গরু নিয়ে নিষেধাজ্ঞার জেরে কৃষিজীবীদের উপর আঘাত নেমে আসবে

0
Author Image মইনুল হাসান লেখক- প্রাক্তন সাংসদ ও কলামিস্ট।

প্রধানমন্ত্রীর গ্রীষ্মকালীন বিদেশভ্রমণ শেষ করে দেশে ফিরেছেন। এবার ট্রাম্পের দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দিচ্ছেন। সরকারের তিন বছর শেষে দেশব্যাপী মোদী উৎসব চলছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে আরএসএস দপ্তরে পৌঁছে গেছেন অমিত জী। এখন সামনে অখণ্ড অবসর।
কিন্তু তার মধ্যেই গবাদি পশু সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দেশবাসীকে পথে বসিয়ে দিতে কসুর করেননি। কেন্দ্রীয় সরকারের লক্ষ্য কি? সারা দেশকে আমিষ খাদ্য শুণ্য করা, গবাদি পশু রক্ষা করা, চাষবাসের উন্নতি করা অথবা মুসলমানদের ‘টাইট’ দেওয়া।
নিজের পছন্দ মতো খাওয়া-পরা তো ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার। সেখানে হস্তক্ষেপ করা তো চরম দক্ষিণপন্থার কাজ। সেটা করাতো যেকোনও শাসকের পক্ষে জনগণের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেবার মতো। মানুষ এই কারণে তাদের ভোট দেয়নি।
গবাদি পশু রক্ষা করা বা চাষবাসের উন্নতি করা তো ভেক কথা। ১০-১২ বছর পর গরু অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ে। ২৫ বছর পর্যন্ত বাঁচে। বাকি দায়িত্বটা কে নেবে? চাষবাসে গবাদি পশুর ব্যবহার ক্রমেই কমে আসছে। বিজ্ঞান প্রযুক্তির উন্নতির সাথে সাথে। কারণ, কৃষিতে পুঁজি নিয়োগ, প্রযুক্তি ব্যবহার পূর্ব শর্ত। তাহলে কৃষিজীবী মানুষের উপর বাড়তি বোঝা চাপানো হল। রাজ্যের এক মুখ্যমন্ত্রী কর্মস্থলে যাবার আগে গরুদের ঘাসপাতা খাইয়ে পরিচর্যা করে যাচ্ছেন। তাতে ছবি উঠছে, প্রচার হচ্ছে, কিন্তু দেশবাসীর কোনও উন্নতি হচ্ছে না।

cow

সম্প্রতি যে নির্দেশ এসেছে তা আরও মারাত্মক। পশুহাট হবে রাজ্য সীমান্তের ২৫ কিমি আর আন্তর্জাতিক সীমান্তের ৫০ কিমি দূরে। পশ্চিমবাংলায় সমস্ত পশুহাট বন্ধ হয়ে যাবে। গরু, মহিষ, বাছুর কেনা বা বেচা অসম্ভব ব্যাপার। দু’পক্ষকেই শংসাপত্র দাখিল করতে হবে কেন বেচা বা কেনা হচ্ছে। চাষের কাজ ছাড়া কোনও কাজের জন্য কেনা চলবে না। আর একবার কিনলে ছ’মাসের মধ্যে সে সেটা বিক্রি করতে পারবে না। অরাজকতা আর কাকে বলে?
তাহলে মুসলমানদের ‘টাইট’ দেওয়া হবে। শুধু কি সেটাই হবে? কেবল মুসলমানরাই গরুর মাংস ভক্ষণ করে? আর কোনও ভারতবাসী এই তালিকায় নেই? মনিপুরে বিজেপি’র এক বিধায়ক প্রার্থী নিজের ভোটপ্রচারে বলেছেন- আমাকে ভোট দিন, আমি আপনাদের জন্য গরুর মাংস সস্তা করে দেব। নির্বাচক মন্ডলীর মধ্যে মুসলমান কিন্তু হাতে গোনা কয়েকজন। বাকিরা?
এ তথ্য সবার জানা যে, গবাদি পশু নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষিজীবী মানুষের দৈনন্দিন আয়ের উপর বড় নির্মম আঘাত নেমে আসবে। ২৫ শতাংশ আয় কমে যাবে। ভারত একটি প্রথম শ্রেণির মাংস রফতানিকারক দেশ। লক্ষ লক্ষ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আসে দেশে। এই কাজের সঙ্গে যুক্ত লক্ষ মানুষ। যা কয়েকদিন বাদে শূণ্যতায় পর্যবাসিত হবে। একটি অবিমিষ্যকারি আচরণে দেশকে সামাজিক ও আর্থিক দিক দিয়ে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে কেন্দ্রীয় করকার।
বিভিন্ন রাজ্য সরকার কিন্তু ইতিমধ্যে ফুঁসে উঠছে। কেরালা, পশ্চিমবাংলা-সহ আরও অনেক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরা তুমুল নারাজ। এটা দেশের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর উপর আঘাত বলে তারা মনে করছেন। কারণ, কৃষি রাজ্য তালিকাভুক্ত। তাছাড়া বহু জাতি-ধর্ম-বর্ণের দেশ ভারতবর্ষ। তাকে একসূত্রে গাঁথতে পারে এই বৈচিত্রের প্রতি সহনশীলতা ও বিশ্বাস। অন্য কিছু নয়। ইতিমধ্যে এই ব্যাপারে মাদ্রাজ হাইকোর্টে মামলা হয়েছে। আদালত এক মাসের স্থগিতাদেশ দিয়ে ফেলেছে।
বিগত তিনবছরে ভারতবাসীর পাওনা কি? বেকারদের জন্য কোনও সুখবর নেই। প্রতিবছর কোটি কোটি চাকরির প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। কোনও চাকরি হয়নি। কৃষকেরা ফসলের দাম না পেয়ে আত্মহত্যা করার সারি আরও দীর্ঘ করেছে। তামিলনাড়ুতে প্রবল খরা। সেখানকার কৃষকরা ইদুঁর খেয়ে প্রতিবাদ করেছেন। ৮টি ম্যানুফ্যাকচারিং মূল শিল্পে নিয়োগ কমেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও হেলদোল নেই। দেশে অসাম্য বেড়ে চলেছে।
প্রধানমন্ত্রী-সহ অন্যান্য মন্ত্রীদের বিদেশভ্রমণ বেড়েছে। আর দেশময় ধর্মীয় মেরুকরণের প্রক্রিয়া চলছে চূড়ান্ত গতিতে। মনে হচ্ছে গরু, তালাক ছাড়া আর সমস্যা নেই। উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনের পর নরেন্দ্র মোদী’র সরকার এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে। কারও কথা না শুনে নিজেদের পঞ্চদশ শতাব্দীর ধারণাগুলিকে মানুষের চাপিয়ে দেওয়া গবাদি পশু সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ তারই পরিচয় দিচ্ছে। এবার শুনছি দক্ষিণপ্রান্তে বর্ষা এসে গেছে দু’দিন আগে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিসর্জনের বাজনা সেই আগেই বাজবে। দক্ষিণপন্থা পৃথিবীতে কোথাও জেতেনি। ভারত তার থেকে আলাদা থাকতে পারে না।