কার? দর্শকদের না পরিচালকের…? রহস্য গল্পের অভাব? শরদিন্দুর লেখার গুণে টানটান গল্পের প্লট? (চিত্রনাট্যকারের সুবিধা হয় এমন সুন্দর চিত্রনাট্য পেলে, ভাল চিত্রনাট্যকারের বড় অভাব টালিগঞ্জে ইদানীং কালে), আবার এও হতে পারে পশিমবঙ্গের খুন রাহাজানি, জোচ্চুরির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় আমাদের মনে করিয়ে দেওয়া যে, বাপু দেখেছো, এসব দুষ্কর্ম তখনো ছেল! লোকেশন খোঁজার ঝক্কি কম, কম বাজেটে সব রকমের রেডিমেড মশলাসমেত খাদ্য পরিবেশনের সুবিধা। এসব কারণেই কি ব্যোমকেশ নিয়ে হুড়োহুড়ি? আমাদের এখনকার রাজনৈতিক, সামাজিক সংকট নিয়ে সরাসরি ছবি করার সাহস বা অধ্যাবসায় হাতে গোনা কয়েকটি পরিচালকের মধ্যেই আছে, বাকিরা সব গড্ডালিকা স্রোতে ভেসে চলেছেন। লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক গাদা ভাল গল্প, উপন্যাস আছে যা থেকে উৎকৃষ্ট ছবি হতে পারে, সাহিত্য হিসেবেও সেগুলি কালোত্তীর্ণ। একসময় নিজে চিত্রনাট্য লিখতেন বলে কত যে চমক আছে ওনার গল্পে তা তো পাঠকের জানা। কই তাঁর সৃষ্ট সদাশিব নিয়ে তো কেউ ভাবলেন না! কিংবা ওঁর ওই অসাধারণ ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলি নিয়েও দুর্দান্ত ছবি হতে পারতো-ঝিন্দের বন্দীর মত ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ছবি। না হয়নি আর…শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের যেমন শুধুই দেবদাস… তেমনি পোড়া কপাল শরদিন্দুবাবুরও। অথচ তাঁর লেখার ব্যাপ্তি বোঝা যাবে তিনটি ছবির কথা বললে যেগুলো তাঁর ছোটগল্প-ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, দাদার কীর্তি, মেঘমুক্তি(পরিচালক তরুণ মজুমদার) এবং হিন্দি ছবি তৃষাগ্নি (মূল গল্প ‘মরু ও সঙ্ঘ’, পরিচালক নব্যেন্দু ঘোষ)।
বাঙালি জাতিটাই সন্দেহপ্রবণ, রহস্য সন্ধানীও বটে, কিন্তু সে তো আগেও ছিল… তবে সেই চিড়িয়াখানার (সেপ্টেম্বর মাসে ১৯৬৭ সালে মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিত রায়ের চিড়িয়াখানা) পরে এতদিনের অপেক্ষা কেন? মাঝের (১৯৭৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল শজারুর কাঁটা, পরিচালনা করেছিলেন বিখ্যাত অভিনেত্রী মঞ্জু দে, কিন্তু ছবিটি তেমন সাড়া ফেলেনি) এতটা সময় কেউ ভাবনা চিন্তা করেননি সত্যান্বেষী ব্যোমকেশকে নিয়ে, একমাত্র প্রবাসী বাঙালি পরিচালক বাসু চ্যাটার্জি ছাড়া। তাঁর পরিচালিত ব্যোমকেশ বক্সী নামক হিন্দি টেলিসিরিজ অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং গুণমানে কতটা উৎকৃষ্ট, তা আমাদের সবার জানা (ব্যোমকেশের চরিত্রে রজিত কাপুর এবং অজিত হিসেবে কে কে রায়না অসাধারণ এবং বড় মানানসই ছিলেন)। কিন্তু কলকাতায়, নিজের শহরে এই আদ্যন্ত বাঙালি, ম্যাচিওরড গোয়েন্দার কথা এতদিন কারো মনে পড়েনি। অথচ অসাধারণ গল্পের বুনন, প্রাক স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট! সবকিছুই তো জানা ছিল, কাহিনীগুলি বার বার পড়া ছিল সাহিত্য অনুরাগী বাঙালিদের! এ যেন সেই অহল্যার পাথর হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা আর রামচন্দ্রের জন্য অপেক্ষা (অঞ্জন দত্ত-কে রামচন্দ্র বলাই যেত, কিন্তু তাঁর আগে ব্যোমকেশ নিয়ে মগ্ন মৈনাক ছবিটি বানিয়েছেন স্বপন ঘোষাল, ২০০৯ সালে, যিনি ২০০৪ সালে টিভির জন্য ব্যোমকেশ বানিয়েছিলেন।) আর তারপর থেকে, মানে অঞ্জন দত্ত-এর আবিররূপী ব্যোমকেশ (২০১০) সফল হওয়ার পর থেকে সবাই হই হই করে রহস্যভেদ করার জন্য বদ্ধপরিকর। এই শিবির থেকে অভিনেতা ছিনতাই করে (ফুটবল মাঠে যেমন খেলোয়ড় ছিনতাই হয়) ঐ শিবিরে নিয়ে গিয়ে অজিত, সত্যবতী পালটে দিয়ে নতুন ব্যোমকেশ।
খাবার ভাল হলেই কি বেশি বেশি খেতে হবে আর বদহজম (বাঙালির জাতীয় রোগ) বাঁধাতে হবে। বাণিজ্য বড় বালাই জানি কিন্তু এতে কি সত্যি লাভ হয়? হয়তো হয়, না হলে সবাই হামলে পড়ছেনই বা কেন? তবে নানা রকমের ব্যোমকেশ আর নানা রকমের অজিত নিয়ে বাংলা ছবির পরিবার কতটা সমৃদ্ধ হচ্ছে বোঝা কঠিন। ব্যোমকেশ ছাড়াও ফেলুদা(আসেন শীতকালে), অন্যান্য অনামী গোয়েন্দা, পুলিশদের ভিড় আছেই। একগাদা ফেলুদা, ব্যোমকেশ, অর্জুনদের মধ্যে শবর কেই ভালো লেগেছে, মনে হয়েছে আর একটা শবর হলে মন্দ হয় না। আর বাকিগুলো দেখে মনে হয়েছে এবার ক্ষান্ত দিলেই ভাল। সন্তুর(এবং আমাদেরও) কাকাবাবু গোয়েন্দা ছিলেন না, কেউ তাঁকে গোয়েন্দা বলে সম্বোধন করলে খুব রেগে যেতেন তাই কাকাবাবুকে এই তালিকায় রাখা যাবে না। তবে নতুন কাকাবাবুও(মূখ্য ভূমিকায় চিরঞ্জিৎ)এলেন বলে, যদি না কিছু অঘটন ঘটে। রহস্য রোমাঞ্চের ঘোর এখনই কাটার নয়। হয়তো জটায়ু থাকলে বলতেন ‘গায়ে কাঁটা দিচ্ছে মশাই’। এত কিছুর মধ্যে জটায়ুকেই (অবশ্যই সন্তোষ দত্ত, আর কেউ নয়) মিস করি।
অন্যদিকের পরিবর্তনটি বেশ চমকপ্রদ। টিভি জুড়ে শাশুড়ি বৌমাদের দাপট আর কুটকচালি, অসাংস্কৃতিক সংলাপ শুনে শুনে মন যখন অবসন্ন তখন বাজারের প্রয়োজনেই হোক বা দর্শকের চাহিদা্র কথা মাথায় রেখেই হোক টিভি সিরিয়াল, রিয়ালিটি শো জুড়েও রহস্য দানা বাঁধছে আর গোয়েন্দারা আসছেন বিভিন্ন রূপে। এক্ষেত্রে অতিনাটুকে, অবাস্তব গল্পের দজ্জাল শাশুড়ির একঘেঁয়ে ষড়যন্ত্র এবং সর্বংসহা বৌমার হাত থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি মিলেছে দর্শকদের, এটা সত্যি আনন্দের।