বেফাঁস কথা বলে যুক্তিবাদী সাজা কবি শ্রীজাত

3
Author Image দীপ বিশ্বাস

“সকলেই কবি নয়, কেউ কেউ কবি”।
-জীবনানন্দ দাশ
কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, আপনার বিরুদ্ধে FIR করার পর একটি চ্যানেলে আপনার সাক্ষাৎকার সম্প্রচারিত হয়েছে। আপনি আপনার মতামত জানালেন। আপনার “কবিতার” একজন পাঠক হিসেবে আমিও কিছু বক্তব্য রাখতে চাই।
(আগেই বলে দিই আমি বিজেপি নই, তৃণমূল নই, সিপিএম’ও নই। আমি কোনও হিন্দুত্ববাদী সংগঠন যেমন RSS বা হিন্দু সংহতির সাথেও যুক্ত নই। আমি কেবল একজন অনামধন্য লেখক এবং অবশ্যই পাঠক, যে মনে করে সাহিত্য, রাজনীতি ও ধর্ম তর্কের জায়গা এবং সেই হিসেবে কিছু মতামত রাখতে চাই।)

sri.-bitarka-1

বিতর্কিত কবিতাটির শুরুর দিকে একজন “গেঁয়ো যোগী” কে আপনি ব্যঙ্গ করেছেন, যিনি সদ্য ক্ষমতায় এসেছেন। তো স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে আপনি উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের মুখ্যমন্ত্রী হওয়াকে ভাল চোখে দেখছেন না।ভাল কথা। আপনার মতামতের সাথে সহমত না হলেও আপনার মতামত রাখার অধিকারকে আমি সমর্থন করি। সহমতও হতাম, যদি আপনি বোঝাতেন “গেঁয়ো যোগী” বলতে আপনি কি বলতে চেয়েছেন? গেরুয়া পরলেই কি মানুষ “গেঁয়ো” হয়? নাকি ইংরেজি না বলতে পারলে হয়? কি করলে শহুরে হওয়া যায়? বিদেশ থেকে ঘুরে এসে ফেসবুকে ফটো আপলোড করলে? যাক গে, ছাড়ুন। আশা করি যোগী আদিত্যনাথ’কে “গেঁয়ো যোগী” বলার পিছনে আপনার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে, আপনি তো আর বুর্জোয়া কবি নন।
এইবার আসি মূল প্রসঙ্গ-এ। যে উক্তির জন্য কবিতার জগতে আইনের অনুপ্রবেশ। আপনার কবিতায় (শেষ দুটি লাইন) আপনি লিখেছেন,
“আমাকে ধর্ষণ করবে যদ্দিন কবর থেকে তুলে –
কন্ডোম পরানো থাকবে, তোমার ওই ধর্মের ত্রিশূলে!”
কন্ডোম যেহেতু জন্মনিরোধক, সেহেতু ধরে নেওয়া যায় যে, এই দুটি লাইনের মাধ্যমে আপনি বোঝাতে চেয়েছেন, যতদিন ধর্মের ধ্বজাধারীরা অন্য ধর্মের প্রতি হিংস্রতা পোষণ করবে, ততদিন ধর্ম বন্ধ্যা হয়ে থাকবে, তা থেকে সৃজনশীল কিছু হবে না।
প্রথমত,
কবর থেকে তুলে ধর্ষণ করার মন্তব্যটি যোগী আদিত্যনাথের নয়। যোগীর উপস্থিতিতে মঞ্চে আরেক বিজেপি নেতা এই মন্তব্য করেছিলেন। সেই লোকটিকে আমি নরাধম, পশুরও অধম মনে করি। কিন্তু একই সাথে আবারও জানিয়ে দিই, যোগী আদিত্যনাথ নিজে এই মন্তব্য করেননি।
দ্বিতীয়ত,
আপনি একজন হিন্দুত্বের ধ্বজাধারী বিজেপি নেতার মন্তব্যের জন্য পুরো হিন্দু সমাজকে দায়ী করলেন? একজনের জন্য পুরো হিন্দু সমাজের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত করলেন? “অন্ধকার লেখাগুচ্ছে” তো আপনি মূর্তি ভেঙে ধর্মবীর সাজা ভন্ডামির প্রতিবাদ করেছেন, কই সেখানে তো কোনও ধর্মের কোনও সিম্বলে কন্ডোম পরাননি? একজন মৌলবাদীর মন্তব্যের জেরে আপনি পুরো হিন্দু ধর্মকে কাঠগড়ায় তুললেন। একজন মুসলিম নামধারী যখন সন্ত্রাসবাদীরূপে চিহ্নিত হয়, তখন কি আপনি সব মুসলিমকে দায়ী করেন? তাহলে, এ কেমন দ্বিচারিতা কমরেড?
এই মন্তব্যে কি সমাধান হল? আপনি একটি নোংরামির প্রতিবাদ করলেন আরেকটি নোংরামি দিয়ে। আপনি নিশ্চই বলবেন, “তারটা বেশি নোংরা, আমারটা কম”, তাই তো? শ্রীজাত আপনি নিজেও যখন কামড়াচ্ছেন, তাহলে অন্যকে কি করে কুকুর বলছেন? ত্রিশূলে কন্ডোম না পরিয়ে কি ওই মন্তব্যের প্রতিবাদ করা যেত না? যেত, তবে সস্তা পাবলিসিটিটা হত না। আপনি অভিযোগ করেছেন যে ফেসবুকে আপনাকে কদর্য ভাষায় আক্রমণ করা হয়েছে, অথচ নিজে আপনি যেটা করেছেন সেটা হল মার্জিত ভাষায় কদর্যপনা! বাকস্বাধীনতার নামে ধর্মীয় সুড়সুড়ি দিয়েছেন আপনি। নিজের বেলায় বলছেন, আমি কোনওরকম তকমা লাগানো পছন্দ করি না, অথচ কিছু ‘চ্যাংড়া’ ছেলে মেয়ে, যারা আপনাকে ফেসবুকে খিস্তি করেছে, তাদের সম্বন্ধে খুব সহজেই বলে দিচ্ছেন যে এদের পিছনে কোনও বিশেষ রাজনৈতিক দলের বা মৌলবাদীদের সমর্থন আছে। সাধারণ ফেসবুক ট্রোলদের গায়ে মৌলবাদী তকমা সেঁটে দিচ্ছেন। আপনার প্রিয় রাজনৈতিক দলের মাইলেজ বাড়াতে ফেসবুক ট্রোলদের রাজনৈতিক বানিয়ে দিচ্ছেন, অথচ নিজের বেলায়, “আমি অন্য একটা জগতে থাকি”? বাহ কবি বাহ! Spoken like a true Comrade!
আপনি বলেছেন যে, মানুষের ধর্মবিশ্বাস এত ঠুনকো নয় যে আমি কিছু বলার জন্য তাতে আঘাত লাগবে। বাহ! বেফাঁস কথা বলে যুক্তিবাদী সাজা আপনাদের সত্যি আপনাদের থেকেই শেখা উচিৎ। ধর্মবিশ্বাস যে ঠুনকো নয় তা আমরাও জানি, তাই বলে ধর্ম নিয়ে যা খুশি নোংরা কথা লেখা হবে আর কারও খারাপ লাগলেই আপনার বাকস্বাধীনতার উলঙ্ঘন? হে যুক্তিবাদী ভন্ড কবি, এটা তো এক ধর্ষকের ধর্ষণকে জাস্টিফাই করা যুক্তির মতো শোনাচ্ছে। ধর্ষণ করে যদি ধর্ষক বলে, “মানুষের শরীর কি এতই ঠুনকো, যে আমি একটু কাটাছেঁড়া করেছি বলেই নষ্ট হয়ে যাবে?” ধর্ষণের মন্তব্যের প্রতিবাদ করছেন আপনি ধর্ষকের যুক্তি দিয়ে।
(এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে বাকস্বাধীনতার প্রশ্নে তসলিমার কথা উঠতেই আপনি কথা ঘুরিয়ে দিলেন। কিন্তু সেই প্রশ্নের এক অংশের উত্তর বোঝা গেল। তসলিমা কি এ রাজ্যে স্বাগত? আপনার উত্তর, “আমার মনে হয় না”।)
ধর্ষণ সংক্রান্ত মন্তব্যের প্রতিবাদে ত্রিশূলে কন্ডোম? আচ্ছা কন্ডোমের সাথে ধর্ষণের কি সম্পর্ক? কন্ডোম দিয়ে কি ধর্ষণ আটকানো যায়? নাকি কন্ডোম পরে ধর্ষণ করলে সেটা ধর্ষণ নয়? কন্ডোম তো জন্মনিয়ন্ত্রক, তার সাথে ধর্ষণের কি সম্পর্ক? আপনি কি মনে করেন ধর্ষকরা সন্তানের আশায় ধর্ষণ করে? তাহলে আপনি ধর্ষণ মন্তব্য বিরোধী একটি কবিতায় কন্ডোম আনলেম কেন? আসলে আপনি একজন কমিউনাল হিন্দু বিদ্বেষী কবি। হ্যাঁ এমনও আজকাল হয় এই বাংলায়। কেবল সস্তা পাবলিসিটির জন্য আপনি হিন্দুবিরোধী কমিউনাল মন্তব্য করলেন আপনার কবিতায়, আর তার চেয়েও দু:খজনক এই যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী আপনাকে সমর্থন করলেন। এই হল সেকুলারিজম এর নমুনা। ইসলাম ধর্মের বিষয়ে লেখার জন্য মুসলিম তৃণমূল নেতার অভিযোগে, ১২ ঘণ্টার মধ্যে ব্লগার তারক বিশ্বাস গ্রেফতার হয়। মৌলবি ফতোয়ার জেরে তসলিমার লেখা বন্ধ হয়। তাঁর আজও দুই বাংলায় ঢোকা মানা। আর বামদলের পদলেহনকারী কন্ডোম কবি শ্রীজাতর পাশে দাঁড়ায় পরিবর্তনবাদী মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। না এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এই জন্যই আমাদের সহিষ্ণু হওয়ার শিক্ষা দেয়, কারণ রাগতে রাগতে রাগ শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু হিন্দু ধর্মে স্বাজাতিবিদ্বেষীদের সংখ্যা কমবে না।
শ্রীজাত আপনার একটা কথার সাথে আমি একমত, আপনি যে বললেন আপনি নিজেকে কবি মনে করেন না, ওই কথাটার সাথে। এইটা আমরাও অনেকে মানি যে আপনি কবি নন। আপনি কবিতা কবিতা দেখতে কিছু লেখা লেখেন। আপনার ‘উড়ন্ত সব জোকার’ আমরা অনেকেই পড়েছি। মল-মূত্র-বিষ্ঠা নিয়ে কাব্য। না কোনও মেটাফর বা সিম্বলিজম নেই। মল-মূত্র-বিষ্ঠা শব্দ প্রয়োগে মল-মূত্র-বিষ্ঠা নিয়েই ‘কাব্য’। অত:পর আনন্দ পুরস্কার। কারণ, তখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বেঁচে ছিলেন আর আপনি তাঁর পদলেহনে অনন্য ছিলেন। হ্যাঁ আমরা আপনার আসল রূপটা চিনি, অতএব আপনার ওই মুখোশটা আমাদের সামনে পরে কোনও লাভ নেই। আপনি বরং ওই আনন্দ পুরস্কারটা কোনও রোলের দোকানীকেই দিয়ে দিন।
  • Deepanjan Das

    Deep Biswas Apni Toh Gora BJP & RSS Supporter…:-) Thik bollam toh???

    • Deep Biswas

      na vai se vaggo aar holo koi? ekhono nirdol, apnar chenashona ache naki BJP RSS e? naki kono “butthurt” lalbabu? 🙂

  • Suvankar Biswas

    অসাধারণ প্রতিবাদের ভাষা। ফেসবুকের গালাগাল গুলো তো খুব হাইলাইট হলো, এইরকম যুক্তিবাদী প্রতিবাদ গুলোর কথা এবার বলা হোক।