বাক-স্বাধীনতার নামে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থী ও অগণতান্ত্রিক পরিবেশ

মানস রায়, ক্যালিফোর্নিয়া

0
Berkeley University

ঘটনাস্থল ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়। আমেরিকা ও পৃথিবীর প্রথম সারির এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বিভিন্ন ক্ষেত্রে। সেই তালিকার মধ্যে অন্যতম হল বাক স্বাধীনতা। ১৯৬৪-৬৫ তে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক বিতর্ক ও কার্য্কলাপের সম্মতি আদায়ের আন্দোলন সাড়া জাগায়। প্রভাব ফেলে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে। পরবর্তী সময়ে আমেরিকাব্যাপী ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের বীজও সুপ্ত ছিল এই আন্দোলনে। স্বাভাবিকভাবেই এই আন্দোলনের রাশ ছিল বামপন্থীদের হাতে।
আমেরিকার প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয় (কিছু বেসরকারি ও খ্রিস্টান পরিচালিত বাদে) ক্যাম্পাসে বামপন্থী/লিবারেলদের প্রাধান্য। শিক্ষকদের নব্বই শতাংশই চাঁদা দেন ডেমোক্রাটিক পার্টিকে। তাঁরাই নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্র ভর্তি, অধ্যাপনা ও গবেষণার বিষয় ইত্যাদি ইত্যাদি। বিনা চ্যালেঞ্জে এই ব্যবস্থা চলে আসছিল গত কয়েক দশক ধরে। তবে শুধু আমেরিকার নয় এটা পৃথিবীর বেশিরভাগ গণতান্রিক দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বললে ভুল হবে না। যেমন ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ভারতের রাজধানীর জেএনইউ-এর স্কুল অফ ল্যাঙ্গুয়েজে দুনিয়ার অনেক ভাষার চর্চা হলেও বামপন্থীদের চাপে ভারতবর্ষের বেশিরভাগ ভাষার জননী সংস্কৃতকে ব্রাত্য করে রাখা হয়েছিল তিরিশ বছর। ২০০১ সালে বাজপেয়ী সরকারের আমলে প্রবেশাধিকার পায় সংস্কৃত। তাও পুরোপুরি ডিপার্টমেন্ট নয়, ‘সেন্টার’ তরী হয় সংস্কৃত ভাষার জন্য।
গত কয়েক বছর ধরে আমেরিকার শিক্ষালয়গুলিতে বামপন্থী/লিবারেলদের একচ্ছত্র সাম্রাজ্যে ছোটখাটো বিদ্রোহ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। বামপন্থী/লিবারেলরা খুব একটা বিচলিত হননি। কারণ, আট বছরের বুশ জমানায় রিপাবলিকানরা ক্ষমতায় থাকলেও বামপন্থী/ডেমোক্রাট/লিবারেলদের শিক্ষা ও চিন্তা একচ্ছত্র সাম্রাজ্যে দাঁত ফোটানোর চেষ্টা করেনি। ভোটে জিতে ক্ষমতার সুযোগ উপভোগ করেই খুশি তারা। অনেকটা ভারতে কংগ্রেসের মতন। শিক্ষা ও চিন্তা জগতের ভার তারা বামপন্থীদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল, শুধু প্রতিষ্ঠানগুলি একটি পরিবারের নামে হলেই হল।
ট্রাম্পের আবির্ভাব পাল্টে দিল সেই সুখী পরিবারের ছবি। বামপন্থী/ লিবারেলরা রোনাল্ড রেগানের পর এরকম ঠোঁটকাটা, ‘পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট’ মানুষের মুখোমুখি হয়নি। রেগান তবু প্রথাগত/মেইনস্ট্রিম দলের লোক ছিলেন। কিন্তু রাজনীতির বাইরের মানুষ ট্রাম্প শুধু ভোটের বাজারই গরম করেননি সাহস যুগিয়েছেন বামপন্থী/ লিবারেলদের চিন্তা-ভাবনা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলিকে (যার বেশির ভাগ চলে সরকারি সাহায্যে)চ্যালেঞ্জ করার। মেইনস্ট্রিম মিডিয়া, ডেমোক্রাট নেতৃত্ব এবং অনেক রিপাবলিকান নেতা যতই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি জোকার, যাঁর পরাজয় অবসম্ভাবী ঘোষণা করুন না কেন, গোড়া বামপন্থীরা কালো মেঘ দেখেছিলেন ট্রাম্পের সভার পর সভায় জনজোয়ারে। তাই তর্ক ছেড়ে সরাসরি আক্রমণ শুরু হল ট্রাম্পের জনসভায়। একের পর এক সভায় ডেমোক্রাট পার্টির ছত্রছায়ায় পালিত(যাদের অনেককেই ভাড়াটে)উগ্র বামপন্থী ও শ্বেতকায় বিদ্বেষীরা গন্ডগোল বাঁধাল। শিকাগোতে সভা হতেই দিল না। কেউ নিন্দা করেনি, বরং সভায় উপস্থিত ট্রাম্প সমর্থকরা গন্ডগোলকারীদের বিদ্রুপ বা ছোটখাটো ধাক্কাধাক্কি করলে নিন্দিত হয়েছেন।
তবু জিতে গেলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেইনস্ট্রিম মিডিয়া ও প্রতিষ্ঠিত রাজনীতির পন্ডিত ও বুদ্ধিজীবীদের একদম পথে বসিয়ে। বামপন্থী ও লিবারেলদের গণতন্ত্র প্রেমের ছবিতে পড়তে শুরু করল কালো কালো ছোপ। ভোটে হারার পর আত্মসমালোচনার পরিবর্তে গবেষণা শুরু হল কি কি উপায়ে ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেওয়া থেকে বিরত করা যায়। কারণ ভোটের ফল ঘোষণা আর শপথ নেওয়ার মধ্যে সময় থাকে আড়াই মাসের। কোর্ট কাছারীও হল, কিন্তু সুবিধা হল না। তখন শুরু হল নব নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে হেয় করার প্রচেষ্টা। ধর্ম, বর্ণ ও জাতিবাদের সুরসুরি দিয়ে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও জাতির কিছু মানুষকে দিয়ে স্লোগান তোলানো হল– ‘Not My President.’। একি কথা! গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, সবে পদে বসেছেন। তাঁকে তাঁর কাজ করতে দিন কিছুদিন, তারপর সিদ্ধান্ত নিন। কিন্তু ‘চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী’।
শুধু ট্রাম্প নয়, আক্রমণ শুরু হল দক্ষিনপন্থী সমর্থক ও প্রবক্তাদের ওপর। সেই আক্রমণ চরম রূপ নিল গত ফেব্রুয়ারী মাসের ১ তারিখে। বাক-স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্মভূমি খোদ বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে। বাক-স্বাধীনতা মানে শুধু বামপন্থী ও লিবারেলদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধীদের নয় সেটা ভালো করে বুঝিয়ে দিতে কালো মুখোশ কালো পোশাক পরা শ’দেড়েক গুন্ডা আক্রমণ করে সভাগৃহের আশেপাশে ভাঙচুর চালায়, আসবাবপত্রে আগুন লাগায় এবং রিপাবলিকান সমর্থক ছাত্রদের মারধর করে। কারণ, ওই দিন বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে দক্ষিনপন্থী পত্রিকা Bertbreitএর সম্পাদক মিলো ইয়ানোপলাস-এর ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল। বার্কলেতে দক্ষিনপন্থী বুদ্ধিজীবীর ভাষণ- নৈব নৈব চ। কালো পোশাকধারী গুন্ডার দলটির পরিচয় এন্টিফা (Antifa) নামে। Anti-fascist -এর সংক্ষিপ্ত আরকি। তবে পোশাকে (মুসোলিনির ব্ল্যাক শার্ট বাহিনীর কথা মনে আছে নিশ্চয়) ও কার্যক্রমে তারা যে ফাসিস্তদের দোসর তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বার্কলে শহরের পুলিশ ও প্রশাসন ডেমোক্রাটদের দখলে, তাই বার্কলের পুলিশ এন্টিফা গুন্ডাদের কিছু করে না।

Berkeley University 2

বামপন্থী শিক্ষক, ছাত্র, এন্টিফা ও বার্কলে শহরের ডেমোক্রাট দলের এই যৌথ আক্রমণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয় মিলো ইয়ানোপলাসের বক্তৃতা বাতিল করে দিতে। বামপন্থীদের গুন্ডামিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক লক্ষ ডলারের (৬৫ লক্ষ টাকা)ওপর লোকসান হয়েছে এই অজুহাত দেখিয়ে বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেব্রুয়ারী মাসে আরও কয়েকজন নামী দক্ষিনপন্থী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীর বক্তৃতা অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হয়। বাকস্বাধীনতার ওপর এই ঘৃণ্য আক্রমণের নিন্দা মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে বড় একটা হয় নি। পনেরো হাজার কিলোমিটার দূরের জেএনইউ’তে কিছু ঘটে গেলে যিনি বিচলিত হন ও বিবৃতি দেন সেই বিখ্যাত বামপন্থী আমেরিকান বুদ্ধিজীবী নোয়াম চমস্কি কিন্তু বার্কলে নিয়ে মুখ খোলেননি। যথার্থ বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বটে!
তবে দক্ষিনপন্থীরা হাল ছাড়েন নি। তারা এই সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাকস্বাধীনতার সপক্ষে বেশ কিছু কার্যক্রমের ঘোষণা দিয়েছেন। এই খবর শুনেই বার্কলে শহরের ডেমোক্রাট মেয়র শহরে শান্তি রাখার অজুহাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দক্ষিনপন্থীদের প্রোগ্রাম বাতিল করার পরামর্শ দেন। এবার অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রুখে দাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন চ্যান্সেলার ক্যারল খ্রিস্ট উল্টে মেয়রকে আদেশ দিয়েছেন আইন শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। মেয়র বাধ্য হয়ে পুলিশকে দক্ষিনপন্থীদের অনুষ্ঠানের ওপর হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কড়া হতে নির্দেশ দিয়েছেন। চ্যান্সেলার প্রয়োজনে ক্যালিফোর্নিয়ার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সুরক্ষা কর্মীদের বার্কলে ক্যাম্পাসে এনে বাক স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখার পদক্ষেপ নিয়েছেন।
এর ফল ফলেছে। গত ১৪ই সেপ্টেম্বর দক্ষিনপন্থী ইহুদি সাংবাদিক বেন সাপিরো বার্কলে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক হাজার শিক্ষক-ছাত্র সমাবেশে তার বক্তব্য রেখেছেন বিনা বাধায়। বামপন্থীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছে, কিন্তু সভাস্থল থেকে দূরে।
বার্কলের মুখ রক্ষা করেছেন নতুন চ্যান্সেলার ক্যারল খ্রিস্ট। তবে মূল্য দিতে হচ্ছে অনেক। গত ১৪ই সেপ্টেম্বরের সভা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য খরচ হয়েছে ছয় লক্ষ ডলার বা চল্লিশ লক্ষ টাকা। আর এ তো শুরু। এই সেপ্টেম্বর মাসেই আয়োজন করা হয়েছে আরও কিছু নামী দক্ষিনপন্থী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীর ভাষণ। একেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক অবস্থা তেমন মজবুত নয় তার ওপর বামপন্থী গুন্ডামি ঠেকাতে প্রতি অনুষ্ঠানে কারিকারি ডলার খরচা করতে হলে বড় মুস্কিল।