চর কাশেম- একটি বিস্মৃত উপন্যাস

মইনুল হাসান

0

‘চর তো নয়- যেন দুধের সর।’
বইটা শুরুই হয়েছে এই লাইনটা দিয়ে। চর কাশেম। অমরেন্দ্র ঘোষ-এর উপন্যাস। যখন কলেজে পড়ি তখনই বইটির নাম শুনেছি। পড়া হয়নি। অমরেন্দ্র ঘোষ-এর নামও শুনেছিলাম। নামটা মনে আছে। কারণ, লেখক একজন হিন্দু। কিন্তু তাঁর গল্প উপন্যাস-এর চরিত্রগুলি সব মুসলমান। মুসলমান জীবনের অন্তরঙ্গ আলোচনা আছে তাঁর লেখাতে। কিন্তু ‘চর কাশেম’ উপন্যাস পড়ার আগে আমার একেবারেই ভুল ধারণা। ভাবতাম কাশেম নামক কোনও মুসলমান গুপ্তচরের কাহিনী। এবার পড়তে গিয়ে হতবাক হলাম। একটা নদীর চরে গড়ে ওঠে জনপদের কাহিনী। হিন্দু মুসলমানদের সম্পর্ক। নারী পুরুষের দৈনন্দিন জীবন যাত্রা। গরীব বড়লোকদের মেজাজ মানসিকতা। হিংসা-বিদ্বেষ। জীবন মরণের ওঠাপড়া। প্রকৃতি ও মানুষের যুদ্ধ নিয়ে এক অনবদ্য উপন্যাস। বাংলার এক ‘ক্ষুদ্র ক্লাসিক’।
অমরেন্দ্র যখন লিখছেন তখন রবীন্দ্রনাথ লিখছেন। তিন ব্যানার্জী বাংলা সাহিত্যের আকার প্রায় দখল করে আছেন। তবে তিনি কল্লোল, কালি কলম, প্রগতি পর্বের লেখক। মৃত্যুর পরেও অনেকে বিখ্যাত হন। তিনি তা‍ হন নি। বরিশালের মানুষ। কল্লোল পত্রিকায় লিখেছেন ‘কলের নৌকা’। মুসলমান নায়ক-নায়িকা উপজীব্য। সেই লেখাতেই সাড়া ফেলে দেন। সমকালীন সমস্ত পত্র-পত্রিকায় লিখে গিয়েছেন। লেখার মধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, দেশ বিভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, মন্বন্তর, উদ্বাস্তু সমস্যা, মধ্যবিত্তের জীবন-সংগ্রাম যেমন এসেছে, তেমনই এসেছে সমাজের নীচুতলার মানুষ।
এখনকার আলোচনা ‘চরকাশেম’ নিয়ে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পদ্মাপারের এক কৃষক সমাজের ছোট চালচিত্র। কাহিনী অত্যন্ত সহজ ও সরল। পূর্ববঙ্গের ডাকিনী নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার প্রেক্ষাপট। ‘ডাকিনী’ পদ্মার একটি শাখা নদী। এই নদীর পারের মানুষগুলোর জীবন নিয়ে উপন্যাস। নদীর লীলা খেলার সঙ্গে মানুষের জীবন বাধা। বাংলা নদীর দেশ। নদীর জীবন বাদ দিয়ে বাঙালি জীবন হয় না। উপন্যাস তো সমাজের জীবনের আয়না। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। যেমন হয়েছে তারাশঙ্করের ‘কালিন্দী’, সমরেশের ‘গঙ্গা’, মানিকের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে। আবার অদ্বৈত মল্লবর্মনের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এ।
কাশেম বাইশ বছরের যুবক। হতদরিদ্র। ছোটবেলায় মাত্র আড়াই টাকায় তাকে তার বাবা গ্রামের এক ছোট জমিদারের কাছে বেঁচে দেয়। দুর্ভিক্ষ তাদের এই অবস্থা করেছে। কেউ নেই কাশেমের। বাবা হাশেম কম খেয়ে মারা গেছে। কাশেম কার্যত ক্রীতদাস। জমিদার কন্যা ফুলমন- বাল্যবিধবা। বড্ড মুখরা। কাশেম তাকে নিয়েই স্বপ্ন দেখে। সে সোনার মতো রঙের মেয়ে। পদ্মিনী।
কাশেম কিন্তু নিঃস্ব নয়। তার নানা’র বিরাট জোতজমি ছিল। তা সবই পদ্মা গর্ভে। কাশেমের আশা সেই জমি একদিন চর হয়ে উঠবে। সম্পত্তিটি তার নানা’র। কাশেম একমাত্র উত্তরাধিকারী। কাশেমের কেউ নেই। কষ্টে আড়াই টাকা শোধ করে সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়েছে। রহিমের পরিবারে সে যুক্ত। রহিমের বউ আঞ্জু আর আঞ্জুর ভাই ফরিদ তার প্রিয়জন। সবাই মৎস্যজীবী এবং কৃষিজীবী। এরমধ্যে ফরিদ আবার পেশায় চোর। সময় সুযোগ পেলেই সে চুরি করে। তার যুক্তিও অকাট্য। কে চোর নয়। চুরি না করলে চলবে কি করে? একদিন চর জেগে উঠলো। রসময় দাসের সাহায্যে সরকারের করে টাকা দিয়ে কাশেম তার বন্দবস্ত নিলো। নাম হল চর কাশেম।
‘কাশমা’ থেকে কাশেম হাওলাদার হল। নতুন পত্তন শুরু হল। মাছধরা, জাল বোনা, শাক সব্জী চাষে চলে যাচ্ছিল জীবন। কাশেমের মন পড়ে আছে ফুলমনের প্রতি। বিয়ের আসর থেকে কাশেম তাকে তুলে এনে সংসার পাতলো। ফুলমন প্রথমে বিদ্রোহ করলেও পরে কাশেমকে ভালোবেসে ফেললো।
উপন্যাসের বিস্তীর্ন এলাকা জুড়ে ১৯৪৩-র মন্বন্তরের ভয়াবহ বর্ণনা আছে। তাতে তৎকালীন বাংলার মর্মবেদনা প্রকাশ পেয়েছে নতুন বসতি ছিড়ে ছিটিয়ে গেল নানা জায়গায়। দিনের পর দিন অনাহারে কাটছে। নৌকা নামানো যাচ্ছে না। মাছ না ধরলে কি খেয়ে বাঁচবে তারা। একটা অদ্ভুত ঘটনার বর্ণনা আছে। বিরাট নৌকা নিয়ে কাশেমরা কয়েকজন জাল ফেলতে বেরিয়েছে। দেখা গেল জালের বিস্তীর্ণ এলাকা ছেড়া। একটুকরো সুতো নেই যা দিয়ে জাল সেলাই করা যাবে। বিনা বাক্য ব্যয়ে কাশেম তার পরনের শতছিন্ন লুঙ্গিটি দিয়ে ছেড়া জায়গা বেঁধে দিচ্ছে। নিজে উলঙ্গ। ক্ষুধার তাড়না। অভাব। এমনই ছিল সেই সময়।
অন্নের সন্ধানে গিয়ে রহিম আর তার দুই ছেলে ফেরেনি। ফরিদ আসামে মেয়ে পাচারের কাজে যুক্ত হয়েছে। আঞ্জু একা। সে চিরকাল কাশেমকে ভলোবেসে এসেছে। আঞ্জু, ফুলমন এবং কাশেমকে নিয়ে প্রেমের ত্রিভূজ সম্পর্কের দ্বন্দ্ব তীব্র।
তৎকালীন পূর্ববঙ্গের সামাজিক জীবনে যে চমৎকার সম্প্রীতি ছিল তা এই উপন্যাস থেকে বোঝা যায়। চর কাশেমের মুরুব্বী হল রসময় দাস। সবার জন্য যখন ‘কাজ’ ঠিক হয় তখন রসময়কে বলা তার কোনও কাজ নেই। সে সবার মাথা। তার আবার কাজ কি। ধর্মপ্রাণ মানুষটি সবাইকে আগলে রেখেছে চরে। নদীর ভাঙ্গনে যখন রসময়ের বাড়ি ঘর ভেসে যায় তখন কাসেম নিজের জীবন বিপন্ন করে রসময়ের হরগৌরি মূর্তি উদ্ধার করে আনে।
রজনী গান ধরে ভোরের ভজন। ভজন আর
আজানের সুর মিশে এক মধুর ঐক্যতানের সৃষ্টি হয়।
মুসলমানরা ঠিক অর্থ বোঝে না। তবু অব্যক্ত এক
রসধারায় তারা যেন স্নান করে ওঠে-
আর হিন্দুরা আজানের একটানা সুরে একটা মাধুর্য অনুভব করে।
মন্বন্তরের সময় কিছু নেই কারো ঘরে। সবাই উপোষ। ফুলমনের ঘরেও সবাই উপোষ। ফুলমনের ঘরে বহুকষ্টে বহুদিন ধরে জমানো কয়েকটা টাকা আছে। সবাই কাতরভাবে সেটাই চায়। ফুলমনের পেটে তখন বাচ্চা এসেছে। তারই কথা ভেবে সে সাড়া দেয় না। কিন্তু রসময় যখন ডেকে ওঠে ‘মা লক্ষ্মী’। কেঁপে ওঠে ফুলমন। সাড়া না দিয়ে পারে না। সব বিলিয়ে দেয় অভাবী মানুষদের মধ্যে।
ফুলমন মুসলমান হলেও পূর্ববঙ্গের পল্লী দুহিতা।
তার মনে একটা কল্পরূপ ছিল এই ধন-জন-সৌভাগ্যদায়িনী দেবীর।
সে অবিভূত হয়ে পড়ে।
হিন্দু সমাজের মধ্যেও বিভাজন প্রকট। জীবন পিয়ন ‘হালদার’ বলে রসময় তার প্রতি প্রাথমিক অবজ্ঞা দেখায়। কিন্তু জীবন সরকারি লোক। তখন সে যেন ‘জাতে’ উঠলো এমন আচরণ করে। সারা বাংলায় অভাব। গরীব মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এবার সামনে এগিয়ে প্রতিবাদ করা ছাড়া আর কোনও পথ নেই। প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েই গল্প শেষ হয়েছে-
ক্রমে রাত শেষ হয়ে আসে।
দূর নদীবক্ষ থেকে একটা প্রতিধ্বনি ভেসে আসে-
যেতে হবে, যেতে হবে। একটা কঙ্কালকেও আজ
আশা বুকে নিয়ে মাথা খাড়া করে প্রতিবাদ করতে যেতে হবে।
কঙ্কাল সার মানুষগুলো বেরিয়ে পড়ে।
বহুদিন উপন্যাসটি পাওয়া যাচ্ছিল না। নিও র‍্যাডিক্যাল পাবলিকেশন এখন আবার এটা প্রকাশ করেছে। ১৯৬২ সালে অমরেন্দ্র ঘোষ মারা গেছেন। সহজ সরল কিন্তু চিত্রময় ছিল তার লেখা। মুসলমান জীবনই ছিল মূল প্রেক্ষাপট। সেদিক দিয়ে অমরেন্দ্র বাবু একটি যুগান্তকারী কাজ করেছিলেন। ১৯০৭ সালে জন্ম। ১৯২৫ সালে কলকাতার কালীঘাট হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। চর কাশেম তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি।
চর কাশেম,
অমরেন্দ্র ঘোষ,
নিও র‍্যাডিক্যাল পাবলিকেশন, ১৮০ /-