নোট বাতিল রঙ্গ

0
Author Image অগ্নিভ নিয়োগী

৮ই নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ৫০০ ও হাজার টাকার নোটের ওপর যে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’টি করলেন তারপর থেকেই সারা দেশে ত্রাহি ত্রাহি রব। দূরদর্শনে এই ঘোষণা করার সময় কালো টাকা, সন্ত্রাসবাদ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নীতিপাঠ শোনালেও, যতদিন গেছে, ততই নোট বাতিলের উদ্দেশ্য বদল হয়েছে।
পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় হয়ে উঠেছে যে ৪৩ দিনে সরকারকে তাদের সিদ্ধান্ত ৬০ বার বদলাতে হয়েছে। কালো টাকা দুরস্ত, মানুষের কাছে নিত্যদিনের বাজার করার টাকাটুকুও নেই। ওদিকে ভরাডুবি দেখে প্রধানমন্ত্রীও ডিগবাজি খেয়ে এখন নগদহীন অর্থনীতির বুলি আওড়াচ্ছেন। সরকার, আরবিআই ও ব্যাঙ্কের সাঁড়াশি আক্রমণে নাজেহাল মানুষের মুখে মুখে ফিরছে একটাই গানের কলি- ‘‘তোমার দেখা নাই…।’’ পাড়ায় পাড়ায় চায়ের ঠেকে ক্যাশলেস এখন হাসির খোরাক।
এইতো সেদিন আইনক্সে গিয়েছিলাম ফেলুদা দেখতে (সরকার বাহাদুর ঘোষণা করেছিলেন আইনক্সে গেলে আমজনতা এটিএমের মতো টাকা তুলতে পারবে)। সেখানেও তথৈবচ অবস্থা। ডেবিট কার্ড সোয়াইপ মেশিন বিকল। তাই ক্যাশ ছাড়া গতি নাই। এমনকি সিনেমাতে ‘সমাদ্দারের চাবি’ গল্পের শেষে যখন ফেলুদা খুঁজে বের করল কাড়ি কাড়ি টাকার বান্ডিল, ১০০০ টাকার নোট দেখে সারা হল জুড়ে হাসির রোল উঠল।

No Cash-1

আমরা শহুরে মানুষেরা এই নোট বাতিল নিয়ে যতই হাসি ঠাট্টা করি না কেন, মফস্বল কিংবা গ্রামেগঞ্জে কিন্তু পরিস্থিতি গম্ভীর। ১১০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের জীবন জর্জরিত। এটা শুধুমাত্র সাময়িক অসুবিধা নয়, অর্থনীতিকে শেষ করে দিচ্ছে এই সিদ্ধান্ত।
সারা বছরের মধ্যে এই তিন মাস (ডিসেম্বর – ফেব্রুয়ারী) সব থেকে উত্পাদন ভালো হয় সে নির্মাণ কাজ হোক বা উন্নয়নমূলক কাজ। কোনও কাজ হচ্ছে না, সব বন্ধ হয়ে গেছে। চা বাগান কর্মী, জুট মিল কর্মীরা বেতন পাচ্ছেন না, তারা খুবই কষ্টে আছেন। রেল, পরিবহণ, পেট্রোলিয়াম সব ক্ষেত্রে ছাড় দিয়েছিল কেন্দ্র। কিন্তু রাজ্যের কৃষি সমবায়কে কোনও ছাড় দেওয়া হয়নি। এটা যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোর পরিপন্থী। রাজ্যগুলি ভুক্তভোগী।
ভারতবর্ষের পাঁচটি গ্রামের মধ্যে চারটিতে ব্যাঙ্ক নেই। আমরা সকলে ক্যাশলেস ব্যবস্থার পক্ষে। কিন্তু ভারতে ৯৫ শতাংশ ডেবিট কার্ড কিছু কিনতে ব্যবহার করা হয় না, শুধুমাত্র টাকা তুলতে ব্যবহার করা হয়। এমতাবস্থায় কিভাবে সরকার জোড় করে ক্যাশলেস চাপিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে পারে?
ইদানীং একটি প্রবণতা দেখা গিয়েছে, যেই প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করে তাকে দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়া হয়। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কাল বিরোধীদের পাকিস্তানী আখ্যা দিয়েছেন। গণতন্ত্রে এটি শুভ লক্ষ্মণ নয়। উনি যদি দুর্নীতি বন্ধে এতটাই ব্রতী হয়ে থাকেন, তবে নিজের দলের তহবিলের ৮০% উৎসহীন টাকার হিসেবে দিন।
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ‘মোদী হটাও, দেশ বাঁচাও’ এর স্লোগান তুলেছেন। দেশে এখন অঘোষিত জরুরি অবস্থা। এখন সময় সকলে একসাথে এই অরাজকতার মোকাবিলা করা। দড়ি ধরে মারলে টান, রাজা হবেই খান খান।