বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ- কিছু বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ

চয়ন রায়

0

গত কয়েক দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গের ভিতরে একটি বিশেষ রোগ বাসা বেঁধে ক্রমশ তাকে রুগ্ন করে ফেলছে। বিষয়টা যে কেউ জানেন না তা নয়, ব্যক্তিগতভাবে কথা বললে অনেকেই এই রোগটি সম্পর্কে আপনাকে অনেক কথা বিশদে বলবে কিন্তু প্রকাশ্যে কেউ বলবে না। ধরা যাক ২০১০ সালে পুজোর আগে ৭,৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর ধরে দেগঙ্গায় তিনদিন ধরে একদল মুসলমান হিন্দুদের দোকানপাট জ্বালালো, মন্দিরে হামলা, হিন্দুদের মারধর করলো। এসব ঠেকাতে নামল সেনাবাহিনী। দেগঙ্গা কলকাতা থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে কিন্তু কোনও টিভি চ্যানেলে এই খবর সম্প্রচারিত হল না, মানুষ দেখতে পেল না সার দিয়ে দোকানের পোড়া ছবি। দু-একটা কাগজে ঘটনা ছাপলেও কারা কাদের দোকান বাড়ি পোড়াচ্ছে তা জানল না। তখন বামপন্থী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর সরকার রাজ্য শাসন করছে আর তৃণমূলের সাংসদ হাজী নুরুল হিন্দু বাড়িঘর পোড়াচ্ছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে তা নিয়ে সবাই চুপ। কারণ, ইসলাম, ইসলামি মৌলবাদ, মুসলমানদের গুন্ডামি, এ’সব নিয়ে কোনও কথা বলা বারণ। এই রোগটি যক্ষার মতন পশ্চিমবঙ্গকে মৃতপ্রায় করে তুলেছে। মোহিত রায়ের বই ‘বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ- কিছু বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ’ এই নীরবতাকে ভেঙ্গে সত্যি কথাটি বলেছে।
সমস্যাটিকে বইয়ের পিছনের মলাটে লেখা হয়েছে- যুক্ত বাংলা ধর্মীয় ভিত্তিতে ভেঙে হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও সাবেক পূর্ব পাকিস্তান, এখন বংলাদেশ। বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুরা ২২ শতাংশ থেকে কমে হয়েছে ৮ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলমানরা ১৯ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৩০ শতাংশ এবং তা দিনে দিনে বৃদ্ধির দিকে। বাংলাদেশী মুসলমানদের অনুপ্রবেশ পশ্চিমবঙ্গের জনবিন্যাসকে ইতিমধ্যেই পাল্টে দিয়েছে। এর সাথে বর্তমানে শুরু হয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার রমরমা, ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা, আলিগড় ও আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, ইমামদের রাজনৈতিক মঞ্চে অধিষ্ঠান, তসলিমা বিতাড়ন, ইসলামি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ, মুসলিম সংরক্ষণ ইত্যাদি। পাশেই মোল্লাতন্ত্রের হুঙ্কার। ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াণযাত্রার কিছু কথা রইলো এই বইয়ে।
‘বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ- কিছু বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ মোহিত রায়ের সাতটি প্রবন্ধের সংকলন। প্রথম প্রবন্ধটি’র নাম ‘ওদের ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ ফেব্রুয়ারি ও আমাদের বোন কমলা ভট্টাচার্য’। এই প্রথম একজন সাহস করে বললেন- ২১ ফেব্রুয়ারি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গবাসীর মাতামাতি অর্থহীন। ইসলামি মনোভাব না বদল হলে বাংলাদেশে বাংলা রইলো না উর্দু রইলো তাতে পূর্বপাকিস্তান বা বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর অত্যাচারের কিছু যায় আসে না। ‘বাংলাদেশে ৭১-এর গণহত্যাকারীদের বিচার শুরু হয়েছে- পশ্চিমবঙ্গে নীরবতা জামাতের হাতই শক্ত করছে’ প্রবন্ধটি লেখা হয়েছিল শহবাগ আন্দোলন শুরুর আগেই। এর পর বাংলাদেশে জামাতে জামাতে ইসলামের বিরুদ্ধে একটি গণআন্দোলন শুরু হল আর পশ্চিমবঙ্গে শুরু জামাত পন্থীদের রণহুঙ্কার। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা শহবাগের পক্ষে পথে নামেনি, পশ্চিমবঙ্গের জামাত-পন্থীরা হাজার হাজার মুসলমানদের নিয়ে কলকাতার ময়দানে সভা করছে। ‘আগামী দিনের পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান বাঙালির ছবি আঁকছে কলম’ প্রবন্ধটি পশ্চিমবঙ্গবাসীকে সতর্ক করেছে যে, তৃণমূল কংগ্রসের সাংসদ কুনাল ঘোষের নেতৃত্ব ও সারদা’র মালিক সুদীপ্ত সেনের পয়সায় কলম নামক একটি ইসলামি মৌলবাদী দৈনিক পশ্চিমবঙ্গের আবহাওয়াকে কলুষিত করছে। এভাবে প্রতিটি প্রবন্ধ পশ্চিমবঙ্গের ইসলামিকরণের বিষয়ে তথ্য ও যুক্তি নির্ভর প্রতিবেদন পেশ করেছে।
বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ- ‘সংখ্যালঘু ও পশ্চিমবঙ্গের অনিশ্চিত ধর্মনিরপেক্ষ ভবিষ্যৎ’। লেখক জনগণনার সরকারি তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে পশ্চিমবঙ্গে মুসলমান জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে দ্রুতগতিতে এবং কয়েক দশকে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়ে পড়বে। কিন্তু তার অনেক আগেই জনসংখ্যা ও পেশীশক্তিতে বলীয়ান এই জনগোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা হাতে নিয়ে নেবে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলী তাই দেখাচ্ছে। কিন্তু লেখক এই অবস্থার জন্য সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায়কেই দায়ী করেছেন। বিশেষত এদের ধর্মীয় নেতারা- রামকৃষ্ণ মিশন, ভারত সেবাশ্রম থেকে লোকনাথ বাবারা সাবাই নিজেদের নিয়েই মত্ত আছেন, ইসলামী মৌলবাদের এই দাপাদাপি নিয়ে তারা চুপ। তাই দেগঙ্গার হিন্দু ক্ষতিগ্রস্থদের সেবায় কোনও রামকৃষ্ণ মিশন বা ভারত সেবাশ্রমকে পাওয়া যায় নি। বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর অত্যাচার নিয়ে বই লিখে তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হলেন। তাঁকে কলকাতা থেকেও তাড়ানো হল কিন্তু হিন্দু ধর্মীয় নেতারা কিছুই বললেন না। এই ক্লীবতা থেকে মুক্ত না হলে সেই সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে যারা ভাবেন, যারা একটি বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক পশ্চিমবঙ্গে থাকতে চান তাদের এই বই পড়া অত্যন্ত জরুরী।
‘বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ- কিছু বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ’,
মোহিত রায়,
ক্যাম্প, ৮০/-