জমিভাগের মতো বাংলা ভাষাটাও দু’ভাগে ভাগ হোক

1
Author Image স্মৃতিলেখা চক্রবর্ত্তী

বাঙালি কে এবং বাঙালি কি, এই দুটো প্রশ্নের উত্তর-ই এ’যাবৎ অমীমাংসিত রয়ে গেছে। কাজেই যার যার সুবিধা মতো ‘বাঙালি’ জাতির পরিধি ব্যাখ্যা হয়ে চলেছে।
‘বাঙালি’র বাজার-চলতি ব্যাখ্যা হল, যিনি বাংলায় কথা বলেন, তিনিই বাঙালি। কিন্তু এইরকম ভাসা ভাসা সংজ্ঞা দিয়ে হয়ত কাজ চালানো যায়, কিন্তু বেশী দূর অগ্রসর হওয়া যায় না।
কারণস্বরূপ বলতে পারি, বাংলা ভাষায় কথা বললেই যদি ‘বাঙালি’ হয়, তবে ইংরেজিতে কথা বললেই ‘ইংরেজ’ নয় কেন? আজকের বিশ্বে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, UK সহ আরও বহু দেশে ইংরেজি প্রধান ভাষা। কিন্তু ইংল্যান্ড-এর বাসিন্দা ছাড়া অন্য কেউই ”ইংরেজ” হিসেবে পরিচিত নন। এবং অনেকে শুনে আশ্চর্য হবেন ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রেরও প্রথম ভাষা ইংরেজি। কাজেই এক হিসেবে ধরতে গেলে, আমরাও ইংরেজি-ভাষী। কিন্তু ইংরেজ নই। কাজেই, ইংরেজি ভাষায় কথা বললেই যদি ইংরেজ না হয়, তবে বাংলা ভাষায় কথা বললেই বাঙালি হওয়া যায় কিভাবে?

Bangla_bitarka_1

প্রত্যেকটি জাতি গঠনে দুটিই উপাদান মুখ্য ভুমিকা গ্রহণ করে। সেটি হল স্বকীয় ভাষা, স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। তবে ভাষা এক হলেও সংস্কৃতি বিপরীতমুখী হলে, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যই তাদেরকে আলাদা জাতি করে দেয়। কাজেই জাতি গঠনে ভাষার থেকে সংস্কৃতি’র ভুমিকা অনেক বেশী। এবং প্রায় প্রতিটি জাতির কাছেই, ভাষার তুলনায় সংস্কৃতি অনেক বেশী আপন। ভাষা সেই সংস্কৃতি প্রকাশের বাহন মাত্র। কাজেই, ভাষা এবং সংস্কৃতি’র মধ্যে যদি একটাকেই বেছে নিতে হয়, তাহলে মানুষ সবসময়েই সংস্কৃতিকে বেছে নেয়। কারণ, সংস্কৃতি থেকে ভাষা আসে, ভাষা থেকে সংস্কৃতি নয়।
যেমন ধরুন, পূর্ব বঙ্গীয় বাঙালি হিন্দুরা, তাঁরা যদি দেশভাগের পর পূর্ব বঙ্গে থেকে যেতেন, তাদের ভাষা হয়ত রক্ষা পেত, কিন্তু সংস্কৃতি রক্ষা পেত না। কাজেই সংস্কৃতি রক্ষার্থে তাঁরা দলে দলে দেশান্তরী হলেন।
আবার ধরুন, অধুনা ‘বাংলাদেশ’, দেশটি’র সরকারি ভাষা ‘বাংলা’ হলেও, তাতে বহু আরবি-ফার্সি শব্দের মিশেল থাকার ফলে সেই ভাষা হিন্দু বাঙালির কাছে অচেনা। ঠিক এই বিতর্কের সম্মুখীন আমরা পশ্চিমবঙ্গেও হয়েছি কিছুদিন আগে, যখন পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ-এর পাঠ্যক্রমে ”আব্বা-আম্মি” ইত্যাদি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটে।
এই দিক দিয়ে হিন্দি+উর্দু ভাষী’রা সঠিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, যখন তারা হিন্দু’র ভাষা এবং মুসলমানের ভাষা আলাদা করে নিয়েছিলেন। বাংলাতেও এই প্রচেষ্টা হয়েছিল। এস ওয়াজেদ আলি “মুসলমানি বাংলা” তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছিলেন। এমন কি ‘বাংলাভাষী’ মুসলমানের জন্য সম্পূর্ণ নতুন একটি লিপি-ও তৈরি করে ফেলেছিলেন। সেই মুসলমানি বাংলা তৈরি হলে হয়তো পশ্চিমবঙ্গে ঐ ‘আব্বা-আম্মা’ বিতর্ক থাকত না। রামধনু-কেও বাংলাদেশের মুসলমানি বাংলা’র অনুকরণে রংধনু হতে হত না।
দেশভাগ এবং বাংলা ভাগ হলেও, ভাষা ভাগ হয়নি, এ বড়ই দুঃখের বিষয়। ভাষা ভাগ না হবার ফলে, মুসলমানরাও আরবি-ফার্সি ইত্যাদি সহযোগে ভাষাটাকে নিজের মতো করে গড়ে নিতে পারছেন না। আর প্রমিত বাংলার ছাঁকনি বেয়ে যেটুকু আরবি ফার্সি ঢুকছে, তাকে হিন্দু বাঙালিরা মানতে পারছেন না।
এস ওয়াজেদ আলি’র অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ হোক। জমিভাগের মতো ভাষাটাও দু’ভাগে ভাগ হোক। ভাগ যখন হয়েই গেছে, আধাআধি রেখে লাভ নেই। শুধু বস্তাপচা আবেগের বশে, বাস্তব-কে অস্বীকার করে লাভ আছে?
  • Mohit Ray

    বাঙালি কে ? অস্তিত্ব রক্ষার আলোচনা শুরু হোক।
    মোহিত রায়
    স্মৃতিলেখা চক্রবর্তীকে ধন্যবাদ তিনি বাঙালি ও বাংলা ভাষা নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। বাংলা ভাষা নিয়ে সমাধান খুব জটিল নয় কারণ ইংরেজি ভাষা এখন আমেরিকান, ব্রিটিশ, ভারতীয় ইত্যাদি ভাবে চিহ্নিত করা অনেকদিন ধরেই শুরু হয়েছে। বাংলাও তেমনি ভারতীয় বা পশ্চিম বঙ্গ ও বাংলাদেশী বাংলা বলে চিহ্নিত করা হবে। কিন্তু বাঙালি কে হবে ?একমাত্র বাংলাভাষী ও ভারতীয় সভ্যতার উত্তরাধিকারীরাই নিজেদের বাঙালি বলে দাবী করতে পারে। যারা তা করেন না যেমন বাংলাদেশের (পশ্চিমবঙ্গের অনেকেও ) বাংলা ভাষীদের একটা বড় অংশ, তারা বাঙালি হতে পারেন না। বাংলাদেশের প্রয়াত প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান এই সত্যটি স্বীকার করে সংবিধানে বাংলাদেশের মানুষদের বাংলাদেশী বলে উল্লেখ রেখেছিলেন। দুই বাংলার মিলন নিয়ে যে ধ্যাষ্টামো চলে, সেই কোরাসকে এখন আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার সোচ্চারের উচ্চ ডেসিবেলে বাতিল করতে হবে। নইলে কয়েক দশক পর ঈদ আমাদের প্রধান জাতীয় উৎসব বলে পরীক্ষার খাতায় রচনা লিখতে হবে.