শ্রী অরবিন্দ’র দুর্গা স্তোত্র বর্তমান সময়ে নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করে

যশোধরা রায়চৌধুরী

0
Sri Aurobindo

১৯০৯ । পরাধীন ভারতের এক অদ্ভুত মুহূর্ত। ইংরেজ শাসনের চাপ ক্রমবর্ধমান, কেননা স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষী যুবসম্প্রদায়ের তীব্র চাওয়া ফুটে উঠছে নানা দিক থেকে। আর সেই সব চাওয়ার মাঝখানে অরবিন্দ ঘোষের মত এক যুবকের শিক্ষিত মেধাবী অসামান্য মনন আর অদ্ভুত দ্বিখন্ডিত, আশ্চর্য চুরমার জীবন, বেছে নিচ্ছে আবেগের সঙ্গে মেধার উত্তুঙ্গ মেলবন্ধনের কবিতা তথা প্রার্থনা, স্বপ্ন তথা কামনা, ভক্তি তথা শপথের এই লেখা, দুর্গা স্তোত্রকে।
১৮৭২ এ জন্ম নেন শ্রী অরবিন্দ। আজ আমাদের কাছে যিনি শ্রী অরবিন্দ সেই অরবিন্দ ঘোষ। বাবা কৃষ্ণধন ঘোষ রংপুর জেলার মুখ্য সার্জন, ব্রিটিশভক্ত ডাক্তারবাবু। অরবিন্দের মা স্বর্ণলতা দেবী বিখ্যাত ব্রাহ্ম দার্শনিক নেতা রাজনারায়ণ বসুর কন্যা। শৈশবেই অরবিন্দ ব্রিটেন চলে যেতে বাধ্য হন বড় দুই ভাইয়ের সঙ্গে। স্বর্ণলতার মানসিক স্বাস্থ্য ভাল ছিল না বলে মায়েদের থেকে ছেলেদের আলাদা করে দেওয়া হল, আর বাবার আত্যন্তিক বাসনা ছেলেরা আইসিএস হবে। তাই সাহেব বাড়িতে থেকে ইংরাজি, ইতিহাস, অংক, সঙ্গে সঙ্গে ফরাসি ভাষা ও গ্রিক ভাষা পড়তে পড়তে বড় হয়েছিলেন অরবিন্দ। একুশ বছর বয়সে আইসিএস পরীক্ষায় বাধ্য হয়েছিলেন বসতে। বড় দুই ভাই আইসিএস হবেন না, বাবার ইচ্ছার ভার বর্তিয়েছিল অরবিন্দের ওপরেই। ইচ্ছা করে ঘোড়ায় চড়ার পরীক্ষায় দেরিতে এসে বাবার সে বাসনাকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন পুত্র। বরোদায় এসে গাইকোয়াড় রাজার চাকরি নিয়েছিলেন নিজের দেশের টানে। রামায়ণের ট্রাজিক পিতা দশরথের মত কৃষ্ণধন আর ছেলেকে দেখতে পান নি। বাংলায় বসে তিনি ভুল খবর পেয়েছিলেন, ছেলে জাহাজ ডুবিতে মারা গেছে। ভগ্নহৃদয় বাবা মারা গেলেন।
ছেলে জাহাজ থেকে দেশের মাটিতে পা দেওয়া মাত্র, তাঁর নিজ বয়ান অনুযায়ী, শরীরে বিদ্যুত ক্ষরণ হয়েছিল। বিশ্বমায়ের আঁচলের সবচেয়ে প্রিয় কোণাটিতে এসে বসতে, বরোদায় মহারাজের বক্তৃতা লেখার কাজ, বরোদা কলেজে ফরাসি পড়ানোর কাজ, আজন্ম না শেখা ভাষা বাংলা ও সংস্কৃত পাশাপাশি শিখে নেওয়া, সব সেরে আত্মীয়দের টানে বাংলায় ফিরে এলেন।
১৯০৫ এ কার্জনের বঙ্গভঙ্গ সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় সাড়ম্বরে যোগ দিলেন। এভাবে প্রকৃতি প্রতিশোধ নেয় বোধ হয়। ইংরেজ ভক্ত কৃষ্ণধন, পরবর্তীতে নাকি ইংরেজকে বলেছিলেন “হৃদয়হীন শাসক” কিন্তু সম্পূর্ণ মোহভঙ্গ তাঁর ঘটুক চাই না ঘটুক, আশ্চর্য ভাবে আমরা দেখলাম অরবিন্দ আর কনিষ্ঠ বারীন ঘোষ অনুশীলন সমিতি স্থাপন থেকে শুরু করে সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রামে সম্পূর্ণ জড়িয়ে পড়লেন।
ইতিমধ্যেই ইংরেজি কর্মযোগিন ও বাংলা ধর্ম পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। যুক্ত হন নানা স্বাধীনতা সংগ্রামীর সঙ্গে। ভগিনী নিবেদিতা তখন পুরোপুরি এ সংগ্রামের পথিক, স্বামী বিবেকানন্দের তিরোধানের পর, সামাজিক সংস্কার ও পত্রিকা সম্পাদনায় রত। তাছাড়া বাঘা যতীন, যতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরদের সঙ্গে চলেছে অরবিন্দের গভীর সংশ্লেষ ও কার্যক্রম। কংগ্রেসের ১৯০৬ এর অধিবেশনেও দাদাভাই নৌরজির আমন্ত্রণে অংশ নিয়েছেন তিনি। ১৯০৭ এ সুরাত কংগ্রেসে চরমপন্থী বাল গঙ্গাধর তিলকের পক্ষ নিয়েছেন। এর পরপরই ভেঙে দু’ভাগ হয়ে যাবে নরমপন্থী ও চরমপন্থী কংগ্রেস।
১৯০৮ এ ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকি কিংসফোর্ড হত্যার ষড়যন্ত্র করে ভুল করে অন্য গাড়িতে বোমা মারলেন। ব্যারিস্টার কেনেডির স্ত্রী ও মেয়ে মারা গেলেন। দীর্ঘ সেই আলিপুর বোমার মামলায় ধরা পড়লেন অরবিন্দ। অন্যতম ষড়যন্ত্রী হিসেবে। চিত্তরঞ্জন দাশকে পেলেন আইনজীবী হিসেবে। ১৯০৮ থেকে ১৯০৯ সলিটারি কনফাইনমেন্টে, একাকি জেলবাসে থাকতে হয়েছিল শ্রী অরবিন্দকে। এই সময়েই তাঁর বিপ্লবী জীবন আধ্যাত্মিক জীবনের দিকে ঘুরে যেতে থাকে।
আর এই সময়ে লেখা হয় দুর্গা স্তোত্র।
(2)
এ স্তোত্র পরাধীন ভারতের স্বাধীনতাকামী যুবকদের জপমন্ত্র। গীতা পকেটে নিয়ে মৃত্যুকে তুচ্ছ করা সশস্ত্র বিপ্লবী সেই যুবকেরা যারা আজকে আমাদের কাছে শুধু গল্পের বইয়ের চরিত্র।
অরবিন্দ বলছেন, তোমার শক্ত্যংশজাত আমরা বঙ্গদেশের যুবকগণ। আমরা প্রার্থনা করছি, ঊর বঙ্গদেশে, প্রকাশ হও। ঊর অর্থ এসো। মনে পড়বে বঙ্কিমের মা যা ছিলেন, মা যা হইয়াছেন, মা যা হইবেন।

Sri_aurobindo 3


কবি কল্পনায় শক্তিমূর্তি অনন্ত আশাপ্রদায়িনী। কিন্তু ভাষার ওজস্বিতা শ্রী অরবিন্দের এমনই, যে তিনি সে ভাষাকে কোথায় না নিয়ে যাচ্ছেন এ স্তোত্রে।  সিংহবাহিনী মাকে বঙ্গদেশের যুবকেরা বলছে, জীবন সংগ্রামে ভারত সংগ্রামে তোমার প্রেরিত যোদ্ধা আমরা, তুমি আমাদের প্রাণে মনে অসুরের শক্তি দাও অসুরের উদ্যম দাও।
সশস্ত্র সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার যে মুহূর্তে এ লেখা লেখা হল, ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকি, যতীন বাগচিদের আত্মদানের যে গৌরব তখন রচিত হচ্ছে, তখন, সাদাকালো, দৈবী শক্তি-আসুরিক শক্তির ভেদ মুছে দেওয়া এ লেখাকে কী বলব, কবির কল্পনা, নাকি আজকের ভাষায় সাবভার্শান। ধর্মকে ব্যবহার করার নানা ফন্দিফিকিরে আক্রান্ত আমরা আজকের পাঠক, এ লেখার একমুখী বিশ্বাসী আবেগী অভিঘাতের সামনে নতজানু হই তাই।
আজকের এই মুহূর্তে আর এক বড় প্রশ্ন আসছে আমাদের সামনে। দুর্গাপূজা, সেটা কতটা প্রতীকী, আর কতটা হিন্দু ধর্মের এক চিরাচরিত বিধিমাত্র। এক প্রাতিষ্ঠানিক পূজা আচরণ। বসন্তের বদলে অকালবোধনে, এই শরতে দুর্গাপূজা তো রামায়ণের কাহিনির সঙ্গে জড়িত এক অন্য বিধিভঙ্গ। তাছাড়াও, এর প্রতীকায়ন তো বার বার ঘটে গেছে এ বাংলার সংস্কৃতিতে। আর বাংলা-উড়িষ্যা-অসম নিয়ে যে বৃহত পূর্বী ক্ষেত্র, সে ক্ষেত্রের সজল মাটিতে দুর্গা তো নানারূপে আরাধিতা। বাড়ির মেয়ে, ঘরের কন্যা উমার শ্বশুরবাড়ি থেকে বাপের বাড়ি আসা, শক্তিপীঠের শক্তি পূজা, আবার দেশমাতৃকা অথবা সত্য-ন্যায়-সম্প্রীতি-মানবতার পূজা। সাংস্কৃতিক বোধে উদ্দীপিত এক সামাজিক বোধন। এই সব কিছুর সুদীর্ঘ ইতিহাসে, এই দুর্গা স্তোত্রও একটি মাইল ফলক, নয়কি?
আজকের এই ক্ষতবিক্ষত, নৈরাশ্যময় সময়ে, এই বাণী, এই আবাহন, “আর বিসর্জন করিব না” বলে এই প্রতিশ্রুতি, আর সবশেষে, আমাদের জীবন অনবিচ্ছিন্ন দুর্গাপূজা হউক, এ শপথ, অনেক আত্মবলিদানের স্মৃতি মনে আনে, আবার নতুন করে উদ্বুদ্ধও করে না কি?